আমার নেতা আমার শিক্ষক মোস্তাফিজুর রহমান কাবুল

আপডেট: 02:10:02 09/06/2020



img

আহসান কবীর

গেল শতাব্দীর আশির দশকের শেষ দিকের কথা। সামরিক একনায়ক এরশাদবিরোধী আন্দোলন তখন তুঙ্গে। প্রায় প্রতিদিনই যাতায়াত যশোর শহরের ভোলাট্যাংক রোডের রাজনৈতিক ছাত্রসংগঠনটির অফিসটিতে।
কতই বা বয়স তখন, রাজনীতিই বা কী বুঝি! ফলে নেতাদের হুকুম তামিল করাই মূল কাজ। হয়তো হঠাৎ ‘স্বৈরাচারের গদিতে আগুন জ্বালো একসাথে’ স্লোগানে রাজপথ কাঁপাতে হবে, অথবা হরতাল সফল করতে পিকেটিং করতে হবে, নয়তো রাতভর দেয়াললিখনে অংশ নিতে হবে।
ফলত রাজনৈতিক কাজ যতটুকু, তার চেয়ে ঢের বেশি আড্ডা। ওই সব আড্ডায় লোকের অভাব হতো না। তখন যশোর শহরের সবচেয়ে বড় ছাত্রসংগঠন ছাত্রমৈত্রী। বড় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে একচেটিয়া প্রাধান্য। নেতাকর্মীদের ভিড়ে গমগম করতো ছোট্ট অফিসটি। আড্ডা ছড়িয়ে পড়তো বারান্দা ও সামনের খোলা চত্বর পেরিয়ে পাশের দবির বা হো চি মিনের (বয়স্ক ভদ্রলোকটিকে আমরা এই নামেই জানতাম; আসল নাম জানা হয়নি কখনো) দোকান, এমনকী কখনোবা আব্দুস সামাদ স্কুলের মাঠ বা নিরালা সিনেমা হলের উত্তর পাশের পুকুরপাড় (এখন সিনেমা হলও নেই, পুকুরও নেই) পর্যন্ত। নেতাকর্মী ছাড়াও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পাড়া-মহল্লার কিশোর-তরুণ-যুবারা কীসের টানে যেন ছুটে যেতেন ওই অফিস এলাকায়।
তুলনায় মূল রাজনৈতিক দল ইউনাইটেড কমিউনিস্ট লীগের অফিসটি থাকতো বেশ ফাঁকা। দেড়শ’-দুইশ’ গজ দূরের পুরনো দোতলা এই ভবনটি পার্টি কিনে নেয় ১৯৮৪ সালে। পরের বছর স্বৈরশাহী ঘরোয়া রাজনীতির অনুমোদন দিলে সেখানে ওঠাবসা শুরু করেন পার্টির নেতারা। নির্দেশনা দিতে বা অন্য কোনো কাজে ছাত্রসংগঠনের নেতাদের ডাক পড়তো এখানে। আবার ছাত্রগণসংগঠনটিতে যারা পার্টি মেম্বার ছিলেন, তাদেরও নিয়মিত যাতায়াত ছিল ওই অফিসে। তবে আমাদের মতো ছেলে-ছোকরারা কদাচিৎ ওমুখো হতো।
বন্ধুরা যখন আড্ডায় মত্ত থাকতো, তখন প্রায়ই আমাকে একটি কাজ করতে হতো। সভাপতি মাহমুদ হাসান বুলু (বর্তমানে জেলা শিল্পকলা একাডেমির সাধারণ সম্পাদক, পেশায় আইনজীবী) অথবা সাধারণ সম্পাদক জিল্লুর রহমান ভিটুর (বর্তমানে ওয়ার্কার্স পার্টি-মার্কসবাদীর জেলা সেক্রেটারি) নির্দেশনামতো প্রেস বিজ্ঞপ্তি লিখতে হতো। তখনো ছাপানো প্যাডের ওপর কলম দিয়ে প্রেস বিজ্ঞপ্তি লেখা হতো। পরে তা ফটোকপি করে পত্রিকা অফিসগুলোতে পাঠানো হতো।
এই দুই নেতা প্রেস বিজ্ঞপ্তি লেখার কাজে বেশিরভাগ সময় কেন আমাকে ডাকতেন, তা আমার অজানা। তবে ধারণা করতে পারি, আমার হাতের লেখা সুন্দর না হলেও মোটামুটি পরিষ্কার ছিল। আর বাংলা বানানও খানিকটা নির্ভুল লিখতে পারতাম ছাত্রাবস্থায়ই। এই দুটো কারণে হয়তো আমাকে বেছে নিতেন তারা।
প্রেস বিজ্ঞপ্তি বিতরণের দায়িত্ব যাকেই দেওয়া হোক না কেন, কাজটা শুরু হতো নুরুল আলমের (বর্তমানে আমেরিকা প্রবাসী) সম্পাদনায় প্রকাশিত দৈনিক দেশহিতৈষী অফিস থেকে। কারণ ওটাই ছিল আমাদের অফিসের সবচেয়ে কাছের পত্রিকা দপ্তর। আমাকেও প্রায়ই ওখানে প্রেস বিজ্ঞপ্তি হাতে যেতে হতো। বার্তা সম্পাদক ছিলেন আইয়ুব হোসেন। ছাত্রমৈত্রীর বিদায়ী সভাপতি। মেজাজি লোক। প্রেস বিজ্ঞপ্তিটি তার হাতে দিতাম ভয়ে ভয়ে। কারণ প্রায়ই তিনি প্রেস বিজ্ঞপ্তির কয়েক লাইন পড়ে সেটি সজোরে নিক্ষেপ করতেন পাশে থাকা ওয়েস্ট পেপার বক্সে। বলতেন, ‘কী লেহিচাও? এইডে ছাত্রমৈত্রীর প্রেস বিজ্ঞপ্তি?’ ইত্যাদি ইত্যাদি।
অবশ্য অল্পসময়ের মধ্যে তিনি বিজ্ঞপ্তিখানা নিজের হাতে তুলতেন ওয়েস্ট পেপার বক্স থেকে। তারপর ভুলটি ধরিয়ে দিতেন। আর স্নেহের স্বরে বলতেন, ‘আর কোনোদিন যেন এই ভুল না হয়। বেশি বেশি পড়বা। আরো ভালো লিখতে হবে।’ যদিও আমি নিশ্চিত ছিলাম, সেই সময় ছাত্রমৈত্রীর প্রেস বিজ্ঞপ্তি অন্য যেকোনো ছাত্রসংগঠনের চেয়ে ভালোই লেখা হতো। আইয়ুব হোসেনও তা জানতেন। তার আকাঙ্ক্ষা ছিল আমরা যাতে আরো ভালো লিখি।
সত্যি বলতে কি, পলিটিক্যাল স্টেটমেন্ট আসলে কেমন হওয়া উচিত, যতটুকু শিখতে পেরেছিলাম, তা ওই আইয়ুব ভাইয়ের (পরবর্তীকালে একটি কলেজের অধ্যক্ষ) ধমক খেয়ে। বেশ পরে আইয়ুব ভাই আর আমি ছিলাম দুই প্রতিদ্বন্দ্বী পত্রিকার বার্তা সম্পাদক। পত্রিকা দুটোর মধ্যে সদ্ভাব ছিল না। তবু মাঝরাতে প্রায় প্রতিদিনই খবর সংক্রান্ত বিষয়ে আমাদের মধ্যে টেলিফোনে আলাপ হতো। বিশেষ করে কার পত্রিকায় আজ কোন রিপোর্ট লিড হওয়া উচিত সেই বিষয়ে ভাববিনিময় হতো আমাদের।
রাজনৈতিক বিষয়াদি পড়া ও লেখার ক্ষেত্রে আইয়ুব হোসেনকে যদি আমার প্রথম শিক্ষক বলি, তাহলে দ্বিতীয় শিক্ষক বলতে হবে মোস্তাফিজুর রহমান কাবুলকে; যিনি গেল মাসের শেষ দিন পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছেন। এই দুইজনই আমার চেয়ে বয়সে ঢের বড় হলেও উত্তরকালে তাদের সঙ্গে আমার বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল।
মোস্তাফিজুর রহমান কাবুল প্রসঙ্গে আসার আগে আরো কিছু কথা বলে নিই।
১৯৮৯ সালে ছাত্রমৈত্রীর জেলা সম্মেলনে আমাকে ‘করা হয়’ রাজনৈতিক শিক্ষাবিষয়ক সম্পাদক। ওই প্রথম আমার জেলা কমিটিতে অন্তর্ভুক্তি। আমার পূর্বসূরি ছিলেন মাসুদুর রহমান কল্লোল (কর্মোপলক্ষে প্রায় তিন দশক আগে যশোর ছেড়েছেন; এখন ঢাকায় বাণিজ্য করেন)। কর্মী থেকে নেতায় উন্নীত হওয়ার ক্ষেত্রে প্রথমে কমিটির কার্যনির্বাহী সদস্য হওয়াই দস্তুর। আমাকে কিন্তু প্রথম দফায়ই সম্পাদকমণ্ডলীতে নেওয়া হয়েছিল। এই ক্ষেত্রে অন্য অনেকের পাশাপাশি পূর্বসূরি কল্লোল ছাড়াও মাহমুদ হাসান বুলু, জিল্লুর রহমান ভিটু, মোস্তাফিজুর রহমান মুস্তা (বর্তমানে পৌরসভার চার নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর), শফিকুল আলম কলি (বর্তমানে আমেরিকা প্রবাসী) ছাড়াও মোস্তাফিজুর রহমান কাবুলের ভূমিকা যে ছিল, সেবিষয়ে আমি নিঃসন্দিহান। আর গণসংগঠনের নেতৃত্বে কারা আসবেন, চূড়ান্ত বিচারে তা যে মূল পার্টিই নির্ধারণ করে, তা বুঝেছি আরো পরে এসে; যখন আমাকে পার্টির প্রার্থী সভ্যপদ দেওয়া হয়।
তখনো পর্যন্ত মোস্তাফিজুর রহমান কাবুলের সান্নিধ্য আমি খুব কমই পেয়েছি। কখনো-সখনো কমিউনিস্ট লীগ অফিসে গেলে তার সঙ্গে দেখা হতো। কিছু কথাবার্তা হতো। প্রায়ই দেখতাম, কমিউনিস্ট লীগের কোনো বিজ্ঞপ্তি বা বার্তা নিজ হাতে লিখছেন কাবুল। আমি আগ্রহসহকারে তা দেখার চেষ্টা করতাম। কারণ লেখা শিখতে তো হবে। তা না হলে দেশহিতৈষীর আইয়ুব হোসেনের ঝাড়ি খাওয়া যে অনিবার্য।
১৯৯১ সালের অক্টোবরে অনুষ্ঠিত সম্মেলনে পদোন্নতি পেয়ে ছাত্রমৈত্রীর সহ-সাধারণ সম্পাদক হই। যতদূর মনে পড়ে সেই সময়ই আমাকে প্রার্থী সভ্যপদ দিয়ে পার্টিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। একটি সেলে সংগঠিত নয়া কমরেডদের মধ্যে আমিও একজন। সেই সেলের সভা হতো পার্টি অফিসে। অল্পকিছুদিনের মধ্যে অবশ্য আমাদের পার্টির সাইনবোর্ড বদলে গেল। ঐক্য সম্মেলনের মাধ্যমে আমরা হয়ে গেলাম বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির লোক।
তো সেল সভাগুলোতে নির্ধারণ করা হতো পাঠ্যসূচি। আমাদেরটা ছাড়াও অন্যান্য সেলের পঠিতব্য পুস্তক বাছাইয়ে মোস্তাফিজুর রহমান কাবুলের ভূমিকা থাকতো। প্রার্থী সভ্য হওয়ার সুবাদে ওয়ার্কার্স পার্টি অফিসে যাতায়াত বেড়ে গেল। ক্রমে কাছাকাছি যাওয়ার সুযোগ মিললো নেতাদের।
সেই সময় ছাত্র বা যুব সংগঠনের নেতাদের অনেকেই বেশ ফ্যাশনদুরস্ত ছিলেন। পার্টি নেতাদের প্রায় সবাই- যেমন জাকির হোসেন হবি, ইকবাল কবির জাহিদ, মাহবুব আলম, হারুন-অর রশিদ, অনিল বিশ্বাস প্রমুখ কিন্তু খুবই সাধারণ পোশাক-আশাক পরতেন। এর মধ্যে চোখে পড়ার মতো ব্যতিক্রম ছিলেন কাবুল ভাই। বাহারি পোশাকশোভিত তিনি ছিলেন না। তবে ক্লিনশেভড, মার্জিত পোশাকের এই লোকটিকে আমি কখনো শার্ট ইন না করে বাইরে বেরুতে দেখিনি।
নব্বইয়ের সফল ছাত্রগণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে বাংলাদেশে ‘গণতান্ত্রিক’ ধারা প্রতিষ্ঠিত হয়। আমরা অনেকেই আশা করেছিলাম, এই সময়ে পার্টি বিকশিত হবে নির্বিঘ্নে। কিন্তু তা হয়নি। ১৯৯১ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত বিএনপি ও আওয়ামী লীগের দশ বছরের শাসনামলে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় ওয়ার্কার্স পার্টি ও গণসংগঠনগুলো। বিশেষ করে ছাত্রগণসংগঠন তছনছ হয়ে যায় ওই এক দশকে; যে অবস্থা থেকে আর ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি দল ও সংগঠন। পরে ‘অকমিউনিস্টসুলভ, দৃষ্টিকটু ও স্থূল ভুল রাজনীতি’ দলকে ফেলে দেয় গভির খাদে।
সে যাই হোক, আমি ছাত্রমৈত্রীর সহ-সাধারণ সম্পাদক থাকাকালে এক অভাবনীয় পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। ২৩ সদস্যের জেলা কমিটির প্রায় অর্ধেক পর্যায়ক্রমে গ্রেফতার হয়ে জেলখানায় আশ্রয় পান। সাধারণ সম্পাদক শাহরিয়ার বাবু ও অন্যতম সহ-সাধারণ সম্পাদক মাহমুদ হাসান মিকু (বর্তমানে দুইজনই আইনজীবী) কারাগারে। সভাপতি জিল্লুর রহমান ভিটু একগাদা মামলা মাথায় নিয়ে ফেরার। সুযোগ বুঝে অফিসে এসে অল্প সময় অবস্থান করেন; প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিয়ে ফের গা-ঢাকা দেন। ছাত্রমৈত্রীর তখনকার গঠনতন্ত্র অনুযায়ী এক-তৃতীয়াংশে কোরাম পূর্ণ হতো (এখনকার গঠনতন্ত্র সম্বন্ধে আমার কোনো ধারণা নেই)। অবস্থা এমন দাঁড়ালো যে, দুই স্থানেই জেলা কমিটির সভা করা সম্ভব- জেলখানা ও সংগঠনের অফিসে। সঙ্গত কারণেই জেলখানায় সভা করা সম্ভব না। সভা সংগঠনের অফিসেই করতাম। প্রায় ছয় মাস এমন অবস্থা চলেছিল।
ছাত্রগণসংগঠনের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক হিসেবে আমাকে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করতে হতো, বিশেষত সভাপতি যখন ফেরার। এই সময়কালে আমি পার্টি নেতাদের সংস্পর্শে এসেছি সবচেয়ে বেশি। কারণ তাদের দিকনির্দেশনা ছাড়া সংগঠন চালানো অসম্ভব ছিল। পরিস্থিতিগত কারণে তখন কাবুল ভাইয়ের সাথে আমার ঘনিষ্ঠতা বেড়ে যায়। কোন সময় সংগঠনের কী ভূমিকা পালন করা উচিত, গণমাধ্যমে কীভাবে কাভারেজ নেওয়া যায়- ইত্যকার বিষয়ে তিনি আমাকে নিয়মিত সবক দিতেন। কথা হতো শ্রেণিরাজনীতি-শ্রেণিসংগ্রাম ছাড়াও সমসাময়িক নানা প্রসঙ্গে। এর মধ্যে এরশাদ স্বৈরশাহীর আমলে কাবুল ভাইয়ের ওপরে চালানো নির্যাতনের কাহিনিও শুনেছি তার মুখেই। একদিন কথা প্রসঙ্গে তিনি বলছিলেন, ‘‘আমাকে যেদিন মুক্তি দেওয়া হবে, সেদিন স্যান্ডেল পরতে বললো সেন্ট্রি। চোখ বাঁধা ছিল, তাই নিজের স্যান্ডেল দেখে নেওয়ার সুযোগ ছিল না। সেন্ট্রি স্যান্ডেল এগিয়ে দিলো পায়ের কাছে। কিন্তু আমার পা স্যান্ডেলে ঢুকছিল না। আমি বললাম, এটি বোধহয় আমার স্যান্ডেল না। সেন্ট্রি বললো, ‘এটিই আপনার স্যান্ডেল।’ আসলে নির্যাতনের ফলে পা ফুলে ঢোল হয়ে গিয়েছিল। তাই নিজের স্যান্ডেলেই পা ঢুকছিল না। বাধ্য হয়ে স্যান্ডেল হাতে নিয়ে খালি পায়ে চোখ বাঁধা অবস্থায় আমাকে নির্ধারিত স্থানে আনা হয় মুক্তির জন্য।’’
রাজনৈতিক নেতারা সচরাচর কথা বেশি বলেন, শোনেন কম। আমাদের দলে জাকির হোসেন হবি, অনিল বিশ্বাস, মোস্তাফিজুর রহমান কাবুলসহ আরো কয়েকজন এর ব্যতিক্রম ছিলেন। প্রয়োজনের অতিরিক্ত কথা তারা তেমন একটা বলতেন না। আবার কাবুল ভাই কথা বলতেন নিম্নস্বরে; যার পুরোটা বুঝতেও পারতাম না। তবে যেটুকু বুঝতাম, তাতে মনে হতো, তাৎপর্যহীন কথা তিনি বলতে পছন্দ করতেন না।
কমিউনিস্ট লীগ ও পরে ওয়ার্কার্স পার্টি অফিসে লেখালেখির মূল দায়িত্বটি পালন করতে দেখেছি কাবুল ভাইকে। ছোট ছোট কিন্তু পরিষ্কার অক্ষরে মনোযোগসহকারে লিখে চলেছেন তিনি। লেখার সময় প্রায়ই তার সামনে থাকতো চায়ের কাপ, হাতে সিগ্রেট। আগ্রহভরে তার লেখা দেখতাম বলে কখনো-সখনো কিছু কথাও হতো। কাবুল ভাই বলতেন, ‘দেখো তো বাবু, এইটা এইভাবে লিখলে কি ভালো হতো?’ আমি নিজের মতটা জানালে তা নিয়ে হয়তো কিছু সময় পক্ষে-বিপক্ষে কথা হতো। এইভাবেই লোকটির সাথে আমার যে সম্পর্ক তৈরি হয়, তা থেকে গিয়েছিল তিনি সুস্থ থাকা অবধি (হঠাৎ অসুস্থ হয়ে ঢাকা চলে যান তিনি; তারপর আর আমাদের দেখা বা কথা হয়নি)।
ঐক্যবদ্ধ ওয়ার্কার্স পার্টির প্রধান নেতা নিঃসন্দেহে রাশেদ খান মেনন। ’৯০-এর গণঅভ্যুত্থানে পাঁচ দলীয় জোটের নেতৃত্বে থাকায় বাংলাদেশের গণমাধ্যমে তার বেশ গুরুত্ব ছিল সেই সময়। মেনন এই অঞ্চলে জনসভা বা অন্য কোনো প্রোগ্রামে এলে তার বক্তব্য আগেই তৈরি করতেন কাবুল ভাই। অবাক হয়ে দেখতাম, স্থানীয়, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিতে আজ রাশেদ খান মেননের কী বক্তব্য গণমাধ্যমে যাওয়া উচিত, তা নির্ধারণে কাবুল ভাই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। নেতার সাথে হয়তো এনিয়ে মিনিট পাঁচেক আলাপ করেছেন। ব্যাস, লিখতে বসে গেছেন কাবুল ভাই। নির্ধারিত কর্মসূচিতে মেনন কথা শুরুর আগেই হয়তো পত্রিকা দপ্তরে তার বক্তব্য পৌঁছে গেছে কাবুল ভাইয়ের কল্যাণে।
আমি খেয়াল করে দেখেছি, পেশাদার সাংবাদিক না হয়েও সংবাদ ও সাংবাদিকতার প্রতি তীব্র আকর্ষণ ছিল কাবুল ভাইয়ের। গুরুত্বপূর্ণ কোনো খবর তার চোখ এড়াতো না। আমার ধারণা, সাপ্তাহিক বিচিত্রা এই ক্ষেত্রে তাকে প্রভাবিত করেছিল। একসময়ের সরকারি ট্রাস্টভুক্ত এই সাপ্তাহিক ম্যাগাজিনটিতে বহু গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেদন প্রকাশিত হতো। ‘ইনডেপথ রিপোর্টিং’ কাকে বলে, বিচিত্রা না পড়লে হয়তো আমি তা কখনো বুঝতেই পারতাম না। বিচিত্রা নিয়মিত পড়তে কাবুল ভাইই আমাকে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন। তিনি ম্যাগাজিনটির নিয়মিত গ্রাহক ছিলেন। তার বাড়িতে রক্ষিত থাকতে দেখেছি বহু বছরের শত শত কপি বিচিত্রা। পরে যখন সাপ্তাহিক যায়যায়দিন বাজারে এলো, এটিরও নিয়মিত পাঠক হয়ে উঠলেন তিনি। এই দুটি পত্রিকা যে রাজনীতিসচেতন মানুষকে পড়তেই হবে, একথা বহুবার আমাকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন কাবুল ভাই। সংবাদ, ইত্তেফাকের উপ-সম্পাদকীয়গুলো পড়তেও তিনি তাগাদা দিতেন।
আনুষ্ঠানিক রাজনীতি ত্যাগ করেছি ২০০০ সালের দিকে। কিন্তু ওই ঘরানার যে ক’জন নেতাকর্মীর সঙ্গে আমার গভীর সম্পর্ক, সম্ভবত কাবুল ভাই ছিলেন তার শীর্ষে। তার সঙ্গে সম্পর্ক দীর্ঘায়িত হওয়ার গুরুত্বপূর্ণ কারণগুলোর মধ্যে একটি হলো লেখালেখি।
শত ব্যস্ততার মাঝেও নিয়মিত পড়াশুনা করতেন কাবুল ভাই। খবরের কাগজে কোনো গুরুত্বপূর্ণ আর্টিকেল থাকলে ফোন করে পড়তে বলতেন। যশোরে পার্টির প্রকাশনায় তার ভূমিকা বরাবরই প্রধান থাকতো। যেকোনো প্রকাশনার কাজে হাত দেওয়ার আগে কাবুল ভাই বিষয়টি আমার সাথে শেয়ার করতেন। হয়তো আরো কারো কারো সাথে করতেন। আমি আনুষ্ঠানিক রাজনীতিতে নেই জেনেও তিনি আমার সাথে এসব বিষয়ে আলাপ করতে কুণ্ঠাবোধ করতেন না। কী করতে চাইছেন জানিয়ে আমার পরামর্শ চাইতেন। কখনো কখনো লেখাও চাইতেন। আবার হয়তোবা আমার কোনো লেখা পুনর্মুদ্রণ করতে চান, সেটির অনুমতিও নিয়ে নিতেন। আমার অজান্তে পার্টির কোনো প্রকাশনায় যদি আমার লেখা পুনঃপ্রকাশিত হতো, তাহলে তিনি নিশ্চিতভাবেই জানতেন, আমি তার বিরোধিতা করবো না। কিন্তু প্রখর ভদ্রতাবোধসম্পন্ন মানুষটি কখনো তা করেননি।
সরকারি চাকরি করেও তিনি অনানুষ্ঠানিকভাবে অন্তত দুটি পত্রিকায় কাজ করেছেন। প্রায়ই বলতেন, ‘বুঝলে বাবু, আর কয়দিন আছে চাকরি। এরপর সাংবাদিকতা করবো। আমাকে কিন্তু সহযোগিতা করতে হবে।’
কারণে-অকারণে কাবুল ভাই প্রায়ই প্রেসক্লাবে আসতেন। দীর্ঘসময় তিনি দিতে পারতেন না। যেটুকু সময় থাকতেন, কথা হতো মূলত রাজনীতি নিয়ে। ওয়ার্কার্স পার্টির রাজনীতি নিয়ে তার ছিল গভীর হতাশা। শীর্ষ নেতাদের কার্যকলাপে রীতিমতো বিরক্ত ছিলেন লোকটি। শেষদিকে এসে আমাকে একাধিকবার বলেছেন, ‘এরা যা করছে, তাতে এদের সাথে থাকা যায় না। কিছু একটা করতে হবে। তোমার সাথে আমার আলাপ আছে। দাঁড়াও চাকরিটা শেষ হোক। তারপর দুইজন একসাথে বসবো। অনেক কথা আছে।’
গেল বছর ভেঙে যায় ওয়ার্কার্স পার্টি। কিন্তু যে দলের রাজনীতি আর নেতাদের নিয়ে তার হতাশার অন্ত ছিল না, কাবুল ভাই সেই দলেই, সেই নেতাদের সাথেই থেকে যান। আমি অবাক হয়েছি তার এই সিদ্ধান্তে। পার্টি ভেঙে যাওয়ার আগ দিয়ে তার সাথে আমার কয়েকবার দেখা হয়েছে। কিন্তু এই বিষয়ে কথা বলার সুযোগ হয়নি। ভেবেছিলাম, সময় করে বিষয়টা নিয়ে কথা বলবো। কিন্তু সেই সুযোগ হয়নি, আর হবেও না কখনো।

[লেখক : সম্পাদক, সুবর্ণভূমি। সেক্রেটারি, প্রেসক্লাব যশোর। ঋণ স্বীকার : জিল্লুর রহমান ভিটু।]

আরও পড়ুন