অবাধ নির্বাচনের জন্য যা করণীয়

আপডেট: 02:05:31 21/10/2018



img

সুবর্ণভূমি ডেস্ক : ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক ইনস্টিটিউট (এনডিআই) আসন্ন সাধারণ নির্বাচনকে অবাধ ও অধিকতর বিশ্বাসযোগ্য করতে সরকার, নির্বাচন কমিশন, রাজনৈতিক দল এবং প্রার্থীদের কাছে যথাক্রমে ছয়টি, আটটি ও ছয়টি- এই মোট ২০ দফা  সুপারিশ রেখেছে।
তাদের কথায়, সামগ্রিক নির্বাচনী প্রক্রিয়ার আস্থা বাড়ানোর জন্য এগুলো দরকার। এগুলো মানা হলে শান্তিপূর্ণ ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন হতে পারে।
এনডিআই বলেছে, তারা আগামী নির্বাচনের এক মাস আগে বাংলাদেশে প্রাক-নির্বাচনী মিশন পাঠানোর পরিকল্পনা করছে। তখন তাদের কাজ হবে তাদেরই প্রদত্ত সুপারিশমালার কতটা বাস্তবায়ন করা হয়েছে তা খতিয়ে দেখা।

সরকারের জন্য ছয় দফা
১. সকল রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সংলাপের সূচনা করুন, যা বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন নিশ্চিত করতে সহায়তা করবে।
২. নির্বাচন কমিশনের কাজে হস্তক্ষেপ করা হবে না, এই মর্মে প্রকাশ্যে অঙ্গীকার ঘোষণা করতে হবে।
৩. কঠোরভাবে নিরপেক্ষ থাকতে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর কাছে পরিষ্কার বার্তা পাঠান। নির্বাচনী স্টেকহোল্ডারদের ভীতসন্ত্রস্ত রাখা থেকে বিরত থাকতেও নির্দেশ দিতে হবে।
৪. রাজনৈতিক কর্মী, নাগরিক সমাজ এবং মিডিয়া প্রতিনিধিদের বিরুদ্ধে চলমান সব মামলার দ্রুত বিচারিক নিষ্পত্তির লক্ষ্যে পদক্ষেপ নেওয়া।
৫. অনলাইন এবং সোশ্যাল মিডিয়ার নিবন্ধনের জন্য বিবেচনাধীন সকল আবেদন নিরপেক্ষভাবে খতিয়ে দেখা নিশ্চিত করুন। এনডিআই মনে করে যে, অনলাইন ও সামাজিক মিডিয়া নির্বাচনী জনমত গঠনে বড় ভূমিকা রাখবে। তারা ম্যানিপুলেশন এবং সহিংসতার হুমকিমুক্ত মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সুরক্ষা এবং ভোটারদের মতামত গঠনের অধিকার প্রতিষ্ঠায়ও ভূমিকা রাখবে।
৬. বাংলাদেশের সংবিধান ও আন্তর্জাতিক চুক্তি দ্বারা সুরক্ষিত থাকা মতপ্রকাশের ও বাকস্বাধীনতা ডিজিটাল সিকিউরিটি আইন দ্বারা যে খর্ব করা হবে না তা স্পষ্ট করতে হবে।
এনডিআই প্রতিনিধি দল এই সুপারিশমালা তৈরি করতে ২০১৮ সালের ৫ থেকে ১১ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের কর্মকর্তা, রাজনৈতিক দলের নেতা, নির্বাচন কমিশন, সুশীল সমাজ প্রতিনিধি, নাগরিক নির্বাচন পর্যবেক্ষক গ্রুপের সঙ্গে কথা বলে। তারা নারী সংসদ সদস্য, রাজনৈতিক কর্মী; মিডিয়া প্রতিনিধি, সাবেক সরকারি কর্মকর্তা; ব্যবসায়ী নেতা এবং আন্তর্জাতিক ও কূটনৈতিক সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিদের মতামতও নেন।
এনডিআই বোর্ডের সদস্য এবং মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের দক্ষিণ এশীয় বিষয়ক সাবেক মার্কিন সহকারী সেক্রেটারি রাষ্ট্রদূত কার্ল ইন্ডারফার্থ দলটির নেতৃত্ব দিচ্ছেন। বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও ভারত বিষয়ক তিনি একজন বিশেষজ্ঞ।
পাকিস্তানি লেখক ও সাবেক সংসদ সদস্য ফারাহ নাজ ইস্পাহানি এবং সিনিয়র সহযোগী ও এনডিআইয়ের এশিয়া প্রোগ্রামের আঞ্চলিক পরিচালক পিটার ম্যানিকাস, এনডিআই নির্বাচন উপদেষ্টা মাইকেল ম্যাকনুলি এবং এনডিআই এর এশীয় বিষয়ক সিনিয়র প্রোগ্রাম ম্যানেজার অ্যাডাম নেলসন ওই প্রতিনিধি দলে আছেন।

নির্বাচন কমিশনের কাছে আট দফা সুপারিশ
১. সমস্ত সাংবিধানিক ও আইনি ক্ষমতা প্রয়োগ করুন। পুলিশকে তত্ত্বাবধান ও পরিচালনা করুন। যাতে তারা নির্বাচনী প্রক্রিয়ার নিরাপত্তা এবং সকল রাজনৈতিক দল ও তাদের সমর্থকদের আইনের সমান সুরক্ষা প্রদান করতে পারে।
২. নির্বাচনে নারী, ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু সদস্যদের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য সহিংসতার সমস্যাটি তুলে ধরা এবং তা মোকাবিলা করার জন্য সচেতনতা বৃদ্ধির অভিযান পরিচালনা করুন।
৩. বেসরকারি খাত থেকে বেশি সংখ্যায় নির্বাচনী কর্মী নিয়োগে এখনই সক্রিয় পদক্ষেপ গ্রহণ করুন। প্রিজাইডিং অফিসারসহ পোলিং কর্মীদের মধ্যে লিঙ্গ ভারসাম্য বজায় রাখার কাজটিকে অগ্রাধিকার দিন।
৪. যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ইভিএম ব্যবহারের বিষয়ে জনগণকে স্পষ্ট তথ্য সরবরাহ করুন। যদি তাই হয়, তাহলে যেসব নির্দিষ্ট এলাকা এবং ভোট কেন্দ্রে তা ব্যবহার করা হবে এবং কীভাবে সেই অবস্থান বাছাই করা হবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য দিন।
৫. এটা নিশ্চিত করুন, যেসব ভোটিং সেন্টারে ভোটারদের ইভিএম ব্যবহার করতে হবে, সে বিষয়ে তাদের প্রশিক্ষণ দিতে হবে।
৬. ইভিএম প্রশাসনের সঙ্গে যুক্ত থাকা পোল কর্মীরা যে ইভিএম ব্যবহার এবং তার দেখভালের জন্য ভালো প্রশিক্ষিত, সেটা নিশ্চিত করতে হবে।
৭. ইভিএম সোর্স কোড পরিদর্শন করার এখতিয়ার নির্বাচন পর্যবেক্ষক এবং দলগুলোকে প্রদান করুন। ইভিএম সংক্রান্ত ইসির দেওয়া যেকোনো সার্টিফিকেশন পরীক্ষার এবং যন্ত্রের নিরাপত্তা পর্যালোচনা করে দেখার ব্যবস্থা রাখতে হবে।
৮. একটি ভোট কেন্দ্রের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ভোট প্রক্রিয়া যাচাই করার বিষয়ে বিদ্যমান বাধানিষেধ তুলে নিন। কারণ কোনো একটি নির্দিষ্ট ভোট কেন্দ্রে ভোট দেওয়ার সূচনা থেকে সারাদিন ভোটদান, ভোটদান পর্ব বন্ধ হওয়া এবং গণনা প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে পর্যবেক্ষকদের দিনভর উপস্থিতির দরকার আছে।

রাজনৈতিক দল এবং প্রার্থীদের জন্য সুপারিশ
১. বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানে সুবিধাজনক হতে পারে এমন সব ধরনের ব্যবস্থা নিতে সরকারের সঙ্গে সংলাপের চেষ্টা করুন।
২.  কথোপকথন এবং অন্যান্য শান্তিপূর্ণ উপায়ে আন্তঃদলীয় বিরোধ নিষ্পত্তির অঙ্গীকার করুন।
৩. দলগুলোর মধ্যে নারীর অংশগ্রহণের যেসব প্রতিবন্ধকতা  আছে তা স্বীকার করুন এবং সেসব নিরসনে পদক্ষেপ নিন। নারী যাতে একটি আসনে কম প্রতিদ্বন্দ্বিতার কবলে পড়ে সেই লক্ষ্যে পদক্ষেপ নিন। এজন্য দলগুলোর কমিটিতে যাতে ৩৩ শতাংশ নারী থাকে তা নিশ্চিত করুন। সংসদীয় নির্বাচনী আইন গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশে এই লক্ষ্য নির্দিষ্ট আছে।
৪.  সংসদের সংরক্ষিত মহিলা সদস্য বাছাইয়ে স্বচ্ছ মানদণ্ড প্রয়োগ করুন।
৫. হেট স্পিচ ও সহিংসতা বন্ধে দলের মধ্যে যোগাযোগ বাড়াতে হবে। প্রতিটি স্তরে পরিষ্কার বার্তা দিতে হবে যে, নারী, জাতিগত ও ধর্মীয় সংখ্যালঘু এবং অন্যান্য প্রান্তিক দলের বিরুদ্ধে সহিংসতা সহ্য করা হবে না।
৬. নির্বাচনী প্রচারাভিযানের কার্যক্রমগুলোতে যুব সমাজের কাছে ব্যাপকভিত্তিতে পৌঁছানোর লক্ষ্য স্থির করুন। দলের নীতি নির্ধারণী সিদ্ধান্তে তরুণদের বেশি সম্পৃক্ততা নিশ্চিত করুন।
সূত্র : মানবজমিন