অনলাইনে বেচাকেনা রমরমা

আপডেট: 01:22:10 09/06/2018



img

হিটলার এ হালিম : যানজট ঠেলে, বাজার ঘুরে দরদাম করে পছন্দের জিনিসটি কেনা এ দেশের মানুষের চিরায়ত অভ্যাস। এই অভ্যাসের ফাঁকফোকর গলে কখন যেন ঢুকে পড়েছে অনলাইনে কেনাকাটা। অনলাইনে বিভিন্ন সাইটে ঘুরে ঝাঁচকচকে জিনিসপত্র দেখে অর্ডার দিয়ে, ঘরে বসে পণ্য বুঝে নিয়ে দাম মিটিয়ে দেওয়ার মধ্যেও অনেকে স্বস্তি খুঁজে পান। আবার কেউ উপহারের পণ্যটি কিনে দাম মিটিয়ে দিচ্ছেন বিকাশ ও রকেটের মাধ্যমে, নয়তো ডেবিট বা ক্রেডিট কার্ড দিয়ে। এরপর পণ্যটি অনলাইনওয়ালারা পৌঁছে দিচ্ছেন নির্দিষ্ট ঠিকানায়।
গেল কয়েক বছর ধরে দেখা যাচ্ছে এমন চিত্র। দেশে গড়ে উঠেছে অসংখ্য ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান। এরমধ্যে অর্গানিক প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা হাতে গোনা, বেশিরভাগই হলো ফেসবুকনির্ভর প্রতিষ্ঠান। ই-কমার্স হলেও যার পোশাকি নাম এফ-কমার্স। দিনে দিনে দেশে ই-কমার্সের বাজার বড় হচ্ছে। বাজার বড় হতে হতে তা ৪০০ কোটি টাকায় গিয়ে ঠেকেছে। বিভিন্ন পার্বণে অনলাইনগুলো জমজমাট হয়ে ওঠে। ঈদ এর  মধ্যে অন্যতম।
অনলাইনে এবারের ঈদে জামা-কাপড়ের পাশাপাশি দেদার বিক্রি হচ্ছে স্মার্টফোন। তবে নতুন আইটেম হিসেবে বিক্রি হচ্ছে সেমাই, চিনিও। তবে দুয়ারে ফুটবল বিশ্বকাপ হওয়ায় বিভিন্ন দলের জার্সি, পতাকা, ফুটবলসহ বিভিন্ন এক্সেসরিজও বিক্রি বেড়েছে অনলাইনে। কোনো কোনো ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান এসব অর্ডার সরবরাহ করতে রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ঈদ ও বিশ্বকাপের প্রভাবে অনলাইনে বেচা-বিক্রি জমজমাট হয়ে উঠেছে। বিভিন্ন ধরনের পেমেন্ট মাধ্যমগুলো ক্যাশব্যাকের অফার দিচ্ছে। ফলে ছাড় (ডিসকাউন্ট) দিয়ে পণ্য বিক্রি করে, আবার নগদ অর্থ ফিরে পাওয়ার কারণেও বিক্রি বেড়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বছর পাঁচ-সাত ধরে জমে ওঠা ই-কমার্সে জামা-কাপড় থেকে শুরু করে স্যুট, গৃহস্থালি পণ্য, শৌখিন পণ্য, জুতা-স্যান্ডেল, কাঁচাবাজার, মাছ, মাংস, স্মার্টফোন, গ্যাজেটস, ফাস্টফুড সবই পাওয়া যায়। বাগডুম ডট কম, পিকাবু ডটকম, দারাজ, কিকশা, চাল-ডাল ডট কম, প্রিয়শপ ডট কম, গিফটমেলা ডট কম, আমার দেশ আমার গ্রাম ইত্যাদি সাইটেও বিক্রির হার ভালো। অন্যদিকে এফ-কমার্স তথা ফেসবুককে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা ই-কমার্সও বেশ জমজমাট। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, দেশের মোট ই-কমার্সের ৪০ ভাগের বেশি এখন ফেসবুকের মাধ্যমে হচ্ছে। 
ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান আজকের ডিলের প্রধান নির্বাহী ফাহিম মাশরুর বলেন, ‘গত সপ্তাহটা অনলাইনে কেনাকাটার একটা ভালো সময় গেছে। এখন চলছে মোটামুটিভাবে।’
তিনি জানান, তার প্রতিষ্ঠান ১০ জুনের পরে ঢাকার বাইরের আর কোনো অর্ডার গ্রহণ করবে না। কারণ হিসেবে তিনি জানান, ঢাকার বাইরে ডেলিভারি দেওয়াটা খুব সমস্যার।
ফাহিম মাশরুর বলেন, ‘দেশের ই-কমার্স খাত এখন ৪০০ কোটি টাকার। এর অর্ধেক আবার ফেসবুকনির্ভর ই-কমার্স।’
তিনি মনে করেন, বিদেশি ই-কমার্স কোম্পানির আগ্রাসন ঠেকাতে পারলে দেশীয় ই-কমার্স ভালো করবে।
ই-কমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ই-ক্যাব) সাধারণ সম্পাদক আবদুল ওয়াহেদ তমাল বললেন, ‘ঈদকে সামনে রেখে অনলাইনে বিক্রি দ্বিগুণেরও বেশি বেড়ে গেছে। এটা শুভ লক্ষণ যে, বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানের দিনে প্রায় দেড় থেকে দুই হাজারের মতো অর্ডার আসছে। ঈদে জামাকাপড়, ব্র্যান্ড আইটেম, স্মার্টফোনই বেশি বিক্রি হয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘এবারের ঈদে বিক্রির চার্ট দেখে আমাদের ধারণা হয়েছে, ঈদের বাজারও (সেমাই, চিনি, দুধ, পোলাও চাল ইত্যাদি) এখন মানুষ অনলাইনে কিনছেন।’
অন্যান্যবার কম থাকলেও এবার এটা ভালোই চলেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
ই-ক্যাবের সাধারণ সম্পাদক বলেন, ‘দেশের ই-কমার্সের গ্রোথ এখন ২০ শতাংশের বেশি। সাধারণত দিনে গড়ে ২০ হাজারের মতো অর্ডার জমা পড়ছে। সে হিসাবে এখন এর পরিমাণ দ্বিগুণ হয়ে গেছে।’
গ্রামের মানুষের কাছে অবকাঠামোগত সমস্যার কারণে ই-কমার্স পৌঁছানো যাচ্ছে না এমন অভিযোগ করে তমাল বলেন, ‘আমরা অবকাঠামো নির্মাণ করতে না পারলেও যা আছে তা ব্যবস্থাপনার উদ্যোগ গ্রহণ করেছি। দেশের যে সাড়ে আট হাজার পোস্ট অফিস রয়েছে, সেসব পোস্ট অফিস ব্যবহার করে প্রত্যন্ত এলাকায় ই-কমার্সের মাধ্যমে পণ্য সেবা পৌঁছানোর উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। এর জন্য পোস্ট অফিসের জনশক্তিকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। পোস্ট অফিসের মাধ্যমে ই-কমার্স চালু করা গেলে দেশের মধ্যেই ই-কমার্সের বড় একটা বাজার তৈরি হবে।’
বেসিস ই-কমার্স অ্যালায়েন্সের কো-চেয়ার ও ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান প্রিয়শপ ডট কমের প্রধান নির্বাহী আশিকুল আলম খান বলেন, ‘ই-কমার্স ইন্ডাস্ট্রির গ্রোথ সন্তোষজনক। গত কয়েক বছরে এই সেক্টরে প্রায় ২-৩ লাখ লোকের কর্মসংস্থান হয়েছে। বৈদেশিক বিনিয়োগ এসেছে এবং আরো আসার পথ উন্মোচিত হয়েছে।’
সরকার দ্রুত ডিজিটাল কমার্স নীতিমালা অনুমোদন দিয়ে দেশীয় উদ্যোক্তাদের স্বার্থ রক্ষা করবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
তিনি বলেন, ‘ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, রাজশাহী, কুমিল্লায় ভালো প্রসার হলেও লাস্ট মাইল পর্যন্ত আমরা এখনো যেতে পারিনি। বিনিয়োগবান্ধব পলিসি, লজিস্টিক সমাধানসহ গ্রাহকদের স্বার্থ রক্ষা নিয়েও কাজ করতে হবে। যেন গ্রাহক প্রতারিত হয়ে অনলাইনবিমুখ না হয়।’
নিজের প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে আশিকুল আলম খান বলেন, ‘এবার ঈদ ও বিশ্বকাপ একসঙ্গে হওয়ায় ঈদের বিক্রি কয়েকগুণ বেড়েছে। বিশ্বকাপ উপলক্ষে এক্সেসরিজ বেশি বিক্রি হচ্ছে। পেমেন্ট মাধ্যমগুলোতে ক্যাশব্যাক ও ছাড় খুবই জনপ্রিয় হয়েছে।’ ঢাকার বাইরে বিক্রি বেশি হয়েছে বলে তিনি জানান।
অনলাইনেও এবার প্রযুক্তি পণ্য দেদার বিক্রি হচ্ছে। এরমধ্যে এগিয়ে আছে স্মার্টফোন। শাওমি মোবাইলের এ দেশীয় পরিবেশক সোলার ইলেকট্রো বাংলাদেশ লিমিটেডের (এসইবিএল) প্রধান নির্বাহী দেওয়ান কানন জানান, ঈদ উপলক্ষে শাওমি স্টোরের (অনলাইন স্টোর) বিক্রি ৫০ ভাগ বেড়ে গেছে। স্মার্টফোনের বিক্রি বাড়লেও শাওমির এক্সেসসরিজ বেশি বিক্রি হচ্ছে।’
তিনি বলেন, ‘বিভিন্ন ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান অন্যান্য সময়ে যে পরিমাণ স্মার্টফোন আমাদের কাছ থেকে নিয়ে থাকে, ঈদ উপলক্ষে তারা দ্বিগুণ পণ্য নিচ্ছে।’
প্রসঙ্গত, দেশে ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা শতাধিক। তবে এর মধ্যে সক্রিয় আছে হাতে গোনা কয়েকটি প্রতিষ্ঠান। অন্যদিকে, ই-কমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ই-ক্যাব) সূত্রে জানা গেছে, দেশে ফেসবুকনির্ভর ই-কমার্স উদ্যোক্তার সংখ্যা দশ হাজারের বেশি। ঈদ উপলক্ষে প্রায় সবারই বিক্রি বেড়েছে। দেশের মোট ই-কমার্সের প্রায় ৪০ ভাগ হচ্ছে ফেসবুকের মাধ্যমে।
সূত্র : বাংলা ট্রিবিউন

আরও পড়ুন