আমি করোনা বলছি : এবার সংযত হও

আপডেট: 09:31:00 06/04/2020



img

ড. ফেরদৌসি বেগম

যে অদৃশ্য শক্তি চোখে দেখা যায় না, তাকে তোমরা মানবজাতি অনেক সময় বিশ্বাস করতে চাও না। কেউ কেউ বিশ্বাস করলেও সে অদৃশ্য শক্তির যে বিধান, যে নিয়ম, যে শৃঙ্খলা, যে নির্দেশ- তোমরা যুগে যুগে তা অস্বীকার করেছ এবং মাঝে মধ্যে সে অদৃশ্য শক্তি জানান দিয়েছে যে ‘আমি আছি’।
সৃষ্টির প্রথম থেকে তোমরা যখন সমাজবদ্ধ হতে শুরু করেছ, তখন থেকেই এই শক্তি সর্বত্র বিরাজমান, যাকে তোমরা প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে ধ্বংস করেছ। অথচ এ শক্তি বিরাজমান প্রকৃতির সর্বস্তরে। আকাশ, বাতাস, সমুদ্রের জলরাশি, মানুষ, প্রাণিকুল, বনভূমিসহ সর্বত্র- কোথায় নেই সে শক্তি? সদাসর্বদা তা বিরাজমান।
পৃথিবী সৃষ্টির আদিকাল থেকে তোমরা বারবার সেই নেয়ামতগুলোকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছ। নিজেদের মধ্যে হানাহানি, মারামারি, যুদ্ধ-বিগ্রহ করে রক্ত ঝরিয়েছ, ধনী-দরিদ্রে বিভাজিত হয়েছ। কেউ বানিয়েছ অট্টালিকা, কেউ হয়েছ গৃহহীন, কেউ খাচ্ছ, অপচয় করছ, মজুদ করছ, ফেলে দিচ্ছ আর কেউ না খেয়ে মৃত্যুমুখে পতিত হচ্ছ।
হাজার হাজার শিশুর রক্ত ঝরিয়েছ তোমাদের যুদ্ধে, হাজার হাজার মাকে করেছ অসম্মান। তোমাদের লোভ-লালসা, ভোগবিলাসের জন্য এমন অবস্থা তৈরি করেছ যে, যারা তোমাদের বিষাক্ত নিশ্বাস গ্রহণ করছে, দিচ্ছে বিশুদ্ধ বাতাস, ছায়া, বাসস্থান এবং তোমাদের সভ্যতার অনেক উপাদান- সেই বৃক্ষ-বনভূমি তোমরা দু’হাতে করেছ উজাড়। তোমাদের নাগরিক সভ্যতার যানবাহন, তোমাদের বিলাসিতার সরঞ্জাম থেকে নির্গত হয় বিষাক্ত গ্যাস। এ বিষাক্ত গ্যাসের কারণে বেড়েছে পৃথিবীর তাপমাত্রা। তোমাদের যে ছায়া দিয়ে সূর্যের খারাপ রশ্মি থেকে বাঁচাত বৃক্ষরাজি, সেই ছাতাকে করেছ ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন।
বারবার ঝড়, খরা, বন্যা, জলরাশি ফুঁসে ওঠে। সুনামি এসে তোমাদের জানিয়েছে, ‘থামো’ এবার তোমরা। ক্লাইমেট চেঞ্জের নাম দিয়ে মিটিং, সভা করে হাজার হাজার মানুষ জড়ো করে অর্থ অপচয় করে চলেছে ধনী দেশগুলো। দরিদ্র দেশগুলোকে বুঝিয়েছে, তোমাদের আমরা এই দেব, সেই দেব। কিন্তু হাজার বছরের যে প্রকৃতি তা কি ফেরত দেয়া যায়!
তোমরা ক্লাইমেট চেঞ্জের নামে শুধু দেশে দেশে মিটিং করে প্রকৃতিকে করেছ আরও দূষিত। আকাশও করেছ দূষিত। অথচ তোমরা জানো এসব করে কিছুই হবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত তোমরা অপ্রয়োজনীয় ভোগবিলাসে সংযত না হও। জাগতিক সুখের পেছনে এমন করে ছুটেছ যে মনোযোগ দাওনি তোমাদের সন্তানদের দিকে, পরিবারের দিকে। তুমি ও তোমার পরিবারের সদস্যরা ছুটেছ নাইট ক্লাবে। ইথিওপিয়ার অভুক্ত শিশুদের, সিরিয়ার অত্যাচারিত শিশুদের কান্নাকে অবহেলা করে উড়িয়েছ কাড়ি-কাড়ি টাকা।
তোমাদের বিলাসবহুল খাদ্যের চাহিদা মেটাতে অধিক উৎপাদনের নেশায় সার, কীটনাশকসহ নানা রাসায়নিক পদার্থ ছড়িয়ে ধ্বংস করেছ জীববৈচিত্র্য। হামলা করেছ তাদের ফুড চেইন বা খাদ্যচক্রকে। তোমাদের এই ভোগবিলাসিতার অংশ প্লাস্টিকে ভরে গেছে সাগর, মহাসাগর, নদী-নালা, খাল-বিল, পুকুর-জলাশয়। এভাবে বিপন্ন করেছ ওই সাগরের প্রাণিগুলোকে। ভ্রমণ ও আনন্দের নামে উজাড় করেছ পৃথিবীর সেরা সেরা বনভূমি, শস্যভূমি, প্রাণিকুলের আশ্রয়স্থল। শব্দদূষণে দূষিত করেছ সারা পৃথিবীকে। বঞ্চিত করেছ রাষ্ট্র, সমাজে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে। তোমরা এতই আকাশের দিকে তাকিয়েছিলে যে, তাকাওনি কখনও ভূমির দিকে।
মানুষের অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থানের মতো মৌলিক অধিকারগুলো তোমরা নিশ্চিত না করে গড়ে তুলেছ বড় বড় প্রাসাদ, অট্টালিকা। ভেবেছিলে সেখানে তোমরা থাকবে সুরক্ষিত, নিরাপদ। তোমাদের উগ্রতা, বেহায়াপনা, অত্যাচার, দেশে দেশে অযথা যুদ্ধ, মানুষ হত্যা কোনো কিছুই থামাওনি। প্রকৃতি কিন্তু অনেক দিন ধরেই এসব কর্মকাণ্ড- অবিচার, শোষণ, অত্যাচার-দেখে আসছিল।
আর ভাবছিল, তোমাদের শিক্ষা দেয়ার জন্য হলেও একবার তোমাদের থামানো উচিত। তাই আমি এসেছি, একটি ক্ষুদ্র পার্টিক্যাল (বস্তু) হয়ে, যার কোনো জীবন নেই। সে শুধু জীবনের ভেতরে গেলেই জীবন পায়, যাকে তোমরা কেউ চোখেও দেখতে পাও না।
এ এক অদৃশ্য শক্তি যাকে তোমরা শক্তিশালী ইলেকট্রনিক মাইক্রোস্কোপ দিয়ে খুব কষ্টে দেখতে পাও। আমি এমনভাবে নিজেকে বারবার পরিবর্তন করছি যে তোমরা আমার কোনো আচরণই ধরতে পারছ না। আর সে জন্যই আমার বিরুদ্ধে কোনো শাণিত অস্ত্রও তৈরি করতে পারছ না। আমি একটি ক্ষুদ্রকণা আজ সারা পৃথিবীকে স্তব্ধ করে দিয়েছি। বিজ্ঞানী, ডাক্তার, রাষ্ট্রপ্রধান, সবচেয়ে বড় ধনী ব্যক্তি- যে কেউ আমার কাছে ধরা দিতে পারে এবং এরই মধ্যে তার প্রমাণও পেয়েছ।
গরিব দেশের অসৎ উপায়ে লুট করা হাজার কোটি টাকার মালিক দেশে সাধারণ মানুষের জন্য চিকিৎসাব্যবস্থা না করে নিজেরা গিয়েছ উন্নত দেশে চিকিৎসা করাতে। হাঁচি-কাশি দিলেও ছুটে গেছ লন্ডন, সিঙ্গাপুর। আজ হাঁচি-কাশি, সর্দি, গলাব্যথা, ডায়রিয়া, এমনকি মৃত্যুর মুখোমুখি হলেও কোথাও যেতে পারছ না, সব বন্ধ করে দিয়েছি আমি। পরিবার-পরিজনকে সময় না দিয়ে অন্যায় করেছ, আজ ঘর বন্দি তোমরা। উৎসবের নামে বিভিন্ন দেশে, বিভিন্ন সময়, বিভিন্ন বর্ষে, বিভিন্ন উছিলায় লক্ষ কোটি টাকা অপচয় করেছ।
একবারও তাকাওনি শতকোটি মানুষের ক্ষুর্ধাত মুখের দিকে। অন্নহীন, বস্ত্রহীন শিশুগুলোর দিকে। আজ দেখ, আমি একটি ক্ষুদ্র পার্টিক্যাল তোমাদের উৎসব, দিবস, বর্ষ, আনন্দ, প্রমোদ সব বন্ধ করে দিয়েছি। বন্ধ হয়েছে যুদ্ধ, বন্ধ হয়েছে সব অন্যায়, অত্যাচার, অবিচারের ডামাডোল। পরাশক্তিগুলোকে আমি একসঙ্গে বসিয়েছি। সব মানুষকে এককাতারে দাঁড় করিয়েছি। ধর্ম-অধর্ম সব বিভেদ ভুলিয়েছি। হানাহানি, কাটাকাটি বন্ধ করে সবাইকে পরিবারের মধ্যে ফিরিয়ে এনেছি। তোমাদের লোভ-লালসা থামিয়ে দিয়েছি। যারা চিরবঞ্চিত তাদের কাতারে দাঁড় করিয়েছি।
শব্দদূষণমুক্ত করেছি পৃথিবীকে। বাতাসকে করেছি দূষণমুক্ত। আহ! কী নির্মল অক্সিজেনের ছড়াছড়ি। ডলফিনসহ সাগরের প্রাণীরা আজ সাগরের নীল জলে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলছে। পাখিরা ডানা মেলে আকাশে উড়ছে। জোনাকিরা মিটমিট করে জ্বলছে। প্রজাপতি উড়ছে ফুলে ফুলে। সৃষ্টির জীবকুল তাদের ইকোসিস্টেম ফিরে পেয়েছে।
জীববৈচিত্র্য ফিরে পেয়েছে তাদের ফুড চেইন। সমুদ্রের উদ্ভিদরাজি তাদের জীবন ফিরে পেয়েছে। ছোট ছোট তৃণলতা, ঘাসলতা, যারা তোমাদের পদভারে পিষ্ট হয়ে যেত, অনেক উপকারী অণুজীব নষ্ট হয়ে যেত, তারা আজ আবার তাদের প্রাণ ফিরে পেয়েছে। এতে কি তোমরা বুঝতে পারছ না এর পর তোমাদের করণীয় কী? এর থেকে কি তোমরা শিক্ষা নিতে পারছ না?
তোমাদের সবাইকে নিয়ে সৃষ্টিকর্তার সব সৃষ্টিকে মর্যাদা দিয়ে চলতে হবে। ক্ষমতাশালীরা কি বুঝতে পারছে না তাদের ক্ষমতার পরিধি? একটি ক্ষুদ্র পার্টিক্যালের কাছে তোমরা পরাজিত, তারপরও তোমরা তোমাদের শক্তির বড়াই করে যাচ্ছ। এবার থামো।
আমি হয়তো আরও কিছুদিন থাকব; কিন্তু তোমরা যদি এর থেকে শিক্ষা না নাও, আমি বলছি, আমি আবারও ফিরে আসব অন্য কোনো রূপে, অন্যভাবে। স্তব্ধ করে দেব সবকিছু। সুন্দর হোক, নির্মল হোক, শান্ত হোক সব সৃষ্টি- তোমাদের কাছে আমার এই আবেদন।
[লেখক : জীবপ্রযুক্তিবিদ; নির্বাহী পরিচালক, ডেবটেক। যুগান্তর থেকে।]