তবু ঘরে ঠাঁই হয়নি ইউনুসের

আপডেট: 01:29:41 23/11/2017



img

মণিরামপুর (যশোর) প্রতিনিধি : এখনো বাগানের পুকুরপাড়ে শিকলবন্দি রয়েছেন মণিরামপুরের মাছনা গ্রামের ইউনুস আলী (৫০)।
চার মাসেরও বেশি সময় এভাবে তাকে শিকলবন্দি করে গাছের সঙ্গে বেঁধে রেখেছেন স্ত্রী-সন্তান। বিষয়টি গণমাধ্যমকর্মীদের নজরে এলে বুধবারে সরেজমিন প্রতিবেদন বের হয় সুবর্ণভূমিসহ বেশ কয়েকটি দৈনিকে। ফলে বিষয়টি আমলে নেয় পুলিশ। বুধবার সকালে থানা পুলিশ গিয়ে ইউনুসকে ঘরে তুলতে নির্দেশ দেয়। তারপরও টনক নড়েনি ইউনুসের স্ত্রী আকলিমা ও ছেলে ইয়াকুবের। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামলেও ঘরে আশ্রয় মেলেনি ইউনুসের। সন্ধ্যায় সরেজমিন গিয়ে ইউনুসকে পুকুরপাড়ে শিকলবন্দি অবস্থায় পাওয়া গেছে। ঠান্ডায় চাদর মুড়ি দিয়ে শুয়ে ছিলেন তিনি। সংবাদকর্মীদের উপস্থিতি টের পেয়ে তিনি উঠে বসেন; বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন। ওই সময় ইউনুসকে স্বাভাবিক দেখাচ্ছিল।
বুধবার সন্ধ্যার আগে মাছনা গ্রামে ইউনুসের বাড়ি গিয়ে দেখা মেলে তার স্ত্রী আকলিমার। তিনি পথ দেখিয়ে স্বামীর কাছে নিয়ে যান। আকলিমা ছেলে-পুত্রবধূকে নিয়ে যে ঘরে থাকেন, সেখান থেকে প্রায় ১০০ হাত দূরে বাগানে পুকুর পাড়ে ঠাঁই হয়েছে ইউনুসের। তাকে যেখানে বেঁধে রাখা হয়েছে, সচরাচর সেখানে মানুষের চলাচল নেই। সন্ধ্যা হলেই নামে ঘোর অন্ধকার। ওই অন্ধকারের মধ্যে সাপ-পোকামাকড়ের সঙ্গে রাত কাটছে ইউনুসের।
চার মাসের বেশি সময় ধরে তিনি এভাবেই রোদ, বৃষ্টি ও ঠান্ডার মাঝে দিনরাত কাটাচ্ছেন। ইউনুসের স্ত্রী আকলিমার অভিযোগ, স্বামী পাগল হয়ে তাকে মারধর করেন, সব ভাংচুর করেন, তাই বাগানে বেঁধে রাখা হয়েছে।
ঘরে ঠাঁই হলো না কেন?- এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, 'কী করে ঘরে রাখবো? সে তো ঘরের গ্রিল, দরজা কিছুই ঠিক রাখে না। সব ভেঙে ফেলে।'
খাবার সরবরাহের বিষয়ে আকলিমা বলেন, '১৭ বছর কাজ করে তার চিকিৎসার খরচ চালিয়েছি। এখন ছেলের সংসারে খাই। ওকে খেতে দেবো কোথা থেকে?'
আকলিমার পাশেই দাঁড়িয়ে ছিলেন তার পুত্রবধূ আসমা। তিনি বলেন, 'আগে দিতাম। এখন দিইনে। কারণ, খাবার দিলে ফেলে দেয়।'
এসময় ছুটে আসেন ইউনুসের মা রোকেয়া বেগম। তিনি বলেন, 'আমি আরেক ছেলের ঘরে খাই। ওরা আমারে যে খাবার দেয়, তা থেকে বাঁচিয়ে ছেলেরে আইনে খাওয়াই। ছেলে পায়খানা করলি তাও আমি পরিষ্কার করি। বউ খবর নেয় না।'
এদিকে, গণমাধ্যমকর্মীদের দেখে এগিয়ে আসেন আশপাশের বহু মানুষ। তাদের ভাষ্য, এটা অমানবিক। এর বিচার হওয়া দরকার। এসময় তারা ইউনুসকে ঘরে তোলার জন্য অনুরোধ করলেও তাতে রাজি হননি আকলিমা ও তার ছেলেবউ। উপস্থিত লোকজন এই বিষয়ে প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করেন।
জানতে চাইলে মণিরামপুর থানার ওসি মোকাররম হোসেন বলেন, 'খবর পেয়ে সকালে পুলিশ গিয়ে ইউনুসকে ঘরে তোলার জন্য বলে এসেছে। তারা কথা না শুনলে কিছু করার নেই।'
মণিরামপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ওবায়দুর রহমান বলেন, 'বিষয়টি সত্যিই অমানবিক।' ওসির সঙ্গে কথা বলে রাতেই একটা ব্যবস্থা নেবেন বলে জানান ইউএনও।
প্রসঙ্গত, মস্তিষ্ক বিকৃতির অভিযোগে গত চার মাসের বেশি সময় ধরে পুকুরপাড়ে কাঁঠালগাছের সঙ্গে ইউনুসকে বেঁধে রেখেছেন স্ত্রী-ছেলে।

আরও পড়ুন