অগ্নিযুগের স্ফুলিঙ্গ ক্ষুদিরাম বসু

আপডেট: 01:40:53 12/08/2017



img

কবীর মামুন

ক্ষুদিরাম বসু একটি নাম। একটি অগ্নি স্ফুলিঙ্গ! যিনি ফাঁসির মঞ্চে উঠবার আগে সারা ভারতবাসীকে বোমা বানানো শেখাতে চেয়েছিলেন। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করা এই বিপ্লবী জন্মেছিলেন ৩ ডিসেম্বর ১৮৮৯ সালে।
তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির অন্তর্গত মেদিনীপুর জেলা শহরের কাছাকাছি কেশপুর থানার অন্তর্গত মোহবনী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। তার পিতা ত্রৈলকানাথ বসু ছিলেন নাড়াজোল প্রদেশের শহরে আয় এজেন্ট। তার মা লক্ষ্মীপ্রিয় দেবী। তিন কন্যার পর তিনি তার মায়ের চতুর্থ সন্তান। তার দুই পুত্র আগেই মৃত্যুবরণ করেন। অপর পুত্রের মৃত্যুর আশঙ্কায় তিনি তখনকার সমাজের নিয়ম অনুযায়ী পুত্রকে তার বড় বোনের কাছে তিন মুঠি খুদের (শস্যের দানা) বিনিময়ে বিক্রি করে দেন। খুদের বিনিময়ে ক্রয়কৃত শিশুটির নাম পরবর্তীকালে ক্ষুদিরাম রাখা হয়। ক্ষুদিরাম বসু পরবর্তীতে তার বড় বোনের কাছেই বড় হন।
সেবামূলক ও দুঃসাহসিক কাজে আগ্রহী ছিল ছেলেবেলা থেকেই। স্কুলে পড়বার সময়ই তাঁর পরিচয় হয় বিপ্লবী সত্যেন্দ্রনাথ বসুর সাথে। মেদিনীপুর কলেজিয়েট স্কুলের শিক্ষার্থী ছিলেন তিনি। সত্যেন্দ্রনাথ বসুর কাছাকাছি আসবার পরেই তিনি সে যুগের ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদবিরোধী সশস্ত্র সংগঠন ‘যুগান্তর’ দলের সদস্য হন। মেদিনীপুরেই তাঁর বিপ্লবী জীবনের অভিষেক হয়। তৎকালে জ্ঞানেন্দ্রনাথ বসু এবং রাজনারায়ণ বসুর প্রভাবে মেদিনীপুরে একটি গুপ্ত বিপ্লবী সংগঠন হিসাবে গড়ে উঠেছিল ‘যুগান্তর'। সেই সংগঠনের নেতা ছিলেন হেমচন্দ্র দাস কানুনগো এবং সত্যেন্দ্রনাথ বসু ছিলেন হেমচন্দ্র দাসের সহকারী। এটি রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় ব্রিটিশবিরোধীদের দ্বারা পরিচালিত হতো। অল্পকিছু সময়ের মধ্যেই ক্ষুদিরাম তার গুণাবলীর জন্য সবার চোখে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেন। ক্ষুদিরাম সত্যেন্দ্রনাথের সাহায্যে বিপ্লবী দলভুক্ত হয়ে এখানে আশ্রয় পান। ক্ষুদিরাম তাঁরই নির্দেশে "সোনার বাংলা" শীর্ষক বিপ্লবাত্মক ইশতেহার বিলি করে গ্রেপ্তার হন। ১৬ বছর বয়সে ক্ষুদিরাম পুলিশ স্টেশনের কাছে বোমা পুঁতে রাখেন এবং ইংরেজ কর্মকর্তাদের লক্ষ্য করেন। একের পর এক বোমা হামলার দায়ে ৩ বছর পর তাকে আটক করা হয়।
যুগান্তর দলকে সুসংগঠিত করবার লক্ষ্যে সত্যেন্দ্রনাথ এক তাঁতশালা স্থাপন করেছিলেন। মূলত তাঁতশালার আড়ালেই তিনি তাঁর শিষ্যদের লাঠিখেলা, তলোয়ার চালনা, বোমা ফাটানো, পিস্তল, বন্দুক ছোড়া ইত্যাদি শিক্ষা দিতেন। সে সময় বিপ্লবীদের রাজদ্রোহ মামলায় কঠোর শাস্তি দেওয়ার জন্য কলকাতার চিফ প্রেসিডেন্সি ম্যাজিস্ট্রেট কিংস ফোর্ড মরিয়া হয়ে ওঠেন। ব্রিটিশ শাসনের ভিত্তিমূলে কাঁপন ধরাতে বিপ্লবীরা প্রথমেই সিদ্ধান্ত নেন কিংস ফোর্ডকে হত্যা করার।
কিংস ফোর্ডকে হত্যার দায়িত্ব পড়ে ক্ষুদিরাম বসুর উপর। আর তাঁর সহযোগী ছিলেন রংপুরের আরেক যুবক বিপ্লবী প্রফুল্ল চাকী। বিপ্লবীদের সম্ভাব্য আক্রমণ এড়াতে কিংস ফোর্ডকে বদলি করা হয় মজফফরপুরে। দেশাত্মবোধে উদ্বুদ্ধ দুই তরুণ বিপ্লবী রওনা দিলেন মজফফরপুর। দু’জনে আশ্রয় নিলেন কিংস ফোর্ডের বাসভবনের পাশের একটি হোটেলে। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত তাঁরা কিংস ফোর্ডের গতিবিধি লক্ষ করতে থাকেন। কিংস ফোর্ডের বাসভবনের পাশেই ইউরোপিয়ান ক্লাব। অফিস আর ক্লাব ছাড়া কিংস ফোর্ড বাইরে যেতেন না। ১৯০৮ সালের ৩০ এপ্রিল, সে দিন কিংস ফোর্ডের খেলার সঙ্গী ছিলেন অ্যাডভোকেট কেনেডির স্ত্রী ও তাঁর মেয়ে। রাত আটটার দিকে খেলা শেষ করে মিস ও মিসেস কেনেডি কিংস ফোর্ডের গাড়ির মতো হুবহু দেখতে আরেকটি গাড়ি নিয়ে বাড়ির দিকে রওনা হলেন। বাইরে আগে থেকেই দুই বিপ্লবী প্রস্তুত ছিলেন। গাড়িটি ফটক পার হতে নাহতেই প্রচণ্ড শব্দে পুরো শহর কাঁপিয়ে একটি বোমা বিস্ফোরিত হলো। কেনেডির স্ত্রী ও তাঁর মেয়ে ঘটনাস্থলে মারা যান। বেঁচে যান কিংস ফোর্ড। তার অক্ষত গাড়িটি মাত্র কয়েক হাত দূরে দাঁড়িয়ে ছিল। বোমা নিক্ষেপ করেই দুই বিপ্লবী ছুটলেন দুই দিকে। পরদিন সকালে ওয়াইসি রেলস্টেশনে পুলিশের হাতে ধরা পড়লেন ক্ষুদিরাম। প্রফুল্ল চাকীও ধরা পড়েন পুলিশের হাতে। ধরা পড়েই তিনি নিজের পিস্তলের গুলিতে আত্মহত্যা করলেন। ক্ষুদিরাম গ্রেপ্তার হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে গোটা শহর যেন মুহূর্তে ভেঙে পড়ল। পুলিশবেষ্টিত ক্ষুদিরামকে একনজর দেখতে হাজারো লোক ভিড় জমাল ওয়াইসি রেলস্টেশনে। উৎসুক জনতার উদ্দেশে ক্ষুদিরামের কণ্ঠে তখন ধ্বনিত হলো‘বন্দে মাতরম’। ১১ আগস্ট, ১৯০৮ সাল, ঠিক ভোর ছয়টায় ব্রিটিশ সরকার ১৮ বছরের এক তরতাজা যুবককে ফাঁসির মঞ্চে দাঁড় করিয়েছিল। সে সময় কারাফটকের বাইরে হাজারো জনতার কণ্ঠে ধ্বনিত হচ্ছে ‘বন্দে মাতরম’। ফাঁসিতে ঝোলানোর আগে কারা কর্তৃপক্ষ যুবকটির কাছে জানতে চাইল, মৃত্যুর আগে তাঁর শেষ ইচ্ছা কী? যুবকটি এক সেকেন্ড অপেক্ষা নাকরেই নিঃশঙ্কচিত্তে বলে উঠলেন, ‘আমি ভালো বোমা বানাতে পারি, মৃত্যুর আগে সারা ভারতবাসীকে সেটা শিখিয়ে দিয়ে যেতে চাই।’ উপস্থিত কারা কর্তৃপক্ষ সে দিন বিস্মিত হলো যুবকটির মানসিক দৃঢ়তা আর ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের প্রতি তীব্র ঘৃণাবোধ উপলব্ধি করে। সে দিনের সেই যুবকই হচ্ছেন অগ্নিযুগের মহান বিপ্লবী ক্ষুদিরাম বসু।
ব্রিটিশ উপনিবেশ, ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদবিরোধী আন্দোলনের এক মাইলফলক হলেন ক্ষুদিরাম বসু। তিনি অগ্নিমশাল জ্বেলেছিলেন ভারতবাসীর মধ্যে। একশত নব্বই বছরের ব্রিটিশ শোষণের বিরুদ্ধে যারা সংগ্রাম করেছেন, চেয়েছেন স্বাধীনতা, তাদের মধ্যে অন্যতম ক্ষুদিরাম। তাইতো পৃথিবীর সকল মুক্তিকামী মানুষের কাছে ক্ষুদিরাম বসু আদর্শ।
১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ বিদায় হলেও দূর থেকেই নয়া উপনিবেশ চালু রাখার উদ্দেশ্যে তারা নানান কৌশল করে ধর্মের ভিত্তিতে ভাগ করে গেল ভারতকে। জন্ম নিলো দুইটি দেশ- ভারত আর পাকিস্তান। আমরা পাকিস্তানের ভেতর হতে থাকলাম নিপীড়িত, শোষিত, বঞ্চিত, লাঞ্ছিত। ধারাবাহিক সংগ্রাম চলে টানা ২৪ বছর। তারপর সশস্ত্র সংগ্রাম। স্বাধীন পতাকা পাই আমরা। বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য যারা অস্ত্র হাতে নিয়ে অকাতরে বিলিয়ে দিয়েছেন জীবন, সেই সকল বীর সেনানীর পূর্বসূরি ছিলেন ক্ষুদিরাম বসু। স্বাধিকারের আন্দোলনের একজন পথিকৃৎ। যিনি মাত্র ষোল বছর বয়সে কাঁপন ধরিয়ে দিয়েছিলেন ব্রিটিশদের ভিতে। ক্ষুদিরাম জীবন দিয়ে প্রমাণ করে গেছেন যে তিনি মরেননি। বিপ্লবীদের মৃত্যু নাই। তারা বেঁচে থাকে জন্ম-জন্মান্তর বিপ্লবীদের হৃদয়ে। আজও স্বাধীনতার সংগ্রাম তাঁকে স্মরণ করে শ্রদ্ধাভরে।
লেখক : সমাজকর্মী