'যশোর রোডের' গাছ কাটার বিকল্প আছে কি!

আপডেট: 07:44:21 14/01/2018



img

সুবর্ণভূমি ডেস্ক : চার লেনে উন্নীত করতে 'যশোর রোডের' গাছগুলো কেটে ফেলার সিদ্ধান্ত হয় গত ৬ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত এক সভায়। এই সভা শেষ হওয়ার পর পরই পাঠকপ্রিয় নিউজপোর্টাল সুবর্ণভূমি এ সংক্রান্ত রিপোর্টটি প্রকাশ করে।
সেই শুরু। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে প্রথম এই বিষয়ে অভিমত দেয় বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি। দলটির জেলা শাখার সম্পাদকমণ্ডলীর সভায় গাছ কাটার সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করা হয়। বলা হয়, গাছ না কেটেও রাস্তা চার লেনে উন্নীত করার সুযোগ আছে। সেই রিপোর্টটিও সুবর্ণভূমিতে প্রকাশিত হয়। ওয়ার্কার্স পার্টির এই অবস্থানের পক্ষে-বিপক্ষে অনেক পাঠক মতামতও দেন। সুবর্ণভূমি ছাড়াও গণমাধ্যমগুলোতে একের পর এক এই সংক্রান্ত রিপোর্ট প্রকাশিত ও প্রচারিত হয়। ঝড় ওঠে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। সরকারি সিদ্ধান্তের পক্ষে-বিপক্ষে নানা অভিমত উঠে আসে লেখাগুলোতে। আজ এই বিষয়টি নিয়ে খ্যাতনামা গণমাধ্যম বিবিসির বাংলা সার্ভিসও একটি রিপোর্ট করেছে। ফারহানা পারভীনের করা রিপোর্টটি তুলে দেওয়া হলো সুবর্ণভূমির পাঠকদের জন্য :
বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় জেলা যশোর শহর থেকে বেনাপোল পর্যন্ত রাস্তার দৈর্ঘ্য ৩৮ কিলোমিটার।
এই রাস্তার দুই পাশে সড়ক ও জনপথের হিসেব অনুযায়ী গাছ রয়েছে দুই হাজার ৩১২টি।
এর মধ্যে দুইশোর অধিক গাছ রয়েছে যেগুলোর বয়স ১৭০ বছরের বেশি। গাছগুলোর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে নানা ঐতিহাসিক ঘটনা এবং স্থানীয় মানুষের আবেগবিজড়িত স্মৃতি।
তাই গাছগুলো একেবারে কেটে নিশ্চিহ্ন করে রাস্তা সম্প্রসারণের বিষয়টি অনেকেই মেনে নিতে পারছেন না।
এই রাস্তাটি সম্প্রসারণের প্রকল্পটি পাশ হয় ২০১৭ সালের মার্চ মাসে।
যশোরের সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী জাহাঙ্গীর আলম বলছিলেন, যেভাবে প্রকল্পটি পাশ হয়েছে ঠিক সেভাবে বাস্তবায়ন করতে গেলে গাছ কাটা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই।
তিনি বলেন, রাস্তা সম্প্রসারণের জন্য টেন্ডার অনুমোদনের কাজ শেষ পর্যায়ে রয়েছে। এ মাস অর্থাৎ জানুয়ারিতে হয়ে গেলে ফেব্রুয়ারিতে কাজ শুরু করা সম্ভব হবে।
তবে গাছগুলো রেখে বিকল্প কোনো পদ্ধতিতে রাস্তা সম্প্রসারণের নকশা বা প্রকল্প করা যেত কিনা- এমন প্রশ্নে মি. আলম কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
গত ৬ জানুয়ারি শনিবার যশোর জেলা প্রশাসকের সভা কক্ষে এক মতবিনিময় সভায় সিদ্ধান্ত হয় এই গাছ কাটার বিষয়ে।
এরপর থেকেই যশোর রোডের গাছ যাতে না কাটা হয় সেটা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম ফেসবুকে বেশ কয়েক দিন ধরেই সমালোচনা হচ্ছে।
গাছ রক্ষায় স্থানীয় একজন আন্দোলনকারী জিল্লুর রহমান বলছিলেন, এই রাস্তার দুই পাশেই ৫০ ফুটের মতো খালি জায়গা রয়েছে। যেটা তারা সহজে ব্যবহার করতে পারে।
এছাড়া মূল রাস্তার দুই পাশের গাছ রেখে তার পাশে লেন তৈরি করতে পারে সওজ। "যশোর রোডের গাছ রেখেই রাস্তা সম্প্রসারণ সম্ভব" বলছিলেন মি. রহমান।
তিনি বলছিলেন কর্তৃপক্ষ চাইলেই গাছগুলো রক্ষা করতে পারেন। তবে তিনি অভিযোগ করে বলেন, রাস্তা সম্প্রসারণের চেয়ে একটা মহলের বেশি আগ্রহ রয়েছে গাছ কেটে লুটপাট করার।
জেলার সব রাস্তা জেলা পরিষদের অন্তর্ভুক্ত। তাই এই গাছ কাটা বা রাখার সিদ্ধান্ত জেলা পরিষদের ওপর বর্তায়।
জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান সাইফুজ্জামান পিকুল বলছিলেন, মিটিংয়ে সর্বসম্মতিক্রমে গাছ কাটার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত হয়েছে।
তিনি আরো বলেন, গাছগুলো অনেক পুরনো হয়েছে এবং গাছের ডালপালা ভেঙে সম্প্রতি কিছু দুর্ঘটনা হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।
তিনি আরো জানান, গাছগুলো অনেক পুরনো হয়ে যাওয়াতে ডালপালা শুকিয়ে যাচ্ছে সেটা একটা কারণ। আরেকটা কারণ ফোর লেন করার জন্য এর কোনো বিকল্প নেই। তবে তিনি আশ্বস্ত করে বলেন, রাস্তা নির্মাণের পর ওই সব স্থানে নতুন গাছ লাগানো হবে।

কেন যশোর রোডের গাছ বিখ্যাত
এই মহাসড়কটি ঐতিহাসিকভাবে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কলকাতা থেকে যশোর পর্যন্ত বিস্তৃত।
ব্রিটিশ শাসন আমলে যশোর শহরে একটি বিমানঘাঁটি স্থাপন করা হয়। সেই সময় এই বিমানঘাঁটির সঙ্গে কলকাতার যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত করার জন্য যশোর রোড আধুনিকভাবে নির্মাণ করা হয়।
সেসময় অনেক গাছ লাগানো হয় রাস্তার দুপাশে। বর্তমানে যশোর রোড বলতে দমদম থেকে বনগাঁ এর পেট্রোপোল সীমান্ত পর্যন্ত মহাসড়ককে বোঝায়।
১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় এই যশোর রোড দিয়েই লাখ-লাখ শরণার্থী ভারতে গিয়ে আশ্রয় নেন। শরণার্থীদের সেই ঢল নিয়ে বিখ্যাত মার্কিন কবি অ্যালেন গিন্সবার্গ 'সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড' নামে একটি কবিতা লেখেন।
পরবর্তীতে গায়ক বব ডিলান এবং অন্যদের সহায়তায় সেই কবিতাকে তিনি গানেও রূপ দিয়েছিলেন।