ভবন তৈরি না করে ঠিকাদার ভেগেছেন, রোদ-বৃষ্টিতে স্কুল বন্ধ

আপডেট: 08:34:39 19/08/2018



img

চৌগাছা (যশোর) প্রতিনিধি : টেন্ডার বিজ্ঞপ্তি দেওয়ার পর ঠিকাচুক্তি সম্পন্ন হয়েছে। নির্মাণের জায়গার জন্য পুরনো ভবন অপসারণও করা হয়েছে। চুক্তি মোতাবেক ভবন নির্মাণের মেয়াদ জুন মাসে শেষ হয়েছে। ঠিকাচুক্তির মেয়াদ শেষে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির অজুহাতে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কোনো কাজ না শুরু করেই তা ছেড়ে দেওয়ার প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে।
পুরনো জরাজীর্ণ স্কুলভবন ভেঙে বিক্রি করার পর এখন খোলা আকাশের নিচে ক্লাশ করতে বাধ্য হচ্ছে চৌগাছার পাঁচনমনা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও তাহেরপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। ফলে সামান্য বৃষ্টি বা অতিরিক্ত রোদ পড়লেই শিক্ষার্থীদের ছুটি দিতে বাধ্য হচ্ছেন শিক্ষকরা।
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা বলছেন, উপজেলা প্রকৌশল অফিসের অবহেলার কারণেই এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। অন্যদিকে উপজেলা প্রকৌশল অফিস বলছে, ঠিকাদার কাজ করতে না চাওয়ায় অনুযায়ী তাদের জামানতের টাকা বাজেয়াপ্তের সুপারিশ করা হয়েছে।
এমন অবস্থায় স্কুল দুটির ভবন নির্মাণ কবে শুরু হবে অথবা আদৌ ভবন নির্মান হবে কিনা- সে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। দুই অফিসের কোনো দায়িত্বশীল ব্যক্তিই এ বিষয়ে নিশ্চিত করতে পারেননি।
তবে এবিষয়ে তথ্যের জন্য উপজেলা প্রকৌশলী তারিকুল হাসানের সঙ্গে কয়েকবার যোগাযোগ করলেও তিনি কোনো সহযোগিতা করেননি।
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস, প্রকৌশল অফিস ও সংশ্লিষ্ট স্কুল দুটির শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন প্রকল্পের (পিইডিপি-৩) অধীনে স্কুল দুটির নতুন ভবন নির্মণের জন্য গত জানুয়ারি মাসে দরপত্র আহŸান করা হয়। স্কুলপ্রতি বরাদ্দ ছিল ৭৬ লাখ টাকা। সেখানে বেশ কয়েকজন ঠিকাদার অংশগ্রহণ করেন। সর্বনি¤œ দরদাতা প্রতিষ্ঠান হিসেবে ঝিনাইদহের মহেশপুরের চৌধুরী কনস্ট্রাকশন বিদ্যালয় দুটির নতুন ভবন নির্মাণের দায়িত্ব পায়। সে অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানটি ঠিকাচুক্তিও সম্পন্ন করে। চুক্তি অনুযায়ী চার মাসের মধ্যে বিদ্যালয় দুটির নতুন ভবন নির্মাণ কাজ সমাপ্তের কথা ছিল। তবে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটি কোনো কাজ না করে সম্প্রতি ভবন নির্মাণ থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করে নেয় এবং জামানতের টাকা বাজেয়াপ্তের আবেদন করে। সে প্রেক্ষিতে উপজেলা প্রকৌশলী তাদের জামানতের টাকা বাজেয়াপ্তের সুপারিশ করে এলজিইডি প্রধান কার্যালয়ে পাঠিয়েছেন।
এদিকে স্কুল দুটির নতুন ভবন নির্মাণের স্থান হিসেবে চিহ্নিত করা হয় যেখানে স্কুলের পুরনো ভবন ছিল। সে সিদ্ধান্তের প্রেক্ষিতে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস দরপত্র আহ্বানের মাধ্যমে পুরনো ভবন দুটি বিক্রি করে দেয়। ক্রেতা গত মার্চ মাসেই বিদ্যালয় দুটির পুরনো ভবন ভেঙে নিয়েছেন। ফলে স্কুলের খেলার মাঠে অস্থায়ীভাবে বাঁশের ওপর টিন দিয়ে সেখানে শিক্ষার্থীদের ক্লাস নেওয়া হচ্ছে। এতে সামান্য বৃষ্টি হলেই শিক্ষার্থীরা ভিজে যায়। আবার একটু বেশি রোদ-পড়লেই টিনের এই অস্থায়ী শেডে অতিরিক্ত গরমে শিক্ষার্থীরা অসুস্থ হয়ে পড়ে। ফলে স্কুল ছুটি দিয়ে দিতে হচ্ছে। এতে করে ব্যাহত হচ্ছে শিক্ষা কার্যক্রম। অভিভাবকদের দাবি, এমন পরিস্থিতিতে তাদের সন্তানরা পিছিয়ে যাচ্ছে। কেউ কেউ এই দুটি প্রতিষ্ঠান থেকে নিজেদের সন্তানদের সরিয়ে অন্য স্কুলেও নিয়েছেন।
বিষয়টি নিয়ে তাহেরপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শাহ আলম মৃধা উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে এসেছিলেন খোঁজ নিতে। তিনি এ প্রতিবেদকের উপস্থিতিতে উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা বেলায়েত হোসেনের কাছে তার স্কুলের দুর্দশার কথা বলেন। উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা তাকে উপজেলা প্রকৌশল দপ্তরে খোঁজ নিতে পরামর্শ দেন। শাহ আলম মৃধা তখন বলেন, ‘স্যার, উপজেলা প্রকৌশল দপ্তরের লোকজন আমাদের সাথে ভালো করে কথাই বলেন না। মূল্যই দেন না। খোঁজ নেব কী করে?’
এক প্রশ্নের জবাবে শাহ আলম মৃধা বলেন, ‘ভবন নির্মাণের ড্রইং-ডিজাইন কিছুই আমাদের দেখানো হয়নি। আমাদের কিছুই জানানো হয় না। এখন লোকমুখে শুনছি ঠিকাদার কাজ করবেন না।’
এ পর্যায়ে শিক্ষা কর্মকর্তা বলেন, ‘উপজেলা প্রকৌশলীর অবহেলাতেই ভবন দুটি নির্মাণ হলো না।’
তিনি উপস্থিত সাংবাদিকদের বিষয়টি নিয়ে যেন গণমাধ্যমে লেখার অনুরোধ করেন।
পাঁচনমনা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মর্জিনা আক্তার বলেন, ‘আমার স্কুলে ১১৯ জন শিক্ষার্থী। বিদ্যালয়ের ভবন ভেঙে ফেলায় পরিত্যক্ত টিন ও বাঁশ দিয়ে গোঁজামিল দিয়ে একটি অস্থায়ী অফিস কক্ষ, তিনটি ক্লাস রুম তৈরি করা হয়েছে। বর্ষা মৌসুম হওয়ায় সামান্য বৃষ্টিতেই ক্লাস রুমে পানি ঢোকে এবং জরাজীর্ণ টিনের ফুটো দিয়ে পানি পড়ে। ফলে বৃষ্টি হলেই বা বেশি গরম পড়লেই স্কুল ছুটি দিতে হচ্ছে। এসকল কারণে বর্তমানে দিন দিন স্কুলে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি কমতে শুরু করেছে।’
তবে উপজেলা প্রকৌশলী তারিকুল হাসানের দপ্তরে একাধিকবার ধরনা দিলেও তিনি ‘সাইটে আছেন’ বলা হয়। পরে গত ৯ আগস্ট তাকে নিজের দপ্তরে পাওয়া যায়। সে সময় তিনি বলেন, ‘সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার কাজটি না করে জামানতের টাকা বাজেয়াপ্তের আবেদন করেছেন। সে প্রেক্ষিতে তাদের জামানত বাজেয়াপ্তের সুপারিশ করে প্রধান কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে। তবে পরবর্তী অগ্রগতি ফাইল দেখে বলতে হবে।’
এর পরই তিনি অফিস ছাড়েন। বলে যান, পরে যোগাযোগ করলে বিস্তারিত জানাতে পারবেন।
এরপর প্রায় দেড় সপ্তাহ ধরে এই বিষয়ে বিস্তারিত জানতে তাকে বারবার ফোন করা হয়। প্রতিবারই তিনি সংযোগ কেটে দেন। সামনা সামনি কথা বলার জন্য কয়েকবার দপ্তরে গেলেও তাকে পাওয়া যায়নি। প্রতিবারই তার অফিসের কর্মচারীরা বলেছেন, ‘স্যার সাইটে’ আছেন।

আরও পড়ুন