অনন্য সাহসী মুক্তিযোদ্ধা নড়াইলের আনোয়ার

আপডেট: 02:31:15 15/12/2017



img

স্টাফ রিপোর্টার : বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে নড়াইলের মুক্তিযুদ্ধের গৌরবগাথায় রত্নখচিত আপন মহিমায় সমুজ্জ্বল বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আনোয়ার হোসেন। ঘটনার আকস্মিকতা কিংবা পারিপার্শ্বিকতার চাপে নয়, আজন্ম লালিত স্বপ্ন এবং বিশ্বাসের বাস্তবায়নের জন্য যারা মুক্তি সংগ্রামে দৃঢ়চিত্ত ও সুস্থির সিদ্ধান্তে পাক-বাহিনীর মোকাবেলায় নেমেছিলেন, তিনি ছিলেন তাদেরই একজন।
মিষ্টভাষী, পরোপকারী, অসাম্প্রদায়িক, নির্লোভ মানুষ ছিলেন মো. আনোয়ার হোসেন। ছিলেন সর্বজন শ্রদ্ধেয়। নীতিতে ছিলেন অটল; যিনি মানুষকে ভালোবাসতেন, সম্মান দিতেন, বিপদে-আপদে মানুষের পাশে দাঁড়াতেন। এক কথায় যাকে বলে মানবদরদী। তার জীবন ছিল কর্মময়, ব্যক্তিগত চরিত্র ছিল স্বচ্ছতা ও সততার সৌরভে উদ্ভাসিত। পরিবারের বড় সন্তান হওয়ায় এলাকাবাসী তাকে ‘মিয়া ভাই’ বলে সম্বোধন করতেন।
১৯৪৮ সালের ৮ জুন বৃহত্তম যশোর জেলার নড়াইল মহকুমার (বর্তমানে জেলা) কালিয়া উপজেলার চাঁচুড়ী গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্ম নেন আনোয়ার হোসেন। সমাজের যে কোনো অন্যায়-অত্যাচারের বিরুদ্ধে তার অবস্থান ছিল কঠোর। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে গণতন্ত্র ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার প্রতিটি আন্দোলন-সংগ্রামে স্থানীয়ভাবে তিনি সক্রিয়ভাবে অংশ গ্রহণ করতেন। ‘বীর বাঙালি অস্ত্র ধরো / বাংলাদেশ স্বাধীন করো’ সেøাগানে উদ্বুদ্ধ ছিলেন তিনি।
১৯৭১ সালের ৯ ডিসেম্বর নড়াইল শহরকে হানাদারমুক্ত করার পরিকল্পনা অনুযায়ী গ্রুপ কমান্ডার আমির হোসেনের নেতৃত্বে বর্তমান নড়াইল সরকারি ভিক্টোরিয়া কলেজের দক্ষিণ দিক থেকে আক্রমণ চালালে পাল্টা আক্রমণে পাকিস্তাানি সেনাদের সঙ্গে তাদের সম্মুখযুদ্ধ শুরু হয়। এই সম্মুখ যুদ্ধটি ছিল তার সবচেয়ে বড় যুদ্ধ। প্রায় চার ঘণ্টা ধরে তাদের তুমুল গুলি চালাতে হয়। রাত তিনটার দিকে আনোয়ার হোসেনের ঠিক ডান পাশে অবস্থানরত সহযোদ্ধা বাগডাঙ্গা গ্রামের মতিয়ার রহমান আর ইহলোকে নেই, পাক সেনাদের গুলি খেয়ে প্রাণ ত্যাগ করেছেন। নড়াইল শহরের পানি উন্নয়ন বোর্ডের বাংলোতে অবস্থানরত পাক মিলিটারিকে আত্মসমর্পণের নির্দেশ দিলে তারা অস্বীকার করেন। এ সময় মুক্তিবাহিনীর সদস্যরা চর্তুদিক থেকে গুলিবর্ষণ শুরু করলে পাক মিলিটারিরা আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়। এখানে কয়েকজন পাক মিলিটারি নিহত হয় এবং অন্যদের আটক করা হয়।
আনোয়ার হোসেনের বাবা ছিলেন মরহুম আবুল কাশেম মোল্যা ও মাতা রওশনারা বেগম। বাবা ছিলেন পেশায় ব্যবসায়ী। সদ্য সমাপ্ত স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রভাবে জীবন সংগ্রামের কঠিন পথ পরিক্রমায় তার শিক্ষাজীবন বেশি দূর না এগোলেও তিনি ১৯৭২ সালে নড়াইল জেলা স্কুল থেকে মাধ্যমিক সার্টিফিকেট পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। তিনি ১৯৭১ সালের সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মাসের দিকে প্রশিক্ষণ নেন তিনি।
এরপর আট নম্বর সেক্টরের কমান্ডার মেজর এম এ মনজুরের অধীনে স্থানীয় কমান্ডার আমীর হোসেনের নেতৃত্বে আনোয়ার হোসেন যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন। বীরত্বের সঙ্গে আনোয়ার হোসেন ও তার দল সাহসীকতার সঙ্গে যুদ্ধ করেন। তিনি বাগডাঙ্গা, ছাগলছড়ি, আটলিয়া, বারইপাড়া ও কালিয়াসহ নড়াইলের বিভিন্ন স্থানে সংগঠিত সশস্ত্র যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন তিনি।
রণাঙ্গনের সফল এই যোদ্ধা পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের একজন সরকারি কর্মচারী হিসেবে ২৫ বছরের কর্মজীবন শেষ করে ২০০২ সালে অবসর নেন। গুণী এই মানুষটি ২০০৬ সালের ১৪ ডিসেম্বর মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণের কারণে ঢাকার অ্যাপোলো হাসপাতাল চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃৃত্যুবরণ করেন। জন্মস্থান চাঁচুড়ী গ্রামে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সমাহিত করা হয় তাকে।