আহসান কবীরের ভ্রমণকাহিনি

আপডেট: 10:15:44 01/06/2020



img
img
img
img
img
img

চারমিনার গোলকোন্ডা রামোজি হুসেন সাগর

-এক্সকিউজ মি, স্যর। আর য়্যু মিস্টার আহসান কাবির?
-ইয়েস। অ্যান্ড য়্যু?
-আর য়্যু গোয়িং টু মুম্বাই, অ্যান্ড দেন ডাক্কা?
-ইয়েস। বাট হোয়াট হ্যাপেন্ড?
-আই এম এ স্টাফ অব দিস এয়ারপোর্ট। য়্যু হ্যাভ এ প্রবলেব ইন ইওর লাগেজ।
-হোয়াট!
-ইয়েস।
-সো হোয়াট ক্যান আই ডু?
-ইউ হ্যাভ টু গো উইথ মি।
-হোয়ার?
-প্লিজ ফলো মি।
-ওকে।

রাজিব গান্ধি ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট, হায়দরাবাদ। ভূতলে নামছিলাম এস্কেলেটরে চেপে। হঠাৎ পেছন থেকে আবির্ভূত হওয়া এক তরুণের সাথে এই কথোপকথন।
হায়দরাবাদ গেছি সরকারি প্রোগ্রামে। ইনডিয়াসফট-গ্লোবালসফটে। ২১ সদস্যের বাংলাদেশ ডেলিগেটের অন্যতম সদস্য হয়ে। টিমের ১৯ জন কলকাতা হয়ে বাংলাদেশ ফিরে গেছেন দুইদিন আগেই। সহকর্মী অজয় আর আমি হায়দরাবাদ থেকে গেছি। দুইজন দুই জায়গায়; ফ্লাইটও দুই সময়ে।
আমার ফ্লাইটের টাইম ভোর পাঁচটা ২০ মিনিট। মধ্যরাতে উবার ডেকে হোটেল ছেড়েছি। ফাঁকা রাস্তা বেয়ে সাঁ করে এয়ারপোর্ট পৌঁছে দিলেন ড্রাইভার। হাতে কোনো কাজ নেই। সাথে সাথেই হাজির হয়েছি স্পাইসজেটের ডেস্কে। সেখানে নিম্নপদমর্যাদার একজনই ছিলেন। জানালেন, রাত দুইটায় সংশ্লিষ্টরা আসবেন। অগত্যা অপেক্ষা। কিছু সময় ফোন ঘাঁটাঘাঁটি। কোনো ওয়াইফাই পাওয়া যায় কি-না সেই কোশেশও করলাম খানিকক্ষণ। না। ওয়াইফাই সুবিধা নিতে হলে ইনডিয়ান ফোন নাম্বার দিতে হবে। ওই দেশের সিম একটা আছে বটে; কিন্তু তা পশ্চিমবঙ্গের বাইরে কাজ করে না। অগত্যা রাত দুটোর জন্য চুপচাপ অপেক্ষা।
দুটো বাজতে না বাজতেই হাজির স্পাইসজেটের কর্মীরা। লাইনে দাঁড়িয়ে বোর্ডিং পাশ নিয়ে নিরাপত্তা চৌকি পার হয়েছি। আনমনে হেঁটে চলেছি নির্ধারিত গেটের দিকে। তখনই এই বিপত্তি।
ছোকরা টাইপ কর্মীর কথায় বুঝলাম আমার লাগেজ নিয়ে কোনো একটা ঝামেলা হয়েছে। এস্কেলেটর থেকে উঠে এলাম। বললাম, ‘লেট আস গো’। হাঁটছি আর ভাবছি, ছোট লাগেজটিতে এমন কিছু তো নেই, যাতে ঝামেলা হতে পারে।
সহসা মনে এলো ইনহেলারের কথা। বিশ্বময় ছড়িয়ে পড়ছে নোভেল করোনাভাইরাস। এই ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীদের জন্য দুনিয়ার সব এয়ারপোর্টে বিশেষ সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। কোনোভাবেই যেন আক্রান্ত ব্যক্তি ঢুকে পড়তে না পারে। করোনাভাইরাসে আক্রান্ত ব্যক্তির যেসব লক্ষণ থাকে, তার অন্যতম হলো শ্বাসকষ্ট। আমি ক্রনিক ব্রংকাইটিসের রোগী। ফলে পকেটে সবসময় ইনহেলার থাকে। এবারই প্রথম ব্যতিক্রম।
হায়দরাবাদে যাওয়ার সময় ইনহেলার ব্যবহার করেছি বেশ। কিন্তু ওখানে যাওয়ার পর ব্যবহার কমে গেছে। কারণ বোধ করি পরিচ্ছন্ন পরিবেশ।
ভারতবর্ষে এযাবৎ আমার দৌঁড় কলকাতাঅব্দি। বহুবার গেছি। সত্যি বলতে কি, কলকাতা আর বাংলাদেশে পার্থক্য দেখিনি। সেই একই রকম অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ, মানুষের ভিড় আর নাকে কালো ধোঁয়া ছেড়ে ছুটে চলা যানবাহনের সারি। কিন্তু এবার দক্ষিণ ভারতের গুরুত্বপূর্ণ সিটি হায়দরাবাদে গিয়ে দেখা মিললো ভিন্ন পরিবেশের। ঐতিহ্যমণ্ডিত পুরনো শহরের রাস্তাগুলো সঙ্গত কারণেই সংকীর্ণ। কিন্তু নতুন শহর পুরোই আলাদা। বেশ ফাঁকা ফাঁকা। রাস্তাগুলো বহু লেনবিশিষ্ট। কোথাও ট্রাফিক জ্যাম চোখে পড়েনি। দুই রাজ্যের রাজধানী হওয়ার মতো শহরই বটে।
অবাক হলেন? ঠিকই পড়েছেন। দক্ষিণ ভারতের অন্ধ্রপ্রদেশের তেলেগু ভাষাভাষী জেলাগুলো নিয়ে আলাদা রাজ্য গঠনের দাবি অনেকদিনের। এই সেদিন- ২০১৪ সালের ২ জুন এই দাবি পূরণ হয়। নতুন প্রদেশ হয় তেলেঙ্গানা; যার রাজধানী হায়দরাবাদ। আবার পুরনো রাজ্য অন্ধ্রের রাজধানীও বৈশিষ্ট্যপূর্ণ এই শহরটি। ২০২৪ সাল পর্যন্ত চলবে এই ব্যবস্থা।
১৫৫০ খ্রিস্টাব্দে মুসলিম শাসক মুহম্মদ কুলী কুতুব শাহ পত্তন করেন হায়দরাবাদ শহরের। শুরুতে অবশ্য নাম ভিন্ন ছিল।
দ্বিতীয় দিনই গিয়েছিলাম চারমিনারে। মুসলিম স্থাপত্যকলার অপূর্ব নিদর্শন এই সুউচ্চ মিনার হায়দরাবাদ শহরের সিম্বল। ১৫৯১ থেকে ১৫৯৩ সালের মধ্যে কুলী কুতুব শাহ চারমিনার নির্মাণ করেন। এর ভেতরে-বাইরে অপরূপ কারুকার্যময়। প্লেগ মহামারী নির্মূলের পর আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায়ের জন্য চারমিনার নির্মিত হয়েছিল বলে কথিত।
চারমিনারের পাশেই দেখার মতো গেট। রয়েছে প্রাচীন স্থাপনা ‘মক্কা মসজিদ’। দক্ষিণ ভারতের বৃহত্তম মসজিদ এটি। স্থাপত্যশৈলীর অনন্য নির্দশন এই ধর্মীয় পীঠস্থান। এখানে একসঙ্গে প্রায় দশ হাজার মানুষ নামাজ আদায় করতে পারেন। এই মসজিদে আসরের নামাজ পড়ে এসে আমার দুই সহকর্মী অভিব্যক্তি জানালেন এভাবে- ‘কলিজা ঠান্ডা হয়ে গেল’।
কার্যত হায়দরাবাদ অবস্থানকালে জনারণ্যে আমার অবস্থান এখানেই প্রথম, এখানেই শেষ।
থেকেছি তিন তারকাবিশিষ্ট সরাইখানায়। প্রোগ্রামের ভ্যেনু ফাইভ স্টার হোটেল। দুই স্থানে যাতায়াতের জন্য শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত স্পেশাল বাস। ফলে কোথাও ভিড়-ভাড়াক্কার মধ্যে পড়তে হয়নি। ধোঁয়া-ময়লার সংস্পর্শে না আসায় ইনহেলারের ব্যবহারও কমেছে অনেক।
নির্ধারিত কর্মসূচি শেষ হওয়ার আগেই দলবলসহ বেরিয়েছি বিখ্যাত গোলকোন্ডা ফোর্ট দেখতে। বিশাল দুর্গ। দেখার মতো। গোটা দুর্গ দেখতে হলে বেশ কায়িক পরিশ্রম করতে হয়। পাহাড় কেটে তৈরি ফোর্টের শীর্ষস্থানে উঠতে ৩৬০টি ধাপ পার হতে হয় পায়ে হেঁটে। পাহাড়শিখরে ছিল দরবার হল, হারেম মহল, তোপখানা প্রভৃতি। যার কিছু এখনো টিকে আছে, কিছু ধ্বংস হয়ে গেছে। এমন স্থাপনার শীর্ষদেশে না উঠে চলে এলে মনের মধ্যে খুঁত খুঁত করবে। সহযাত্রী মনসুর, লিপি খানম টিয়া, শারমিন নাজিয়াকে নিচে রেখে আমাদের ঊর্ধ্বমুখি গমন। সঙ্গে রিপন আর অজয়। শাহজালাল অবশ্য কাউকে কিছু না বলে হারিয়ে গেছে। দুর্গের শীর্ষদেশে তার দেখা পাবো- একথা উঠার সময় দুই সহযাত্রীকে জোর দিয়ে বললাম। শাহজালালের রাঙামাটির শুভলং ঝরনার মাথায় উঠে পড়ার দৃশ্য এই ক’দিন আগেই প্রত্যক্ষ করেছি।
এই গোলকোন্ডা ফোর্টেই একসময় ছিল বিশ্ববিখ্যাত কোহিনূর ও হোপ। মহামূল্যবান এই দুটি হীরা পরে মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেবের হস্তগত হয়। সেখান থেকে চলে যায় ব্রিটিশ তস্করদের হাতে- ইংল্যান্ডে। রাজ্য ছাড়াও কোহিনূর-হোপের মতো মহামূল্য রত্ন রক্ষা করতেই হয়তো দরকার পড়েছিল গজাল বসানো ফটকের; যার ধ্বংসাবশেষ এখনো চোখে পড়লো। আসলেই এই দরজা ভেদ করা হস্তিবাহিনীর কম্ম নয়।
শেষ আড়াই-তিনদিন আমি নিঃসঙ্গ। একা একা ঘুরে বেড়িয়েছি দর্শনীয় স্থান আর পথে-প্রান্তরে। গেছি হায়দরাবাদের অবশ্য দর্শনীয় স্থান ‘রামোজি ফিল্ম সিটি’তে। সংস্পর্শে এসেছি হুসেন সাগরে অতিকায় বুদ্ধর।
রামোজি শুধু ভারতেই নয়, বলা হয় এটি বিশ্বের সবচে’ বড় ইন্টিগ্রেটেড ফিল্ম প্রোডাকশন কমপ্লেক্স। সিনেমা প্রযোজক রামোজি রাও এক হাজার ৬৬৬ একর ভূমির ওপর নির্মাণ করেছেন এটি। এই ফিল্ম সিটি হায়দরাবাদ শহরের কেন্দ্রস্থল থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার দূরে। রানওয়ে-সদৃশ ৮-১০ লেনের এক্সপ্রেসওয়ে ধরে ঘণ্টাখানেকের মধ্যে পৌঁছানো যায় এখানে।
সিনেমা তৈরি করতে যা যা দরকার, দৃশ্যত তার সবই আছে এখানে। বন-জঙ্গল, পাহাড়-পর্বত, মরুভূমি-সমতলভূমি। মসজিদ-মন্দির। রেলস্টেশন-স্ট্যাচু। পৃথিবীর নানা প্রান্তের নির্মাণশৈলিতে গড়ে তোলা ভবন। আছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, গবেষণাগার মায় রেলস্টেশন-কারাগার পর্যন্ত। বাদ নেই প্রাচীন ভারতের গুহাও।
সিনেমায় আপনি আইফেল টাওয়ার, নাকি তাজমহল দেখাতে চান? প্যারিস-আগরায় না গেলেও চলবে। রাজদরবারের দৃশ্যায়ন করতে চান, নাকি সাহেবদের ড্রয়িংরুমের? পেয়ে যাবেন রামোজিতে।
পায়ে হেঁটে যদি গোটা রামোজি ফিল্ম সিটি দেখতে চান, তো কম্ম সাবাড়। কষ্টের পাশাপাশি দিনদুয়েক সময় লাগবে বোধহয়। দর্শনার্থীদের সুবিধার্থে তাই নিজস্ব বাস সার্ভিস। বাসেই থাকেন গাইড। যিনি হিন্দি-ইংরেজির সংমিশ্রণে বর্ণনা দেন।
এই ফিল্ম সিটিতে এখনো সযত্নে রাখা আছে বিখ্যাত ‘বাহুবলি’র সেট। আলোচিত ‘লুঙ্গি ড্যান্স’-এর শ্যুটিং এখানেই হয়েছিল। আরো কত সব বিখ্যাত সিনেমা বা গানের দৃশ্যায়নে রামোজিকে ব্যবহার করা হয়েছে, গাইড তা বর্ণনা করতে ভোলেন না।
দুপুরে যখন রামোজির গেটে নামিয়ে দিলো ট্যাক্সি, তখনো ভাবিনি সারাটা দিন এই কৃত্রিম জায়গায় কাটিয়ে দেওয়া সম্ভব হবে। টিকেট কাউন্টারে গিয়ে তো চক্ষু ছানাবড়া। জনপ্রতি টিকেট এক হাজার ৩৬০ রুপি! কাছাকাছি হলে ফিরে আসতাম। কিন্তু ৩৫ কিলোমিটার পেরিয়ে এসেছি। ফিরে যাওয়া চলবে না। কড়কড়ে নোট বের করে টিকেট কেটে ফেললাম। ভেতরে গিয়ে বাসে চেপে শুরু হলো দর্শনপর্ব। সাঙ্গ করে যখন বেরিয়ে এলাম, সূর্যের মলিন আভা তখন পশ্চিম আকাশে কিঞ্চিৎ দৃশ্যমান।

ছোকরা স্টাফের সাথে হাঁটছি তো হাঁটছিই। একপর্যায়ে নামতে হলো লিফটে চেপে। ভূমির কয়েক ফ্লোর নিচে নামিয়ে ছোকরা আমাকে একটি গেটের সামনে নিয়ে গেলেন। কিন্তু গেট তালাবদ্ধ। ব্যাটা কাকে কাকে যেন ফোন করলেন। হিন্দিতে কথা। বুঝতে পারি না সবটা। কিন্তু এটুকু বুঝলাম, কেউ একজন চাবি নিয়ে আসবেন। তারপর আমাদের ঢুকতে হবে অন্দরে।
অন্তত ১৫ মিনিট দাঁড়িয়ে থাকতে হলো গেটের সামনে। ছোকরা আমাকে পাশে রাখা সোফায় বসতে অনুরোধ করলেন। বসলাম না। টেনশন হচ্ছে। কী থাকতে পারে আমার লাগেজে?
একপর্যায়ে ভিন্ন চিন্তা মাথায় ঢুকলো। তবে কি আমার টিকেট কনফার্ম হয়নি? প্লেনে না উঠিয়ে লাগেজ হাতে ধরিয়ে কি বিদায় করবে? এমন চিন্তার কারণও আছে খানিকটা।

শেষ দিনে গেছি হুসেন সাগরে। যমজ শহর হায়দরাবাদ-সেকেন্দারাবাদ। এক পাশে হায়দরাবাদ, অন্যপাশে সেকেন্দারাবাদ। মাঝখানে হুসেন সাগর। ১৫৬২ সালে হুসেন শাহ ওয়ালী সুবিশাল এই হ্রদটি খনন করিয়েছিলেন। সেকালে প্রজাদের সুপেয় পানির অভাব পূরণ করতে এই লেক বিশাল ভূমিকা পালন করতো।
হায়দরাবাদে আসা পর্যটকরা দেখতে যান হুসেন সাগর। পর্যটকদের আরো আকৃষ্ট করতে ১৯৯২ সালে হ্রদের মধ্যে স্থাপন করা হয় অতিকায় এক মূর্তি। ৬০ ফুট উঁচু বুদ্ধমূর্তি। অন্তত দুটি ঘাট আছে হ্রদের ধারে। সেখান থেকে বোটে করে যেতে হয় শাক্যমুনির মূর্তির পাদদেশে।
ট্যাক্সি ড্রাইভার আমাকে যে গেটে নামিয়েছেন, সেখানে তখনো বোট ছাড়ার সময় হয়নি। হ্রদের পাশে গাছের ছায়ায় পেতে রাখা বেঞ্চিতে বসে আছি। মৃদুমন্দ বাতাস ছুঁয়ে যাচ্ছে শরীরে। কিছু সময় পর টিকেট কাউন্টার থেকে জানানো হলো, এই বোটের অপেক্ষা না করে আমি যেন কিছুটা দূরে অন্য ঘাটে যাই। এটির নাম লুম্বিনী পার্ক। দূরত্ব দেড় কিলোমিটার মতো হবে। হাঁটা শুরু করলাম হ্রদের গাঁ ধরে। সারি সারি বেঞ্চ পাতা। তরুণ-তরুণীদের প্রেমালাপের মোক্ষম জায়গা। বহু জুটিকে ঘনিষ্ঠভাবে অবস্থান করতে দেখলাম। তবে বৈশিষ্ট্য হলো, জুটিগুলো বেশ শালীন। কোনো কোনো তরুণী তো হিজাব বা বোরখা পরা। ড. আসাদউদ্দিন ওয়াইসির মতো ভারতের প্রখ্যাত মুসলিম নেতার এই শহরের এমন দৃশ্য দেখছি কয়েকদিন ধরে।
শুষ্ক মওসুম। হ্রদের পানি কম। তবু লাইফ জ্যাকেট পরা বাধ্যতামূলক। অল্পসময়েই বোট ভিড়লো বুদ্ধর পাদদেশে। সেখানে অবস্থানের সময় মাত্র পাঁচ মিনিট। অবশ্য দর্শনার্থীরা ছবি তুলতেই কাটিয়ে দেন ৮-১০ মিনিট।
ছবি আমিও তুলেছি। কিন্তু আমার মাথায় এসেছে অন্য কিছু- এতো জায়গা থাকতে এই হ্রদের মধ্যে বুদ্ধমূর্তি স্থাপন করতে হবে কেন? এটি কি স্রেফ পর্যটক আকর্ষণের ধান্ধা, নাকি এর মধ্যে রয়েছে অন্য কোনো রাজনীতি?
দ্বিতীয় সম্ভাবনাটিই আমার কাছে যৌক্তিক মনে হলো। কোনো সহি প্রমাণ নেই। তবে কেন জানি মনে হতে লাগলো, মুসলিম নৃপতির কীর্তি ম্লান করতে কৌশলে এই কাজটি করা হয়েছে। কোনো হিন্দু দেবতার মূর্তি স্থাপন করলে বিতর্ক হতো। বুদ্ধের মূর্তি সেই বিতর্ক সৃষ্টি করেনি। হুসেন শাহ ওয়ালির কীর্তির চেয়ে এই মূর্তিই এখন প্রধান আকর্ষণ করা গেছে। হায়দরাবাদের নানা প্রকাশনায় এখন হুসেন সাগরে স্থাপিত বুদ্ধমূর্তি দেখা যায়। যদিও রাস্তাঘাটে কোনো গেরুয়াধারী মুণ্ডিতমস্তক সন্ন্যাসী চোখে পড়েনি এই ক’দিনে।
রাজনৈতিক কুশীলবের চেয়ে কূটবুদ্ধির প্রাণি বোধহয় দুনিয়াতে নেই।
বুদ্ধমূর্তিসমেত হুসেন সাগর দর্শনশেষে ল্যান্ডিংস্টেশনে ফেরত। এর পরের আকর্ষণ লেজার শো। জানলাম, শো শুরু হয় প্রতিদিন রাত সাড়ে সাতটায়। ডিউরেশন এক ঘণ্টা। দিনে একবারই। অর্থাৎ লেজার শো দেখতে হলে সাড়ে আটটা বাজবে। দেখা উচিত কি-না ভাবছিলাম। শেষে মনে হলো এটা বাদ দেওয়াই উত্তম। ওর চে’ বরং হোটেলে ফিরে জিনিসপত্র গুছিয়ে নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।
হোটেলে ফিরতে রাত সাড়ে আটটা। সবার আগে চোখ বুলালাম ফিরতি টিকেটে। কিন্তু একী! আমার টিকেট তো ‘বুকড’! ‘কনফার্ম’ না।
ঘাবড়ে গেলাম। যদি টিকেট কনফার্ম না হয়ে থাকে, তাহলে আমার উপায় কী হবে? পকেটে টাকাও তো শেষ হয়ে আসছে। বাংলাদেশি মুদ্রা আছে। কিন্তু তা কোথাও এক্সচেঞ্জ করার উপায় নেই। এমনকী এয়ারপোর্টেও।
যোগাযোগ করলাম হায়দরাবাদে অবস্থানরত অজয়ের সাথে। অজয় তখন হুসেন সাগরে। অনুরোধ করলাম যেন হিন্দিতে কথা বলে বিষয়টা স্পাইসজেট কর্তৃপক্ষকে জানায়। আশ্বস্ত হতে পারছিলাম না। আমাদের মধ্যে সবচে’ ভালো হিন্দি বলে মনসুর। যশোরে ওর সাথে যোগাযোগ করে সমস্যার কথা বললাম। ও আবার বললো রাজুকে। সবাই মিলে চেষ্টা করতে লাগলাম, টিকেট কনফার্ম কি-না তা বোঝার। এরই মধ্যে এয়ারলাইন্স কর্তৃপক্ষকে ই-মেইলও করলাম। দ্রুতই ফিরতি মেইল পেলাম। কিন্তু হায়! ফিরতি মেইলে যা বলা হয়েছে, তার সারকথা হলো, ‘তোমার সমস্যাটি গোচরে আনা হয়েছে। ৭২ ঘণ্টার মধ্যে সমাধান পাবে।’
আমার প্লেন ছাড়বে আট ঘণ্টা পর, পাঁচ ঘণ্টার মধ্যে হাজির হতে হবে এয়ারপোর্টে, আর ওরা আমাকে সমাধান দেবে তিন দিনের মধ্যে (যদিও ওদের কনফার্মেশন মেইল পেয়েছি সাড়ে পাঁচ দিনের মাথায়)! রাগে চুল ছিড়তে ইচ্ছা করছিল।

ছোকরার সঙ্গে বেইজমেন্টের তালাবদ্ধ গেটের সামনে দাঁড়িয়ে ভাবছিলাম, হয়তো আমার টিকেট কনফার্ম হয়নি। এবার হাতে লাগেজ ধরিয়ে বিদায় করবে।
প্রায় ১৫ মিনিট পর গলায় কার্ড ঝুলানো এক তরুণী ফোন কানে নিয়ে হেলতে-দুলতে গেটের দিকে এগিয়ে এলেন। তালা খুললে আমরা ঢুকলাম ভেতরে। খানিকটা এগিয়ে প্রহরীর মুখোমুখি। তল্লাশি হলো। স্ক্যানও হলো দু’জনের শরীর। ছোট একটি রুমে ঢুকে যে ব্যক্তির সামনে আমাকে বসতে বলা হলো, তিনি মাঝবয়সী। সটান বললেন, ‘য়্যু হ্যাভ আ লাইটার ইন ইওর লাগেজ’।
মুহূর্তেই গোটা বিষয় পরিষ্কার হয়ে গেল। শরীর থেকে যেন ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়লো। পকেট থেকে ছোট্ট চাবিটা বের করে বললাম, ‘ইয়েস। ইউ মে ওপেন দ্য লাগেজ।’
-নো। ইউ হ্যাভ টু ওপেন।

ভদ্রলোকের হাতে লাইটারটি দিয়ে ছোকরা কর্মীর সাথে একই পথ ধরে হাঁটতে লাগলাম। ওকে বললাম, লাইটারটি তো নিরীহ বস্তু। লাগেজের মধ্যে পড়ে আছে। এইটা বের করা কি খুব জরুরি ছিল?
তরুণের ভাষ্য, নিশ্চয়। লাইটারের মধ্যে ফুয়েল আছে। চাপ বা অন্য কোনো কারণে আগুন ধরে যেতে পারে। সেই কারণে ওটা বের করা জরুরি।
আশ্চর্য। এই সাধারণ বিষয়টি আমার মাথায় আসেনি!
ধন্যবাদ জানিয়ে ছোকরা বিদায় নিলেন। তখন মনে শুধু মনীষীবচন- ‘ভ্রমণে জ্ঞান বাড়ে।’ শুধু দর্শনীয় স্থান ঘুরলেই যে জ্ঞান বাড়বে, ব্যাপারটি আসলে তা না। এমন ছোট-খাটো বিষয় থেকেও শেখার আছে অনেককিছু। নেতাজী সুভাষচন্দ্র বোস ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টে (দমদম, কলকাতা) কেন অজয়-শাহজালালকে ফেলে প্লেন উড়াল দেয়- তাও এক বিরাট শিক্ষা।

[লেখক : সম্পাদক, সুবর্ণভূমি। সেক্রেটারি, প্রেসক্লাব যশোর।]