আউশ উৎপাদনে দেশসেরা চুয়াডাঙ্গা

আপডেট: 11:22:40 18/10/2020



img
img

চুয়াডাঙ্গা প্রতিনিধি : আউশ ধান সোনা হয়ে হাসি ফুটাচ্ছে চুয়াডাঙ্গা জেলার কৃষকদের মুখে। এ জেলায় এবার সর্বাধিক পরিমাণ আউশের আবাদ হয়েছে এবং ফলন হয়েছে প্রচুর। তাছাড়া ধানের বাজারদর ভালো পাওয়ায় কৃষকরা খুশি। বিগত ছয় বছরে চুয়াডাঙ্গায় আউশ আবাদ বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণ।
চুয়াডাঙ্গা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, ২০১৪-২০১৫ অর্থবছরে এ জেলায় আউশ ধানের আবাদ হয়েছিল ২১ হাজার ৩২৫ হেক্টরে। আর বর্তমান ২০২০-২১ অর্থবছরে আউশ ধানের আবাদ হয়েছে ৪৩ হাজার ১৭৩ হেক্টর জমিতে।
দেশের ৬৩টি জেলার মোট আউশের আবাদ যেখানে ১৩ লাখ ৩৪ হাজার হেক্টর সেখানে মাত্র চারটি উপজেলা নিয়ে গঠিত চুয়াডাঙ্গা জেলাতেই আউশ আবাদ হয়েছে ৪৩ হাজার ১৭৩ হেক্টর।
চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলায় সবচেয়ে বেশি অর্থাৎ ১৫ হাজার ৬৮৫ হেক্টর জমিতে আউশের আবাদ হয়েছে। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলায় আউশ ধানের আবাদ ছিল ছয় হাজার ৮০০ হেক্টর। এইবার সেখানে আবাদ হয়েছে ১৫ হাজার ৬৮৫ হেক্টর। ছয় বছর পর আট হাজার ৮৮৫ হেক্টর বেশি জমিতে আউশ ধানের আবাদ হয়েছে।
আউশের গড় ফলনেও চুয়াডাঙ্গা জেলা সারাদেশে সেরাদের তালিকায় রয়েছে। দেশে আউশ ধানের গড় ফলন (চাল) প্রতি হেক্টরে ২ দশমিক ৮ মেট্রিক টন। কিন্তু চুয়াডাঙ্গা জেলায় গড় ফলন (চাল) প্রতি হেক্টরে ৩ দশমিক ৪৭ টন।
চুয়াডাঙ্গা সদর, আলমডাঙ্গা, দামুড়হুদা ও জীবননগর উপজেলার ফসলের মাঠ ঘুরে এবং কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে এই পরিসংখ্যানের সত্যতা পাওয়া যায়।
দামুড়হুদা উপজেলার পারকৃষ্ণপুর গ্রামের কৃষক রাশেদ আলী তিন বিঘা জমিতে ব্রিধান-৪৮ আবাদ করে ফলন পেয়েছেন বিঘা প্রতি (৩৩ শতক) ১৯ মণ। আলমডাঙ্গা উপজেলার কৃষানী নুরুননাহার ৫০ শতক জমিতে ব্রিধান-৮৫ আবাদ করে ২৮ মণ ধান সংগ্রহ করতে পেরেছেন।
সদর উপজেলার নবিননগর গ্রামের কৃষক ইয়াকুব আলী ১৮ কাঠা জমিতে খাটোবাবু জাতের ধান আবাদ করে পেয়েছেন ২১ মণ ধান। জীবননগর উপজেলার বাঁকা ইউনিয়নের সুটিয়া গ্রামের কৃষক আতিকুর রহমান এ মৌসুমে ৩৫০ শতক জমিতে ব্রিধান-৪৮ আবাদ করেন। সেখান থেকে তিনি প্রায় ২০০ মণ শুকনা ধান পেয়েছেন। তিনি প্রায় ৫০ হাজার টাকার বিচালি (গো-খাদ্য) বিক্রি করতে পেরেছেন বলে জানান।
সরোজগঞ্জ পাইকারি বাজারের আড়তদার জমির আলী জানান, ধানের দাম বর্তমানে মণপ্রতি এক হাজার টাকার ওপরে। মণপ্রতি হাজার টাকার নিচে কোনো ধান বিক্রি হচ্ছে না। ধানের ভালো দর থাকায় কৃষকরাও খুশি।
চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা তালহা জুবাইর মাসরুর বলছেন, সরকার বেশ আগে থেকেই আউশ ধান আবাদ বৃদ্ধির পরিকল্পনা গ্রহণ করে। সে কারণে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মাঠ পর্যায়ের কর্মীরা কৃষকদের আউশ ধান আবাদ বৃদ্ধির জন্য তাদের নানাভাবে উদ্বুদ্ধ করে আসছেন। বিশেষ করে করোনা পরিস্থিতিতে খাদ্য নিরাপত্তার বিষয় বিবেচনায় সরকার আউশ-আমন আবাদে বিশেষ কর্মসূচি গ্রহণ করে। যার প্রেক্ষিতে বিনামূল্যে আউশ ধানবীজ বিতরণ, প্রশিক্ষণ, উদ্বুদ্ধকরণ সভা, মাঠ দিবস ইত্যাদি কার্যক্রমের মাধ্যমে কৃষকদের সহায়তা ও উৎসাহ প্রদান করা হয়। যা পরিপূর্ণভাবে চুয়াডাঙ্গায় কাজে লেগেছে।
এছাড়া চুয়াডাঙ্গায় দেশের অন্যান্য অঞ্চল থেকে ভিন্ন ধরনের শস্য বিন্যাস চালু রয়েছে যেখানে আউশ ধান অন্যতম জনপ্রিয় চাষ হিসেবে কৃষকের কাছে বিবেচিত হচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ এখানে অধিকাংশ কৃষক মাঠফসল হিসেবে ভুট্টা-আউশ-সবজি অথবা সবজি-আউশ-সবজি অথবা ভুট্টা-সবজি-আউশ কিম্বা বোরো-আউশ-আগাম সবজি বিন্যাসে ফসল আবাদ করে থাকে। ভুট্টা আবাদে দেশের শীর্ষস্থানীয় এলাকা হিসেবেও চুয়াডাঙ্গায় ভুট্টা-সংশ্লিষ্ট শস্য বিন্যাসে আউশ ধান সবচেয়ে উপযুক্ত ও লাভজনক ফসল। শস্য বিন্যাস ও বৃষ্টিনির্ভরতার জন্য এ জেলায় আউশ ধান রোপণ দেরিতে হয়। কিন্তু উৎপাদন খরচ কম, স্বল্পজীবন কালের উন্নত জাত ব্যবহারে কৃষকের জন্য আউশ ধান আবাদ লাভজনক হচ্ছে। সে কারণে বিগত কয়েক বছর আউশ ধানের আবাদ উল্লেখ যোগ্যহারে বেড়ে গেছে এবং এবার সবচেয়ে বেশি জমিতে আউশের আবাদ হয়েছে। আবহাওয়া অনুক‚লে থাকায় ও যথাযথ পরিচর্যার কারণে ফলনও হয়েছে আশানুরূপ।
চুয়াডাঙ্গা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক আলী হাসান বলেন, চুয়াডাঙ্গা জেলায় আউশ ধানের আবাদ সবচেয়ে বেশি হয়। এরপর এ জেলায় এবার উচ্চফলনশীল ব্রিধান-৪৮ জাত ১৬ হাজার ৭২৯ হেক্টর জমিতে আবাদ হয়েছে। তারপরই রয়েছে উচ্চফলনশীল জাতের স্থানীয় ভাষায় ‘খাটোবাবু’ ধান ১২ হাজার ৭২৪ হেক্টর জমিতে আবাদ হয়েছে; যা রোগ-বালাই প্রতিরোধী। তাছাড়া অধিক ফলনশীল হাইব্রিড জাতের ধান সাত হাজার ৪৭৩ হেক্টরসহ উচ্চফলনশীল আধুনিক জাত যেমন ব্রিধান-৮২, ব্রিধান-৮৫ ইত্যাদি ধানেরও আবাদ হয়েছে। চুয়াডাঙ্গা জেলার ভূমি প্রকৃতি, মাঝারি উঁচু এবং আবহাওয়া বৃষ্টিনির্ভর হওয়ায় আউশ ধান চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী।
ভূগর্ভস্থ পানির অপচয় রোধ করে ও উৎপাদন ব্যয় কমিয়ে বৃষ্টিনির্ভর আউশ ধান আবাদকে জনপ্রিয় করার জন্য বর্তমান সরকারের নানান পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়নের ফলে আউশ ধান আবাদ ক্রমাগত বেড়ে যাচ্ছে। বিগত কয়েক বছরে সরকারি প্রণোদনায় বিনামূল্যে আউশ ধানের বীজ ও সার কৃষকদের মাঝে বিতরণ করা, উচ্চফলনশীল আধুনিক জাতের আউশ ধানের বীজ পাওয়া নিশ্চিত হওয়া, কৃষি উপকরণের (সার ও বালাইনাশক) সহজলভ্যতা এবং মাঠ পর্যায়ে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের মাধ্যমে কৃষক উদ্বুদ্ধকরণ, নিবিড় পর্যবেক্ষণ ও পরামর্শসেবা দেওয়ার ফলে লাভজনক আউশ ধান আবাদ প্রতিবছরই বৃদ্ধি পাচ্ছে।

আরও পড়ুন