এনজিওর মাধ্যমে স্থাপিত পাম্প অচল, বিপাকে চাষি

আপডেট: 10:06:39 26/10/2019



img
img

বিশেষ প্রতিনিধি, ঝিনাইদহ : কৃষকরা অল্প খরচে ফসলের ক্ষেতে পানি পাবেন, চাষ করে লাভবান হবেন- এই লক্ষ্যে এনজিও-কে দিয়ে কোটি কোটি টাকা খরচে ঝিনাইদহের বিভিন্ন মাঠে সোলার পাম্পচালিত গভীর নলকূপ স্থাপন করা হয়েছে। কিন্তু বছর যেতে না যেতেই সেই পাম্পগুলো নষ্ট হতে শুরু করেছে। এ বছর ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার হরদেবপুর গ্রামের মাঠে স্থাপিত চারটি পাম্প নষ্ট থাকায় শতাধিক কৃষক প্রায় ৫০০ বিঘা জমিতে ধানের চাষ করতে পারেননি। পড়ে আছে জমি।
অবশ্য কৃষকরা বলছেন, তিনটি প্রতিষ্ঠানের যৌথ উদ্যোগে এই পাম্পগুলো স্থাপন করা হয়। ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট লিমিটেড (ইডকল), অ্যানার্জিপ্যাক ইলেকট্রনিক্স লিমিটেড ও এইড ফাউন্ডেশন এই পাম্পগুলো স্থাপন করে। কিন্তু পাম্পগুলো একবছর ভালোভাবে চলার পর নষ্ট হয়ে গেছে। কালীগঞ্জ উপজেলার হরদেবপুর গ্রামের পাঁচটি পাম্প নষ্ট হয়ে যায়। যার মধ্যে একটি সারাই করা হলেও বাকিগুলো আজো নষ্ট অবস্থায় পড়ে আছে।
হরদেবপুর গ্রামের বাসিন্দা উদয়শংকর বিশ^াস জানান, ২০১৫ সালের আগে তারা গ্রামের গড়ার বিলে নানা ফসলের চাষ করতেন। কৃষকরা তেমন লাভবান না হলেও ক্ষতির মধ্যে পড়েননি। এরপর ওই বছরের জানুয়ারি মাসে তাদের মাঠে সোলার পাম্পচালিত গভীর নলকূপ স্থাপনের জন্য উদ্যোগ নেয় এইড ফাউন্ডেশন নামে ঝিনাইদহের একটি এনজিও। তারা গ্রামে গিয়ে কৃষকদের সঙ্গে আলোচনা করেন। কৃষকদের জানানো হয়, অল্প পয়সায় তারা জমিতে সেচ পাবেন। বছরের সব সময় পানি পাওয়া যাবে। বিদ্যুতের জন্য অপেক্ষা করতে হবে না। এই সব কথায় কৃষকরা উদ্বুদ্ধ হন। তারা অল্প টাকায় জমি দেন।
উদয়শংকর বিশ্বাস জানান, তাদের গ্রামের গড়ার বিলে চাষযোগ্য প্রায় ৬০০ বিঘা জমি আছে। এখানে ২০১৫ সালে পাঁচটি সোলার পাম্প স্থাপন করা হয়। কৃষকদের সঙ্গে চুক্তি থাকে বোরো মৌসুমে ধানের জমিতে বিঘা প্রতি তিন হাজার ৬০০ টাকা তারা এইড ফাউন্ডেশনকে পরিশোধ করবেন। অন্য মৌসুমে আরো কম লাগবে। শ্যালো মেশিন ব্যবহার করে জমিতে সেচ দিতে কৃষকদের খরচ হতো বোরো মৌসুমে বিঘা প্রতি প্রায় ছয় হাজার টাকা। এভাবে চুক্তির মাধ্যমে ২০১৬ সালের বোরো মৌসুম থেকে তারা পানি কিনতে শুরু করেন। প্রথম বছর ভালোভাবে পাম্পগুলো চলেছে। কৃষকরাও লাভবান হয়েছেন। কিন্তু ২০১৭ সাল থেকে পাম্প নষ্ট হতে শুরু করে। পর্যায়ক্রমে তাদের গ্রামের পাঁচটি পাম্পই নষ্ট হয়ে যায়। কৃষকরা পড়ে যান বিপাকে। বিভিন্ন চাষ থেকে ধানচাষে ফিরে এসে এখন পানির অভাবে ফসল ফলাতে না পেরে তারা মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হন। বর্তমানে ওই মাঠে প্রায় ৫০০ বিঘা জমি পড়ে আছে।
কৃষক উদয়শংকর আরো জানান, এই অবস্থায় তারা এইড ফাউন্ডেশনের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তারা দাবি করেন, পাম্পগুলো চালুর ব্যবস্থা করতে। কিন্তু এইচ ফাউন্ডেশন সংশ্লিষ্ট আরেক প্রতিষ্ঠান অ্যানার্জিপ্যাক ইলেকট্রনিক্স লিমিটেডকে দায়ী করে। তারা জানিয়ে দেয়, মেরামতের দায়িত্ব অ্যানার্জিপ্যাকের। কারণ পাম্প স্থাপনে ওই প্রতিষ্ঠান মালামাল সরবরাহ করেছে। তাদের লোকজন পাম্প স্থাপনও করেছেন।
অন্যদিকে, অ্যানার্জিপ্যাকের কর্মকর্তারা অভিযোগ করেন, এইড ফাউন্ডেশন তাদের ঠিকঠাক বিল পরিশোধ করেনি। যে কারণে তারা নতুন করে কোনো কিছু করতে পারছেন না।
এ বিষয়ে এইড ফাউন্ডেশনের এই প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্বে থাকা উপ-পরিচালক মো. আশাবুল হক জানান, ঝিনাইদহ সদর, কোটচাঁদপুর, হরিণাকুণ্ডু, শৈলকুপা ও কালীগঞ্জে ৪২টি সোলার পাম্প স্থাপন করেন তারা। ২০১৫ সাল থেকে এই পাম্পগুলো স্থাপন করা হয়। এর মধ্যে সদর উপজেলায় ২৫টি, কালীগঞ্জ উপজেলায় আটটি, হরিনাকুণ্ডুতে চারটি, কোটচাঁদপুরে চারটি এবং শৈলকুপা উপজেলায় একটি পাম্প স্থাপন করা হয়। এগুলো স্থাপনে বাজেট ছিল প্রায় ১৭ কোটি টাকা। সোলার পাম্পের মাধ্যমে প্রতিটিতে কমপক্ষে ৮০ বিঘা জমি চাষ করা সম্ভব। হিসেব অনুযায়ী তিন হাজার ৩৬০ বিঘা জমি চাষ করা সম্ভব হওয়ার কথা এই পাম্পগুলো দিয়ে।
তিনি আরো জানান, ২০১৭ সাল থেকে এই পাম্পগুলোর কিছু কিছু নষ্ট হতে শুরু করে। বিভিন্ন স্থানে ১২টি পাম্প নষ্ট হয়। যার মধ্যে কালীগঞ্জ উপজেলার হরদেবপুর গ্রামের পাঁচটি পাম্পও রয়েছে।
আশাবুল হক জানান, ইতিমধ্যে অন্য কোম্পানি থেকে মালামাল কিনে পাম্পগুলো সচল করা হয়েছে। কিন্তু হরদেবপুর গ্রামে অ্যানার্জিপ্যাক ইলেকট্রনিক্স লিমিটেডের স্থাপন করা পাঁচটি পাম্প মেরামত করা সম্ভব হচ্ছিল না। অবশ্য ইতিমধ্যে তারা একটি সচল করে দিয়েছেন, বাকিগুলো করেননি।
তিনি আরো বলেন, ইডকল থেকে অর্থপ্রাপ্তিসাপেক্ষে তারা অ্যানার্জিপ্যাক ইলেকট্রনিক্স লিমিটেডের বিল পরিশোধ করবেন। যে কারণে তাদের দেড় কোটি টাকার মতো বকেয়া রয়েছে।
‘আমরা দাবি করেছিলাম, কৃষকের স্বার্থে পাম্পগুলো চালু করার ব্যবস্থা করতে। কিন্তু তারা করছেন না। যে কারণে এলাকার কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন,’ বলেন আশাবুল।
অ্যানার্জিপ্যাক ইলেকট্রনিক্স লিমিটেডের সিইও মো. আক্তারুজ্জামান জানান, এইড ফাউন্ডেশনের কাছে তারা এখনো দুই কোটির অধিক টাকা পাবেন। এই টাকা পরিশোধ না করলে তারা নতুন করে প্রকল্পে ব্যয় করতে পারছেন না। তারপরও কৃষকের কথা চিন্তা করে তারা একটি সচল করে দিয়েছেন।
ওই কর্মকর্তার ভাষায়, ‘পাওনা পরিশোধ করলে অবশ্যই প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হতো। কৃষকরা উপকৃত হতো।’

আরও পড়ুন