যশোর হাসপাতালে গড়ে প্রতিদিন পাঁচজনের বেশি রোগীর মৃত্যু

আপডেট: 09:52:37 23/12/2016



img

স্টাফ রিপোর্টার : প্রশাসনিক তদারকি না থাকায় কমেছে যশোর জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাসেবার মান। যথেষ্ট চিকিৎসক, সেবিকা ও কর্মচারী থাকা সত্ত্বেও জরুরি মুহূর্তে চিকিৎসা না পেয়ে ঘটেছে রোগীর মৃত্যু। কর্মক্ষেত্র ফেলে মিটিং, ক্লিনিকে রোগী দেখার কারণে ব্যাহত হয়েছে সেবা কার্যক্রম। বছরজুড়ে সেবিকাদের ওয়ার্ডে ঠিকমতো দায়িত্ব পালন না করা নিয়েও রোগী ও স্বজনদের ছিলো বিস্তুর অভিযোগ। কর্তাদের লাগাম ছাড়া দায়িত্বহীনতা ও বিভিন্ন রোগের কারণে চলতি বছরে প্রতিদিন গড়ে পাঁচজনেরও বেশি রোগীর মৃত্যু হয়েছে হাসপাতালে।
এদিকে, চলতি বছরে যশোর স্বাস্থ্যবিভাগে বিভিন্ন ব্যর্থতার মাঝে সবচেয়ে বড় সফলতা আট বছর পরে মেডিকেল কলেজের নিজস্ব ক্যাম্পাসে অ্যাকাডেমিক কার্যক্রম শুরু। চলতি বছরের শুরুতেই এমবিবিএস পাস করে নতুন ইন্টার্ন চিকিৎসক হিসাবে ২৬জন হাসপাতালে পদায়ন ছিলো বছরের উল্লেখযোগ্য।
হাসপাতালের পরিসংখ্যানে দেখা গিয়েছে, চলতি বছরের তিনটি বিভাগ থেকে মোট চার লাখ ৮৪ হাজার ৯৫৩ জন পুরুষ, মহিলা ও শিশু চিকিৎসাসেবা নিয়েছে। এর মধ্যে অন্তঃবিভাগ থেকে চিকিৎসাসেবা নিয়েছে ৫৯ হাজার ৪৪৯জন রোগী । বিভিন্ন রোগসহ অবহেলায় এ সময় এক হাজার ৯৬৬জন রোগীর মৃত্যু হয়েছে। সে হিসাবে গড়ে প্রতিদিন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় পাঁচজনেরও বেশি রোগীর মৃত্যু হয়েছে। এছাড়াও হাসপাতালের জরুরি ও বহিঃবিভাগ থেকে চার লাখ ২৫হাজার ৫০৪জন পুরুষ, মহিলা ও শিশু চিকিৎসাসেবা নিয়েছে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ১৮ ডিসেম্বর পর্যন্ত হাসপাতালে পরিসংখ্যান থেকে এসব মিলেছে।
যশোরসহ আশপাশের জেলা উপজেলা থেকে বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ২৪ হাজার ১৮১জন পুরুষ, ২৭ হাজার ৭০৭জন মহিলা এবং ৭হাজার ৫৬১জন শিশু ভর্তি হয়ে চিকিৎসাসেবা নিয়েছে। বহিঃবিভাগ থেকে প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়েছে ১লাখ ৩১হাজার ১০২জন পুরুষ, ২লাখ ৩হাজার ৬৫৭জন মহিলা ও ৬০ হাজার ৩৫১ শিশু। এছাড়াও হাসপাতালের জরুরি বিভাগ থেকে ১৭হাজার ৬৯৮ জন পুরুষ, ১০ হাজার ১৮৮জন মহিলা এবং ২হাজার ৫০৪ শিশু চিকিৎসাসেবা পেয়েছে।
এদিকে, রোগীদের জন্য হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজ মিলে ১১৪জন চিকিৎসক, ২৬ জন ইন্টার্ন চিকিৎসক, ১৮৭জন সেবিকা ও ৩৫০জন কর্মচারী রয়েছে। তবে, অভিযোগ রয়েছে চিকিৎসক ও সেবিকা, কর্মচারী থাকলেও হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা অধিকাংশ রোগী হয়রানি ও সেবা অবহেলার শিকার হন বলে অভিযোগ রয়েছে। আবার অধিকাংশ রোগী চিকিৎসা অবহেলায়ও মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে। যা নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের পর তদন্ত কমিটি গঠন হলেও তা আজও আলোর মুখ দেখেনি।
অপরদিকে, চলতি বছরে হাসপাতালে নতুন মেশিনারি সংযোজন না হলেও চলতি বছরের মে মাসে মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস পাস করে ২৬জন নতুন চিকিৎসক ইন্টার্ন হিসাবে হাসপাতালে যোগদান করেন। জুলাই মাসে অ্যাকাডেমিক কার্যক্রম হাসপাতাল থেকে নিজস্ব ক্যাম্পাসে স্থানান্তর হয়েছে। এ বাদেও চলতি বছরের ৭ এপ্রিল নিজস্ব ক্যাম্পাসে মেডিকেল কলেজ চালুর দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে মেডিকেল কলেজের অস্থায়ী অ্যাকাডেমিক ভবন ভাংচুর, করোনারি কেয়ার ইউনিটের চিকিৎসাসেবা হ য ব র ল অবস্থা। হাসপাতালের সিসি ক্যামেরা বন্ধ, ১২ চিকিৎসকের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা, ১৫জন চিকিৎসকের ডেপুটেশন আদেশ বাতিল, আড়াই বছরেও তিনটি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে চিকিৎসাসেবা চালু না হওয়া, ৬৯ বছর পরে যশোরে কালাজ্বরের আবির্ভাব এবং সর্বশেষ গত ১২ ডিসেম্বর চিকিৎসকদের নির্বাচনী প্রচার সভার কারণে হাসপাতালে আড়াই ঘণ্টা সেবা বন্ধ ছিল। এসময় চিকিৎসাসেবা না পেয়ে প্রসূত রোগীসহ গর্ভের সন্তানের মৃত্যুর ঘটনা পত্রিকার শিরোনাম হয়েছে।
হাসপাতালে একাধিক ভর্তি রোগীর স্বজনরা অভিযোগ করেন, হাসপাতালের ওয়ার্ডে কর্তব্যরত সেবিকারা ঠিকমত ওয়ার্ডে থাকেন না। চিকিৎসকরা রাউন্ড দিয়ে চলে গেলে তারাও বিভিন্ন অজুহাতে ওয়ার্ডের বাইরে অথবা অন্য ওয়ার্ডে গিয়ে গল্পেগুজবে ব্যস্ত থাকেন।
এ ব্যাপারে হাসপাতালের সহকারী পরিচালক ডা. একেএম কামরুল ইসলাম বেনু বলেন, নির্বাচনী সভা হলেও হাসপাতালের চিকিৎসাসেবা স্বাভাবিক ছিল।
তবে, হাসপাতালের উপ-পরিচালক শ্যামল কৃষ্ণ সাহা বলেন, হাসপাতালে উন্নত মেশিনারিজ নেই। যেগুলো আছে তাও নষ্টের দিকে। তাই সঠিক রোগ নির্ণয়ের অভাবে রোগীর মৃত্যু হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, কোনো চিকিৎসক চান না তার হাতে কোন রোগীর মৃত্যু হোক। দুই একটি হলেও তা বিচ্ছিন্ন। তবে হাসপাতালের সকল চিকিৎসক তাদের দায়িত্ব পালনের প্রতি আন্তরিক।

আরও পড়ুন