ইমেজ পুনরুদ্ধারের কাউন্সিল

আপডেট: 10:20:14 22/11/2019



img

কাজী মোবারক হোসেন : ক্যাসিনোকাণ্ডে সমালোচনার ঝড় পেরিয়ে ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারের চ্যালেঞ্জ নিয়ে সপ্তম জাতীয় কংগ্রেসে মিলিত হচ্ছে বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগ।
সাবেক ও বর্তমান নেতাদের আশা, সম্মেলনে নেতৃত্ব পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে সকল বিতর্ক পিছনে ফেলে আবার ঐতিহ্যের ধারায় ফিরতে পারবে  বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হাতে গড়া এ যুব সংগঠন।
শনিবার বেলা ১১টায়  রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সম্মেলনের প্রথম অধিবেশন উদ্বোধন করবেন যুবলীগের সাংগঠনিক নেত্রী আওয়ামী লীগ সভানেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
বিকেল তিনটায় কাউন্সিল অধিবেশন শুরু হবে রমনার ইঞ্জিনিয়ার্স ইন্সটিটিউট মিলনায়তনে। কাউন্সিল অধিবেশনের প্রধান অতিথি হিসেবে থাকবেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় অনুযায়ী সেখানেই নতুন নেতৃত্ব ঘোষণা করবেন ওবায়দুল কাদের।
সাম্প্রতিক সময়ে ‘অনিয়ম, দুর্নীতি আর দুর্বৃত্তদের আশ্রয়-প্রশ্রয়ের কেন্দ্র’ হয়ে ওঠার অভিযোগে বিদ্ধ এ সংগঠনকে নতুন করে জাগাতে নেতৃত্বের ভার পাচ্ছেন কারা?
৫৫ বছরের বয়সসীমা বেঁধে দেওয়ায় সর্বশেষ কমিটির অধিকাংশ নেতার সামনে নতুন কমিটিতে আসার সুযোগ থাকছে না। সংগঠনের ভেতরে যাদের নাম আলোচনায় রয়েছে, তাদের কেউ সামনে আসতে চাইছেন না কেউ। ফলে কোনো আলোচনাই ততটা জোর পাচ্ছে না।
সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে যুবলীগের জাতীয় কংগ্রেস সামনে রেখে রাজধানীর মৎস্য ভবন মোড় এলাকা ছেয়ে গেছে পোস্টার, ব্যানার ও ফেস্টুনে।
আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ নেতারা বলছেন, যুবলীগের চেয়ারম্যান, সাধারণ সম্পাদক বা অন্য কোনো পদে বিতর্কিতদের স্থান হবে না। ‘পরিচ্ছন্ন’ ভাবমূর্তির ও ভবিষতে স্বচ্ছতা ধরে রাখতে সক্ষম হবেন এমন কাউকেই দায়িত্ব দেওয়া হবে। আর দলের নেত্রী শেখ হাসিনাই শেষ কথা বলবেন।
যুবলীগের সাবেক চেয়ারম্যান আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির নানক বলেন, “যুবলীগ সকল আন্দোলন সংগ্রামে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে। পঁচাত্তরে বঙ্গবন্ধু হত্যার পরে চট্রগ্রামে মৌলভী সৈয়দ, বগুড়ার খসরু জীবন দিয়েছে, নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে নূর হোসেন জীবন দিয়েছে। ১/১১-এর সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারবিরোধী আন্দোলনে আমরা ভূমিকা রেখেছি।
“অথচ আজকে যুবলীগ ভিন্ন ধারায় প্রবাহিত হচ্ছিল, যুবলীগ নিয়ে রাষ্ট্রে নানা অসঙ্গতি প্রকাশ পেয়েছে, যার ফলশ্রুতিতে এবারের সম্মেলন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা এবারের সম্মেলনের মাধ্যমে পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির ও ভবিষতে স্বচ্ছতা ধরে রাখতে সক্ষম হবেন এমন কাউকেই যুবলীগের নেতৃত্ব তুলে দেবেন। নতুন নেতৃত্বে যুবলীগ সুনামের ধারায় ফিরবে বলেই আমরা আশা করছি।”
চাঁদাবাজি, দুর্নীতি কিংবা সন্ত্রাসের সঙ্গে জড়িতদের বাদ দিয়ে সৎ ও যোগ্যদের নিয়ে এবারের কমিটি হবে বলে আশা প্রকাশ করেন যুবলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মঞ্জুরুল আলম শাহীন।
তিনি বলেন, “যুবলীগ এখন ইমেজ সঙ্কটে ভুগছে। সন্ত্রাস চাঁদাবাজ দুর্নীতিবাজ কাউকে জননেত্রী শেখ হাসিনা রাখবেন না। দুর্নীতির সঙ্গে যুক্তদের যুবসমাজ চায় না। আমরা চাই, যাদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ নেই, এমন ব্যক্তিদের হাতে নেতৃত্ব আসুক। যুবলীগের যে ইমেজ সঙ্কট হয়েছে, তা থেকে ফিরে আসবে।”
কাদের হাতে নেতৃত্ব দিলে এ সমস্যার সামাধান হবে বলে মনে করছেন শাহীন?
তিনি বলেন, “ছাত্রলীগের ব্যাকগ্রাউন্ড আছে এরাই আগামী দিনে নেতৃত্বে আসুক, সেটা আমরা চাই। যারা সততার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছে, যাদের বিরুদ্ধে মাদক, সন্ত্রাস, দুর্নীতির অভিযোগ নেই।”
স্বাধীনতার পরপরই ১৯৭২ সালের ১১ নভেম্বর যুবকদের সংগঠিত করার লক্ষ্য নিয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশে যুবলীগ গঠন করেন তার ভাগ্নে মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক শেখ ফজলুল হক মনি। ১৯৭৪ সালে যুবলীগের প্রথম কংগ্রেসে তিনিই চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন।
সর্বশেষ ২০১২ সালে ষষ্ঠ কংগ্রেসে চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পান শেখ মনি ও শেখ সেলিমের ভগ্নিপতি ওমর ফারুক। তারপর ছয় বছর নির্বিঘ্নে কাজ করে এলেও সম্প্রতি ক্যাসিনোকাণ্ডে বড় ধাক্কা খান ওমর ফারুক; সেই সঙ্গে সমালোচনায় নাকাল হয় যুবলীগ।
যুবলীগ নেতাদের কর্মকাণ্ড নিয়ে শেখ হাসিনা বিরক্তি প্রকাশ করলে ঢাকার ক্রীড়া ক্লাবগুলোতে অভিযান শুরু করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। গত সেপ্টেম্বরে ওই অভিযানে অবৈধ ক্যাসিনো ব্যবসায় যুবলীগ নেতাদের জড়িত থাকার তথ্য বেরিয়ে আসে।
র‌্যাবের অভিযান শুরুর পর ঢাকা মহানগর যুবলীগের শীর্ষ নেতা ইসমাইল চৌধুরী সম্রাটের পক্ষে দাঁড়িয়ে সমালোচনায় পড়েন ওমর ফারুক। পরে সম্রাট গ্রেফতার হলে চুপ মেরে যান তিনি। তারপর থেকেই যুবলীগের কার্যক্রমে তাকে আর দেখা যায়নি।
গণভবনে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে যুবলীগের সর্বশেষ বৈঠকেও ছিলেন না যুবলীগ চেয়ারম্যান। গত ২১ অক্টোবর ওই বৈঠক শেষে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের জানান, ওমর ফারুককে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। যুবলীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য চয়ন ইসলামকে আহ্বায়ক এবং সাধারণ সম্পাদক হারুনুর রশীদকে সদস্যসচিব করে সম্মেলন প্রস্তুতি কমিটি করা হয়েছে। যুবলীগের কার্যনির্বাহী কমিটির সবাইকে এই কমিটির সদস্য করা হয়েছে।
কাদের সেদিন বলেন, “এবারের সম্মেলনে বিতর্কিত কেউ থাকছে না। কোনো ধরনের অন্যায়ের সঙ্গে জড়িতরা কমিটিতে আসতে পারবে না।”
বরাবর কংগ্রেস ঘিরে যুবলীগে ব্যাপক প্রাণচাঞ্চল্য দেখা গেলেও এবারের পরিস্থিতি তেমন নয়। ‘শুদ্ধি অভিযানের’ মুখে অনেকে গা ঢাকা দিয়েছেন। বাকিরাও মুখ খুলছেন না।
সক্রিয় যুবলীগ নেতাদের বাইরে আর যাদের নাম শোনা যাচ্ছে নতুন কমিটির জন্য, তাদের কেউ আগ বাড়িয়ে আগ্রহের কথা প্রকাশ করছেন না।
পদপ্রত্যাশীদের অনেকে বঙ্গবন্ধু এভিনিউ ও ধানমণ্ডিতে দলীয় কার্যালয়ে যাওয়া-আসা করলেও, আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ালেও তা কতটা কাজে আসবে, সে বিষয়ে নিশ্চিত নন যুবলীগের নেতারা।
তারা বলছেন, এবার নেতৃত্ব নির্বাচনের প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ ভিন্ন। বিভিন্ন জেলা ও সাংগঠনিক শাখা থেকে দুই হাজারের বেশি প্রতিনিধি কংগ্রেসে থাকবেন। সবাই তাকিয়ে থাকবেন শেখ হাসিনার দিকে।
যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক হারুনুর রশীদ বলেন, প্রতিষ্ঠার পর থেকে যুবলীগের কংগ্রেসে কখনো ভোট হয়নি। সাধারণত কংগ্রেসের দ্বিতীয় অধিবেশনে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা নতুন নেতাদের নাম ঠিক করে দেন।
“এখানে কেউ প্রার্থী হন না। অনেকে আলোচনায় থাকার চেষ্টা করেন বা নেতাদের কাছে নিজেকে তুলে ধরেন।”
আগের মতো নেতাদের দৌড়ঝাঁপ দেখা না যাওয়ায় এবার কর্মীরাও আভাস পাচ্ছেন না, কে হতে পারেন যুবলীগের চেয়ারম্যান। যুবলীগে যুক্ত নন, এমন কারো হাতে শেখ হাসিনা দায়িত্ব দিতে পারেন বলেও আলোচনা রয়েছে।
যুবলীগের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান শেখ মনির ছেলে ফজলে শামস পরশ, শেখ সেলিমের ছেলে এফবিসিসিআই সভাপতি শেখ ফজলে ফাহিমের নামও আসছে ঘুরে ফিরে।
তারা সবাই বঙ্গবন্ধু পরিবারের সদস্য। কমিটিতে শেখ সেলিমের প্রভাব বলয় এবারো থাকবে, না ভেঙে যাবে, সেদিকেও কৌতূহলী দৃষ্টি যুবলীগকর্মীদের।
সাংবাদিকদের প্রশ্নে শুক্রবার আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরও বলেন, “যদি যুবলীগের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান শহীদ শেখ ফজলুল হক মনির রক্তের উত্তরাধিকারকে কাউকে এখানে চায় পরবর্তী নেতা হিসেবে, সেটা অবশ্যই যুবলীগের অধিকার আছে।”
শীর্ষ পদে আলোচনায় আছেন যুবলীগের বর্তমানে সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য আতাউর রহমান আতা, বেলাল হোসেনও। আর সাধারণ সম্পাদক পদে বর্তমান কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মহিউদ্দিন আহমেদ মহি, মঞ্জুরুল আলম শাহীন, সুব্রত পাল, সাংগঠনিক সম্পাদক মোহাম্মদ বদিউল আলম, প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক ইকবাল মাহমুদ বাবলু, কেন্দ্রীয় সদস্য এনআই আহমেদ সৈকতের কথা আসছে কর্মীদের আলোচনায়।
যুবলীগের রাজনীতিতে সরাসরি সম্পৃক্ত না থাকলেও সংগঠনের ইমেজ ফেরাতে ছাত্রলীগের সাবেক নেতাদের মধ্য থেকে কাউকে যুবলীগের দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে- এমন কথাও বলছেন অনেকে।
তবে যুবলীগের এক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “অনেক নামই এখন শুনবেন আপনারা; তবে কে কী হচ্ছে, তা শেখ হাসিনা ছাড়া আর কেউ জানে না।”
সম্মেলনের সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে জানিয়ে যুবলীগের সপ্তম কংগ্রেসের সদস্যসচিব হারুন অর রশিদ বলেন, “সম্মেলনকে সফল করতে আমরা কয়েকটি উপ কমিটি করেছি। সারা দেশ থেকে ২২শ কাউন্সিলর আসবেন। আমরা প্রস্তুত।”
সূত্র : বিডিনিউজ

আরও পড়ুন