আহমদ শফীর নেতৃত্ব কী কারণে চ্যালেঞ্জে পড়লো?

আপডেট: 03:21:26 18/09/2020



img

কাদির কল্লোল

বাংলাদেশে চট্টগ্রামের হাটহাজারী মাদরাসায় হেফাজতে ইসলামের আমির আহমদ শফীর ত্রিশ বছরেরও বেশি সময়ের একচ্ছত্র কর্তৃত্ব চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। এই চ্যালেঞ্জ এসেছে তারই অনুসারী জুনায়েদ বাবুনগরীর পক্ষ থেকে।
মি. শফীর ছেলে আনাস মাদানী অভিযোগ করেছেন, গত দুইদিনে মি. বাবুনগরীর সমর্থক ছাত্ররা এবং কিছু বহিরাগত বিক্ষোভ করে মাদরাসাটির দখল নিয়েছিল।
তবে মি. বাবুনগরীর পক্ষ থেকে এই অভিযোগ অস্বীকার করা হয়েছে।
বিক্ষোভকারীরা মি. শফীকে মাদরাসার প্রধানের পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া এবং তার ছেলে আনাস মাদানীকে অব্যাহতি দেওয়াসহ ছয় দফা দাবিসম্বলিত লিফলেট বিলি করেছিল।
বিক্ষোভ থেকে মি. শফী এবং তার সমর্থক শিক্ষকদের কক্ষ ভাঙচুর এবং একজনকে মারধরের ঘটনাও ঘটে।
বিক্ষোভের মুখে মি. শফীকে হাজির করে মাদরাসার পরিচালনা কমিটির বৈঠক করা হয় এবং সেই বৈঠকের পর আনাস মাদানীকে মাদরাসার শিক্ষকের পদ থেকে অব্যাহতিও দেওয়ার কথা জানানো হয়।
শেষপর্যন্ত শিক্ষা মন্ত্রণালয় মাদরাসাটি বন্ধ করে দেয়।

একচ্ছত্র কর্তৃত্ব
চট্টগ্রামের হাটহাজারীতে ১২৪ বছরের পুরনো এই মাদরাসার নাম হচ্ছে, জামিয়াতুল আহলিয়া দারুল উলুম মঈনুল ইসলাম।
মি. শফী এই মাদরাসায় প্রিন্সিপাল এবং একইসাথে পরিচালকের দায়িত্ব পান ১৯৮৯ সালে। এর আগে ২০ বছরেরও বেশি সময় তিনি সেখানে শিক্ষকতা করেছেন।
মাদরাসাটির একজন সাবেক শিক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন, বেশ কয়েক বছর আগে তাকে অসম্মান করে মাদরাসা থেকে বের করে দেওয়া হয়েছিল।
তিনি বলেছেন, মি. শফী যখন প্রধানের দায়িত্ব পালন শুরু করেন, তখন মাদরাসার বেশিরভাগ শিক্ষকই তার ছাত্র ছিলেন। ফলে তারা মি. শফীর কোনো সিদ্ধান্ত বা কর্মকাণ্ড কখনো চ্যালেঞ্জ করতেন না।
এছাড়া ১৯৯০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে মি. শফীর ছেলে আনাস মাদানী মাদরাসায় শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পান।
সাবেক ওই শিক্ষক আরো জানিয়েছেন, একদিকে বেশিরভাগ শিক্ষকের পক্ষ থেকে কোনো চ্যালেঞ্জ ছিল না, অন্যদিকে ৯০-এর দশকের শেষ দিকে রাজনীতিতে ধর্মের প্রভাব বাড়তে থাকায় দেশের সবচেয়ে বড় মাদরাসার প্রধান হিসাবে মি. শফীর একটা গুরুত্ব এবং ভাবমূর্তি তৈরি হয়।
এ সবের সুযোগ নিয়ে পরিস্থিতির কারণে মাদরাসাটিতে মি. শফী এবং তার ছেলে মি. মাদানীর একচ্ছত্র কর্তৃত্ব গড়ে ওঠে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
এই শিক্ষক অভিযোগ করেছেন, মাদরাসা পরিচালনার যে কমিটি রয়েছে, যাকে শূরা বলা হয়, ২০০০ সাল থেকে ১৬ বছর সেই কমিটির কোনো বৈঠক করা হয়নি। একক নেতৃত্বে ছাত্র ভর্তি এবং শিক্ষক নিয়োগ ও অপসারণসহ সব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
সে কারণে কর্তৃত্ব বা মাদরাসার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে শিক্ষকদের মধ্যে দ্বন্দ্ব চলছিল দীর্ঘ সময় ধরে। এখন তারই প্রকাশ ঘটেছে বলে তিনি মনে করেন।

রাজনীতি এবং ষড়যন্ত্র?
মি. মাদানী একচ্ছত্র কর্তৃত্ব বা স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
তিনি বলেছেন, মাদরাসার কোনো কাজ একক সিদ্ধান্তে হয়নি এবং কোনো ক্ষেত্রে অনিয়ম নেই।
তিনি দাবি করেছেন, মাদরাসার সিনিয়র শিক্ষকদের সঙ্গে পরামর্শ করে স্বচ্ছতার সাথে সব কাজ হয়েছে।
তিনি এখনকার ঘটনার পেছনে 'রাজনীতি এবং ষড়যন্ত্র' রয়েছে বলে অভিযোগ করেন।
"১৯৮৫ সালে একটা অপশক্তি মাদরাসা দখল করার জন্য হামলা করেছিল এবং তখন একজন নিহতও হয়েছিল। সেই ঘটনায় তখনকার মুরব্বিরা সামাল দিয়েছিলেন।
''সেই পরাজিত শক্তি এখন আবার অনেকদিন ধরে হাটহাজারী মাদরাসায় হামলা চালিয়ে দখল নেওয়ার পরিকল্পনা করছিল। তারাই মাদরাসার একজন শিক্ষকের সমর্থনে বহিরাগতদের নিয়ে সহিংসতা চালিয়েছে," বলছেন মি. মাদানী।
মি. মাদানী রাজনৈতিক প্রসঙ্গ টেনে বলেছেন, "যখন আলেম-ওলামাদের সাথে সরকারের একটা সুসম্পর্ক তৈরি হয়েছে, তখন তা নস্যাৎ করার জন্য দীর্ঘ দিনের পরিকল্পনা অনুযায়ী এটা করা হয়েছে। কওমি মাদরাসা-শিক্ষাকে ধ্বংস করার জন্য আন্দোলনের নামে ভাঙচুর এবং অনেক শিক্ষককে অবরুদ্ধ করে রাখা হয়েছিল।"
তিনি অভিযোগ করেছেন, বিক্ষোভে তাকে বহিষ্কারের দাবি করা হলেও এর মূল টার্গেট মাদরাসাটির পরিবেশ নষ্ট করা।
তার একজন সমর্থক শিক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন, কিছু ছাত্রকে ক্ষেপিয়ে তোলা হয়েছে এবং মাদরাসায় আন্দোলনের পেছনে কোনো উগ্রগোষ্ঠী এবং সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দলের মদত রয়েছে বলে তারা মনে করছেন।

দ্বন্দ্ব কোথায়
মাদরাসাটির একজন সিনিয়র শিক্ষক বলেছেন, আহমদ শফীর বয়স একশ'র বেশি হয়েছে। বয়সের ভারে তিনি এক দশকের বেশি সময় ধরে কোনো কর্মকাণ্ড চালাতে পারছেন না। ফলে তার উত্তরসূরি কে হবেন- এই প্রশ্নে অনেকদিন ধরেই শিক্ষকদের মধ্যে নানা আলোচনা ছিল।
তিনি জানিয়েছেন, মাদরাসার সিনিয়র শিক্ষক জুনায়েদ বাবুনগরীকে ২০১৭ সালে সহকারী পরিচালক করা হয়েছিল। তিনিই উত্তরসূরি হতে পারেন- এমন একটা আলোচনা ছিল। কারণ তাকে হেফাজতে ইসলামের মহাসচিবও করা হয়েছিল।
কিন্তু ওই সিনিয়র শিক্ষক মনে করেন, আনাস মাদানীর পরামর্শে মি. শফী মাদরাসার সাবেক একজন শিক্ষক শেখ আহমদকে আবার ফিরিয়ে আনেন। তখন এটা স্পষ্ট হয় যে মি. বাবুনগরীকে ঠেকানোর জন্য তাকে আনা হয়েছে। এনিয়ে মি. বাবুনগরী এবং তার সমর্থকদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হচ্ছিল।
গত এপ্রিল মাসে মি. বাবুনগরীকে মাদরাসার সহকারী পরিচালকের পদ থেকে সরিয়ে শেখ আহমদকে সেই পদে বসানো হয়। সে সময়ও মাদরাসায় উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছিল। কিন্তু তা তখন প্রকাশ হয়নি।
পরে রমজানের মধ্যেও একই ইস্যুতে উত্তেজনা দেখা দিলে তখন দুই পক্ষ আলোচনার পর মি. মাদানী এবং মি. বাবুনগরী ছাত্রদের সামনে একসঙ্গে ঘোষণা করেছিলেন যে, তাদের মধ্যে কোনো দ্বন্দ্ব নেই। কিন্তু এখন দ্বন্দ্ব দৃশ্যমান হয় ব্যাপকভাবে।
যদিও মি. বাবুনগরীর সমর্থক হিসেবে পরিচিত মাদরাসাটির একজন শিক্ষক আশরাফ আলী নিজামপুরী বলেছেন, ছাত্রদের বিক্ষোভের সঙ্গে মি. বাবুনগরী বা তাদের কোনো সম্পর্ক নেই। ভর্তিসহ নানা ক্ষেত্রে হয়রানির জন্য মি. মাদানীর প্রতি ক্ষোভ থেকে ছাত্ররা বিক্ষোভ করেছে বলে তিনি উল্লেখ করেছেন।
মি. মাদানী এসব অভিযোগ মানতে রাজি নন। তিনি মনে করেন, উগ্র কোনো গোষ্ঠী এবং বাইরের মদতে তার বাবার নেতৃত্বকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলা হচ্ছে এবং বিতর্কিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে।

রাজনীতি আছে কি?
মাদরাসাটির পরিচালনা কমিটির একজন সদস্য বলেছেন, হেফাজতে ইসলামের কর্মকাণ্ডের কারণে রাজনীতিও একটা বিষয় হয়েছে দ্বন্দ্বের পেছনে।
তিনি আরো বলেছেন, ২০০৯ সালে হেফাজতে ইসলাম যাত্রা শুরু করে চট্টগ্রামে আঞ্চলিক পর্যায়ে। ২০১৩ সালে বিভিন্ন দাবি নিয়ে ঢাকার শাপলা চত্বরে অবস্থান কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে ব্যাপক সহিংসতা হলো।
এরপর হেফাজতে ইসলাম এবং আহমদ শফী ও আনাস মাদানীর সাথে আওয়ামী লীগ সরকারের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক অনেক ক্ষেত্রে দৃশ্যমান হয়। সেই প্রেক্ষাপটে হেফাজতে ইসলামের কর্মকাণ্ড নিয়েও মি. শফীর সঙ্গে জুনায়েদ বাবুনগরী এবং তার সমর্থকদের দ্বন্দ্ব আরো বাড়তে থাকে।
পরিচালনা কমিটির ওই সদস্য মনে করেন, মি. বাবুনগরী সরকারবিরোধী অবস্থানের কারণে পরিচিত হয়ে ওঠেন।
মি. শফীর সমর্থকদের পক্ষ থেকে মি. বাবুনগরীর বিরুদ্ধে বিএনপি জামায়াতের সম্পৃক্ত রাখার অভিযোগ করা হয়। যদিও তিনি তা বিভিন্ন সময় অস্বীকার করেছেন।
তবে মাদরাসার একজন সাবেক শিক্ষক মনে করেন, অভ্যন্তরীণ বিষয়ের সঙ্গে বাইরের রাজনীতি এবং ব্যক্তিস্বার্থের কারণেও সেখানে দ্বন্দ্ব চরমে পৌঁছেছে এবং এখন পরিস্থিতি অস্থির হয়েছে।

মাদরাসাটির গুরুত্ব
দেশে সবচেয়ে বড় এই কওমি মাদরাসায় সাত হাজারের বেশি শিক্ষার্থী রয়েছেন। অন্য কওমি মাদরাসাগুলোর বেশিরভাগই হাটহাজারীর এই মাদরাসার নির্দেশনা অনুসরণ করে থাকে। অ্যাকাডেমিক দিক থেকে এর গুরুত্ব রয়েছে।
বিশ্লেষকরা বলেছেন, দুই দশক ধরে বিভিন্ন সরকার বা বড় রাজনৈতিক দলগুলোও হাটহাজারীর এই মাদরাসাকে গুরুত্ব দিয়েছে। ফলে এর একটা রাজনৈতিক গুরুত্বও অনেক সময় দৃশ্যমান হয়েছে।
বিশেষ করে কওমি মাদরাসাভিত্তিক সংগঠন হেফাজতে ইসলাম ২০১৩ সালে লংমার্চ এবং ঢাকা অবরোধের মতো কর্মসূচি নিয়ে আলোচনায় উঠে এসেছিল। সংগঠনটি তখন কয়েকজন ব্লগারের বিরুদ্ধে ইসলাম ধর্ম নিয়ে কটূক্তি করার অভিযোগসহ ১৩ দফা দাবি তুলেছিল।
সেই হেফাজতে ইসলামের আমির হচ্ছেন আহমদ শফী এবং মহাসচিব জুনায়েদ বাবুনগরী।
২০১৩ সালের ৫ মে অবরোধ কর্মসূচি থেকে হেফাজতে ইসলামের নেতাকর্মীদের ঢাকার শাপলা চত্বরে অবস্থান নেওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে ব্যাপক সহিংসতা হয়েছিল।
বিশ্লেষকরা মনে করেন, হাটহাজারীর মাদরাসাটি যেমন রাজনৈতিক গুরুত্ব পেয়েছে, তেমনি তাদের রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার হওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
তবে কওমি মাদরাসা শিক্ষার পাশাপাশি রাজনৈতিক দিক থেকে গুরুত্ব-  সবমিলিয়ে মাদরাসাটির নিয়ন্ত্রণ বা কর্তৃত্ব নিয়ে দ্বন্দ্ব অনেক বছর ধরে রয়েছে।
তবে এই মাদরাসায় প্রবেশাধিকার সংরক্ষিত হওয়ায় বড় কোনো ঘটনা না ঘটলে তা প্রকাশ হয়নি বা সংবাদমাধ্যমে আসেনি।
[বিবিসির বিশ্লেষণ]

আরও পড়ুন