অনলাইন মার্কেটপ্লেসে গরু বেচেন ফারুক

আপডেট: 05:51:02 13/08/2018



img
img

আনোয়ার হোসেন, মণিরামপুর (যশোর) : মণিরামপুরের দেশি গরুর খামারি ওমর ফারুক। সফলভাবে গরু পালনে বেশ পরিচিতি রয়েছে তার। ফারুকের খামারে পোষা ষাঁড়গুলো প্রস্তুত করা হয় কুরবানি ঈদের হাটে বিক্রির জন্য। এবারের ঈদের হাটে বিক্রির জন্য তিনি ৬১টি দেশি গরু প্রস্তুত করেছেন। তার প্রতিটি গরুর দাম ৩২ হাজার থেকে এক লাখ ২৫ হাজার টাকার মধ্যে।
ফারুক কিন্তু তার খামারের ষাঁড় স্থানীয় কোনো হাটে বিক্রি করেন না। খামারে পোষা ষাঁড়গুলো বিক্রি করেন তিনি ঢাকার সাভার, নবীনগর ও কেরানীগঞ্জে। আর তা বিক্রি হয় অনলাইনের মাধ্যমে। এবারের ষাঁড়গুলোর ছবি তুলে সঙ্গে বিক্রয়মূল্য দিয়ে আগেই অনলাইনে আপ করা হয়েছে। যাতে অনেক সাড়াও পেয়েছেন তিনি। প্রতিবছর এভাবে ‘বিক্রয়ডটকম’ নামের একটি অনলাইন বাজারের মাধ্যমে ষাঁড়গুলো বিক্রি করেন তিনি। আর এতে বেশ সুনামও কুড়িয়েছেন ফারুক।
নিউজিল্যান্ডভিত্তিক একটি গ্রুপ অনলাইনে গরু বিক্রি নিয়ে ২৪টি দেশের মধ্যে জরিপ চালিয়ে আসছে। গত দুই বছর দেশগুলোর মধ্যে গরু বিক্রিতে দ্বিতীয় হয়ে পুরস্কার জিতেছেন ফারুক।
মণিরামপুরের ঢাকুরিয়া ইউনিয়নের শ্রীপুর গ্রামের আব্দুল করিম মাস্টারের বড় ছেলে ওমর ফারুক। ১৯৯২ সালে এসএসসি পাশ করে স্থানীয়ভাবে শেয়ারে কাঠ ও ভুষি মালের ব্যবসা শুরু করেন তিনি। কয়েক বছর ব্যবসা করে উন্নতি তো হয়ইনি, বরং আসল টাকা খুইয়েছেন তিনি। এরপর ২০০৩ সালে ছোটভাই আসাদুল্লার চাকরির সুবাদে ঢাকার কেরানীগঞ্জের ‘গ্রæপ কিউএ’ নামের একটি কোম্পানির চেয়ারম্যান কাজী জয়নুল আবেদীনের সঙ্গে পরিচয় হয় তার। তিনি ফারুককে দেশি গরু পোষার কাজে উদ্বুদ্ধ করেন। এরপর সেখানেই ফারুককে তিন দিনের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। প্রশিক্ষণ শেষে দুই লাখ ৩৫ হাজার টাকা আর্থিক সহায়তা দেন তিনি। বাড়ি ফিরে নয়টি দেশি গরু কিনে খামার শুরু করেন ফারুক। প্রথম বছর কুরবানির হাটে গরু বিক্রি করে ৪০-৪৫ হাজার টাকা লাভ হয় ফারুকের। এরপর আর পেছনে ফিরতে হয়নি তাকে। দেশি গরু পুষে ধীরে ধীরে বেশ সাফল্য পান ফারুক। এই গরুর খামার করে তিনি এখন দুই ছেলে-মেয়েকে বিশ^বিদ্যালয়ে পড়াচ্ছেন।
প্রতি বছর কুরবানির ঈদের পর কেশবপুর, মণিরামপুর হাটসহ বিভিন্ন গ্রাম থেকে দেশি গরু কিনে খামারে পোষেন ফারুক। এরপর সেগুলো বিক্রি করেন কুরবানির ঈদের আগে। এবারে বিক্রিযোগ্য ৬১টি গরু ১৮-৩৩ হাজার টাকা করে ২০ লাখ টাকায় কিনে নয় মাস বাড়ির খামারে পুষেছেন ফারুক। সেই ৬১টি গরু ঈদের আগে তিনি ৩০ লাখ টাকায় বিক্রি করবেন বলে আশাবাদী। যেখান থেকে সব খরচ বাদ দিয়েও তার চার লাখ টাকা লাভ হওয়ার কথা।
সম্প্রতি ঢাকুরিয়ার শ্রীপুরে ফারুকের খামারে গিয়ে কথা হয় তার সঙ্গে। হাস্যোজ্জ্বল ফারুক বলেন, ‘‘আমার মেজভাই আসাদুল্লাহ ঢাকায় ‘গ্রুপ কিইএ’-তে চাকরি করে। সেই সুবাদে তার প্রতিষ্ঠানের মালিক কাজী জয়নুল আবেদীনের সাথে কথা হয়। তিনি আমাকে দেশি গরু পালনে উদ্বুদ্ধ করে তিন দিনের প্রশিক্ষণ দেন। প্রশিক্ষণ শেষে দুই লাখ ৩৫ হাজার টাকা দিয়ে আমাকে খামারের ব্যবসায় নামান। তার কথামতো বাড়ি এসে নয়টি গরু কিনে ২০০৩ সালে দেশি গরুর খামার স্থাপন করি। সেই শুরু। পরে আস্তে আস্তে স্যারের টাকা শোধ করে দিই। এখন আমার বাড়িতে ছয়টি গোয়ালে ৬১টি দেশি ষাঁড় রয়েছে। যেগুলো এই ঈদের আগে বিক্রি করা হবে।’’
‘‘আমি কোনো হাটে নিয়ে ষাঁড়গুলো বিক্রি করি না। আমার মেজভাই আসাদুল্লার ঢাকায় ‘জাজ করপোরেশন’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। সেই প্রতিষ্ঠানের একটি প্রকল্পের নাম ‘জাজ এগ্রো’। এই প্রকল্পের মাধ্যমে আমার খামারের গরুগুলোর ছবিসহ সম্ভাব্য বিক্রিমূল্য ‘বিক্রয়ডটকম’ নামের একটি অনলাইন মার্কেটপ্লেসে আপলোড করা হয়। এরপর ক্রেতারা আমাদের সাথে যোগাযোগ করেন। সবকিছু ঠিকঠাক হলে নিজ দায়িত্বে ক্রেতার ঠিকানায় আমরা গরু পৌঁছে দিই।’’
এবার গরুর ছবি আফলোড করার পর বেশ সাড়া মিলেছে বলে দাবি ফারুকের।
ফারুক বলেন, ‘আমরা কুরবানির ঈদের এক-দুই দিন আগে থেকে গরু বিক্রি শুরু করি। ঈদের তিন-চার দিন আগে গরুগুলো ঢাকায় নেওয়া হবে। গত বছর এই প্রক্রিয়ায় ৫৪টা গরু ৩৩ লাখ টাকায় বিক্রি করেছি। তখন তিন লাখ ৮০ হাজার টাকা লাভ হয়েছিল। এছাড়া নিউ জিল্যান্ডভিত্তিক একটি দল অনলাইনে এই গরু বিক্রি জরিপ করে প্রথম সারির কয়েকজনকে পুরস্কৃত করে। পর পর দুই বছর আমি দ্বিতীয় হয়েছি। তখন তারা আমাকে ২০ হাজার টাকা করে পুরস্কার দিয়েছিল। তবে এবার আমি জরিপে প্রথম হবো বলে আশাবাদী।’
ফারুকের এই সাফল্যের পেছনে উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তার বেশ খানিকটা অবদান রয়েছে বলে এমনটি জানিয়েছেন তিনি। তিনি বলেন, ‘উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা আবুজার সিদ্দিকী স্যার সবসময় আমার খামারের খবর নেন। তিনি আমাকে এইকাজে প্রশিক্ষণও করিয়েছেন।’
এদিকে সফল গরু খামারি ওমর ফারুক লাভের ব্যাপারে যেমন আশাবাদী তেমনি ঈদের আগে গরু বিক্রি নিয়ে তার মাঝে শঙ্কাও কম নয়। তিনি বলেন, ‘যদি সরকার ঈদের আগে ভারতের গরু দেশে ঢুকতে না দেয়, তাহলে আমরা খামারিরা গরু পুষে লাভবান হবো। আর যদি ভারতের গরু ঢোকে তাহলে আমরা ক্ষতির সম্মুখিন হব। তখন খামার টিকিয়ে রাখা কঠিন হবে।’
জানতে চাইলে মণিরামপুর উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ড. আবুজার সিদ্দিকী বলেন, ‘উপজেলায় সবচেয়ে বড় গরুর খামারি শ্রীপুরের ওমর ফারুক। ওমর তার খামারে সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক উপায়ে গরু মোটাতাজা করেন। আমরা তার খামার সবসময় তদারকি করি। তাকে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিই। আমি ফারুকের খামারের সমৃদ্ধি কামনা করছি।’