আগামী ৫০ বছরে বাংলাদেশের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ কী হবে?

আপডেট: 07:20:11 26/03/2021



img

সুবর্ণভূমি ডেস্ক : স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছরের মাথায় এসে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে উত্তরণের সুপারিশ অর্জন করা বাংলাদেশের জন্য সুশাসন ও গণতান্ত্রিক চর্চার পরিবেশ তৈরির পাশাপাশি অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বৈষম্য দূর করা এবং রাষ্ট্রীয় ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করাই বড় চ্যালেঞ্জ হবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষক ও তরুণদের অনেকে ।
যদিও সরকারের তরফ থেকে সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাপক উন্নয়নের দাবি করা হচ্ছে কিন্তু গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির অনুপস্থিতি ও ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ নিয়েই মূলত স্বাধীনতার ৫০ বছর পার করেছে বাংলাদেশ।
ঢাকায় জাতীয় প্যারেড গ্রাউন্ডে স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী উদযাপন ও বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকীর উপলক্ষে দশদিনের বিশেষ আয়োজনে দেশী-বিদেশী অতিথিদের বক্তৃতাতেও ঘুরে ফিরেই এসেছে গত ৫০ বছরে নানা খাতে বাংলাদেশের অর্জনগুলোর বিষয়ে।
স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর পূর্তির প্রাক্কালে জাতির উদ্দেশ্যে দেয়া ভাষণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও বলেছেন বাংলাদেশ সম্পর্কে সব নেতিবাচক ও নিরাশাবাচক ভবিষ্যদ্বাণী অসার প্রমাণ করে বাংলাদেশ মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে।
বিজ্ঞাপন
যদিও রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, গণতন্ত্র চর্চা ও সুশাসনের অভাব, দুর্নীতি, গণমাধ্যমের স্বাধীনতার মতো বিষয়গুলোতে সমালোচনাও তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে।
সম্প্রতি শিক্ষাজীবন শেষ করা আরজুমান আরা হোসেন বলছেন বাংলাদেশের জন্য আগামী ৫০ বছরের বড় চ্যালেঞ্জটাই হবে গণতান্ত্রিক চর্চার পরিবেশ তৈরি করা।
"এখন যে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা তাতে অনেক কিছুর অভাব আছে। অনেক কিছু একপাক্ষিক হয়ে গেছে। শক্তিশালী একটা বিরোধী দল বা পার্লামেন্টে যা যা ঘাটতি তা অনুধাবন করে একযোগে এগিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা এখনো চর্চা হচ্ছেনা। সব মিলিয়ে দুর্নীতিমুক্ত রাজনৈতিক পরিবেশ, সুষ্ঠু রাজনীতির চর্চা ও গণতান্ত্রিক স্বাধীনতা-এটাই বড় চ্যালেঞ্জ হবে বাংলাদেশের জন্য"।
ওদিকে বাংলাদেশে রাজনৈতিক ক্ষেত্রে কর্তৃত্বপরায়নতা এবং দুর্নীতির ব্যাপক বিস্তারের মতোই প্রকট হয়ে উঠছে জলবায়ু পরিবর্তন জনিত সমস্যা ও পরিবেশ বিপর্যয়ের নানা দিক, বিশেষজ্ঞদের মতে ইতোমধ্যেই এগুলো প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে দেশের বিরাট অঞ্চলের মানুষের ওপর।
আরেকজন তরুণী মানসুরা আলম বলছেন আগামী ৫০ বছরে এটি আরও অনেক ইস্যু হয়ে আসবে বাংলাদেশের সামনে।
"দেশ কিভাবে এগিয়ে যাবে সেই কাঠামোর মধ্যে সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে উন্নয়ন ও দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশের পাশাপাশি চ্যালেঞ্জের পাশাপাশি পরিবেশকেও গুরুত্ব দিতে হবে। আমাদের অস্তিত্বের লড়াইয়ের মুখোমুখি হতে হবে। প্রাকৃতিক যে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হবে বাংলাদেশে তা থেকে উত্তরণটা হবে আরও বড় চ্যালেঞ্জ"।
ওদিকে সরকারি ভাবে ডিজিটাল বাংলাদেশ অর্থাৎ প্রযুক্তির ব্যাপক ব্যবহারের পাশাপাশি কর্মসংস্থান বৃদ্ধির তথ্য উপাত্ত দেয়া হলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী লাইজু আক্তার বলছেন প্রযুক্তির বিকাশকে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির উৎসে রূপান্তরের মাধ্যমে প্রান্তিক মানুষের মৌলিক চাহিদা যথাযথভাবে পূরণ করাই হবে ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ।
যদিও সরকারি ভাবে বলা হচ্ছে এসব খাতেই এমন অগ্রগতি হবে যে ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশের কাতারে যাবে বাংলাদেশ।
ব্রিটেনের অর্থনৈতিক গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর ইকোনমিক্স এন্ড বিজনেস রিসার্চ তাদের সর্বশেষ এক রিপোর্টে ধারণা দিয়ে বলেছে বাংলাদেশ এখন যে ধরণের অর্থনৈতিক বিকাশের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে তা অব্যাহত থাকলে ২০৩৫ সাল নাগাদ দেশটি হবে বিশ্বের ২৫তম বৃহৎ অর্থনীতি।
কিন্তু রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, ব্যাপক দুর্নীতি এবং মানসম্পন্ন শিক্ষা ও জীবন মানের মতো বিষয়গুলো নিয়ে বরাবরই উদ্বিগ্ন রাজনৈতিক সামাজিক বিশ্লেষকরা।
অর্থনীতিবিদ ফাহমিদা খাতুন বলছেন অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বৈষম্য দূর করা, সুশাসন নিশ্চিত করা এবং দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করার চ্যালেঞ্জ নিতে হবে বাংলাদেশকে।
"কিভাবে বৈষম্য দুর করা যায়, যথেষ্ট কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে না, সুশাসন প্রতিষ্ঠা, দুর্নীতি দুর করা ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করা যায়- এসব বিষয় বাংলাদেশের সামনে আগামী দিনগুলোতে খুব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়াবে। বাংলাদেশ যে গতিময়তার সাথে প্রবৃদ্ধি অর্জন করছে তার সুফল সবাইকে দিতে হলে সেই প্রবৃদ্ধি হতে হবে অন্তর্ভুক্তিমূলক। একই সাথে সামাজিক সাম্যতার পাশাপাশি প্রয়োজন হবে অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতন্ত্র"।
ফাহমিদা খাতুন বলছেন জলবায়ু পরিবর্তন জনিত সমস্যাও অনেক বড় হয়ে আসবে এবং সেজন্য আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশ সোচ্চার ভূমিকাও রাখতে হবে।
আর এসব চ্যালেঞ্জে সফল হতে হলে সুষ্ঠু রাজনৈতিক চর্চার পাশাপাশি দেশের প্রতিষ্ঠানগুলোকে দক্ষ ও কার্যকর করে গড়ে তোলার কোনো বিকল্প নেই বলে মনে করেন তিনি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক গোবিন্দ চক্রবর্তী অবশ্য বলছেন, গণতন্ত্রের সুফল ও অর্থনৈতিক সমতা কিংবা জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের পাশাপাশি বাংলাদেশের ভূ-কৌশলগত অবস্থার জের ধরে তৈরি হওয়া চ্যালেঞ্জও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে বাংলাদেশের সামনে।
"ভূ -কৌশলগত অবস্থানের কারণে অনেক সমস্যার উদ্ভব হচ্ছে। মিয়ানমার থেকে আসা রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে সেটি দেখা যাচ্ছে। এ গুরুত্বের জায়গা কিভাবে ডিল করা হবে সেটিও সামনে আসবে। ভূমিকম্প বা বজ্রপাত বেড়ে যাচ্ছে-এমন প্রাকৃতিক দুর্যোগ তো আছেই। আর যে সোনার বাংলা মিথ নিয়ে বাংলাদেশ গড়ার চেষ্টা করেছি তার মূলে ছিলো ধর্মনিরপেক্ষ মানবিক রাষ্ট্র তৈরি করা"।
মিস্টার চক্রবর্তী বলেন ধর্ম, মত ও আদর্শিক সংখ্যালঘুদের অধিকার নিশ্চিত করে রাষ্ট্রের অসাম্প্রদায়িক বৈশিষ্ট্য নিশ্চিত করাটাও হবে বিরাট চ্যালেঞ্জের বিষয়।
সূত্র- বিবিসি

আরও পড়ুন