অযোধ্যায় লাখো উগ্র হিন্দু, আতঙ্কে মুসলিমরা

আপডেট: 02:43:24 26/11/2018



img

শুভজ্যোতি ঘোষ, নয়াদিল্লি : ভারতের অযোধ্যায় হাজার হাজার নিরাপত্তারক্ষীর বলয়ের মধ্যে বিভিন্ন উগ্র হিন্দুত্ববাদী সংগঠন রোববার বাবরি মসজিদ চত্বরে দ্রুত রামমন্দির নির্মাণের দাবিতে বিশাল জনসমাবেশ করেছে।
প্ররোচনামূলক ভাষণ আর বাইরে থেকে আসা হাজার হাজার লোকের জমায়েতে পুরো অযোধ্যাই যেন উত্তেজনায় টগবগ করে ফুটছে।
বিশ্ব হিন্দু পরিষদের 'ধর্ম সংসদ' নামের সমাবেশ থেকে তাদের নেতা ও সাধুসন্তরা দাবি তুলেছেন, আদালতের অপেক্ষায় না থেকে সরকারকে অর্ডিন্যান্স বা নির্বাহী আদেশ জারি করে হলেও মন্দির নির্মাণের প্রক্রিয়া শুরু করতে হবে।
অযোধ্যাতেই সমান্তরাল আরো একটি সমাবেশ করেছে ক্ষমতাসীন বিজেপির শরিক ও মহারাষ্ট্রের হিন্দুত্ববাদী দল শিবসেনা।
ওই সভা থেকে শিবসেনার নেতা উদ্ধব ঠাকরে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, মন্দির বানানো না-হলে বিজেপি কিছুতেই ক্ষমতায় ফিরতে পারবে না। তিনি স্লোগান দিয়েছেন, "আগে মন্দির, তারপর সরকার!"
শিবসেনার ওই সভায় যোগ দিতে অন্তত পনেরোটি ট্রেন ভর্তি করে মহারাষ্ট্র থেকে হাজার হাজার 'শিবসৈনিক' অযোধ্যায় এসেছেন। গত দুদিন ধরে উদ্ধব ঠাকরে নিজে শহরে রয়েছেন।
বিশ্ব হিন্দু পরিষদের সভাতেও প্রায় এক লাখ মানুষের জমায়েত হয়েছে বলে অযোধ্যা থেকে সংবাদদাতারা জানাচ্ছেন। রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ বা আরএসএসের সমর্থকরাও দলে দলে সেখানে যোগ দেন।

মুসলিমদের সরিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতি
কট্টর হিন্দুদের এই সমাবেশ নিয়ে অযোধ্যায় মুসলিম বাসিন্দাদের মধ্যে বেশ কয়েকদিন ধরেই আতঙ্ক চলছে।
অল ইন্ডিয়া মুসলিম পার্সোনাল ল বোর্ড ও বাবরি মসজিদ অ্যাকশন কমিটির সদস্য জাফরইয়াব জিলানি বলছেন, "গত এক সপ্তাহ ধরে বিশ্ব হিন্দু পরিষদ অযোধ্যায় যেভাবে আতঙ্ক ছড়াচ্ছে তাতে শহরের মুসলিমরা ভয়ে সিঁটিয়ে আছেন।"
অযোধ্যায় নিরাপদ বোধ না-করলে মুসলিমদের লখনৌতে নিয়ে আসার ব্যবস্থা করা হচ্ছে বলেও তিনি জানান।
র্যা পিড অ্যাকশন ফোর্স ও অ্যান্টি-টেররিজম স্কোয়াডের পাঁচটি কোম্পানি এখন অযোধ্যায় মোতায়েন আছে। প্রভিন্সিয়াল আর্মড কনস্টেবুলারির ৪২টি কোম্পানি ও হাজারখানেক পুলিশকর্মীও শহরে টহল দিচ্ছেন।
ড্রোন দিয়েও সর্বক্ষণ আকাশ থেকে পরিস্থিতির ওপর তীক্ষ্ণ নজর রাখা হচ্ছে।
তারপরও উত্তরপ্রদেশের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ও সমাজবাদী পার্টির নেতা অখিলেশ যাদব মনে করছেন এই নিরাপত্তাও যথেষ্ট নয়। অযোধ্যার যা পরিস্থিতি, তাতে যত দ্রুত সম্ভব সেখানে সেনাবাহিনী মোতায়েন করা দরকার।

এখন কেনো ক্ষেপে উঠলো কট্টর হিন্দু দলগুলো
এ মাসের গোড়ার দিকেই সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্ট করে দিয়েছিল, রামমন্দির-বাবরি মসজিদ নিয়ে যে মামলা চলছে তাতে তাড়াহুড়ো করে শুনানি করার ব্যাপারে তারা মোটেই আগ্রহী নন।
প্রধান বিচারপতি রঞ্জন গগৈ ও জাস্টিস এস কে কাউলের বেঞ্চ তখনই জানিয়ে দিয়েছিল, জানুয়ারিতে স্থির করা হবে ওই মামলায় পরবর্তী শুনানি কবে হবে।
তখন থেকেই বিভিন্ন হিন্দুত্ববাদী সংগঠন দাবি তুলতে থাকে, রামমন্দির নির্মাণের জন্য সুপ্রিম কোর্টের ভরসায় বসে থাকলে আর চলবে না।
গরিষ্ঠ সংখ্যক মানুষের আস্থা ও ধর্মীয় বিশ্বাসের প্রশ্নে আদালত আদৌ শেষ কথা বলতে পারে কি না, সে প্রশ্নও তুলতে থাকেন তারা।
কেন্দ্রে ও উত্তরপ্রদেশে যখন বিপুল গরিষ্ঠতা নিয়ে বিজেপির সরকার ক্ষমতায় আছে, তারপরও কেনো মন্দির নির্মাণের কাজ এগোচ্ছে না- এই জাতীয় মন্তব্যও করতে থাকেন বজরং দল, বিশ্ব হিন্দু পরিষদের নেতারা।
এই জাতীয় দাবির পটভূমিতেই অযোধ্যায় এদিনের সমাবেশ অনুষ্ঠিত হলো, যা মন্দির নির্মাণের জন্য সরকারের ওপর চাপ বাড়াবে বলেই ধারণা করা হচ্ছে। একইসঙ্গে রাম মন্দির নির্মাণে তাদের আপত্তি তুলে নেওয়ার জন্য মুসলিমদের ওপর চাপ দেওয়াটাও এই সমাবেশের উদ্দেশ্য।
এদিকে এই চলমান রামমন্দির বিতর্ক নিয়ে আজ প্রথমবারের মতো মুখ খুলেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি।
রাজস্থানের আলোয়াড়ে এক নির্বাচনী জনসভায় তিনি এদিন বলেছেন, "কংগ্রেস এই ইস্যুতে বিচারবিভাগকে পর্যন্ত ভয় দেখাতে চেয়েছে। অযোধ্যা শুনানি যাতে ২০১৯ নির্বাচন পর্যন্ত পিছিয়ে দেওয়া হয়, তারা সুপ্রিম কোর্টকে সেই দাবিও জানিয়েছে।"
"এমনকী, তৎকালীন প্রধান বিচারপতিকে ইমপিচমেন্টের ভয় দেখাতেও তারা পিছপা হযনি। এই জাতীয় জিনিস কীভাবে মেনে নেওয়া যায়?" মন্তব্য করেছেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রীর কথা থেকেও স্পষ্ট, তিনি চাইছেন অযোধ্যা মামলায় সুপ্রিম কোর্টে যত দ্রুত সম্ভব শুনানি হোক।
ক্ষমতাসীন বিজেপির ইশতেহারেও বলা হয়েছে, তারা রামমন্দির-বাবরি মসজিদ মামলায় সুপ্রিম কোর্টের রায়ই মেনে নেবে।
সূত্র : বিবিসি

আরও পড়ুন