এমন পুলিশই তো চাই

আপডেট: 10:00:04 15/05/2020



img

আহসান কবীর

উৎসব ভাতার টাকা দিয়ে ছিন্নমূল মানুষদের ইফতার করানো হয়েছে। আয়োজন সামান্য। মাত্র চার ব্যক্তি একসঙ্গে মিলে এই কাজটি করেছেন। তারা যশোরের পুলিশকর্মী। চাকরিগত স্ট্যাটাস প্রান্তিক পর্যায়ে। সচরাচর যাদের খবর গণমাধ্যমে আসে, তেমন পদমর্যাদার অধিকারী নন।
দেশে প্রতিদিন বড় বড় ঘটনা ঘটে। সেসব নিয়ে খবর প্রকাশিত হয় গণমাধ্যমে। সেই তুলনায় এই খবরটি নিতান্তই ছোট। দৃশ্যত তাৎপর্যহীন এই খবরটি মূলধারার কোনো গণমাধ্যমে আসবে না, তাও আমি নিশ্চিত।
কিন্তু এই ছোট্ট খবরটি আমাকে ভীষণ আলোড়িত করেছে।
বাংলাদেশে পুলিশের প্রতি সাধারণ মানুষের মনোভাবের কথা সবাই জানে। বিশদ ব্যাখ্যার দরকার নেই। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের জরিপে বছরের পর বছর এই বাহিনী দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। তাদের আরো নানা অপকর্মের ফিরিস্তিও মানুষের মুখে মুখে। এই বাহিনীর সদস্যরা ভালো কোনো কাজ করেন না, তা কিন্তু না। তবে খারাপ কাজের আধিক্যে তা ঢাকা পড়ে যায়। বাংলাদেশের বাস্তবতায় পুলিশ শব্দটির সঙ্গে এক ধরনের ভয়, আতঙ্ক, জনঅসন্তোষ যেন অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত।
অথচ স্বাধীন দেশের পুলিশ বাহিনীর তো এমন হওয়ার কথা ছিল না। এই তো সেদিন একজন সংবাদকর্মীকে পুলিশ সীমান্ত এলাকা থেকে যশোরের আদালতে আনলো পিছমোড়া করে; যা অনেকের মতো আমাকেও কষ্ট দিয়েছে। আইনে যা-ই থাক না কেন, পুলিশ ওই সাংবাদিকের সাথে এমনটি না করলেও পারতো। এই ঘটনা পুলিশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করেনি। তবে আমি এটাও বুঝি, জেলা পর্যায়ের পুলিশকে চলতে হয় ‘ওপরের ইশারা’ অনুযায়ী।
একথা সর্বজনবিদিত যে, বাঙালি জাতির ইতিহাসে মুক্তিযুদ্ধ হলো সবচেয়ে বড় ও গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। মুক্তিযুদ্ধে পুলিশ বাহিনীর সদস্যদের আত্মত্যাগ ও বীরত্ব স্বমহিমায় উজ্জ্বল। নানা সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও বিভিন্ন সময় প্রাকৃতিক দুর্যোগকালে এই বাহিনী জনগণের পাশে দাঁড়িয়েছে সমস্ত শক্তি দিয়ে।
আমি যশোর শহরের স্থায়ী বাসিন্দা। জন্মও হয়েছে এখানে। ফলে এখানে কর্মরত পুলিশ সদস্যদের নানা কার্যক্রম অন্যদের মতো আমারও দেখার-বোঝার খানিকটা সুযোগ হয়েছে। আর গণমাধ্যমকর্মী হিসেবে দেশের অন্যান্য বিষয়ের মতো পুলিশের কার্যক্রমও জানি সহকর্মীদের মতোই।
ব্যক্তিজীবনে আমি পুলিশের দ্বারা কখনো বড় ধরনের ক্ষতির শিকার হয়েছি, তা নয়। ছাত্ররাজনীতিতে সম্পৃক্ত থাকাকালে কয়েকবার পুলিশের ঠ্যাঙানি খেয়েছি- এই যা। কখনো যেহেতু ক্ষমতাশালীদের দলে ভিড়িনি, তাই এটুকু হয়তো প্রাপ্যই ছিল।
এর বাইরে বছর দুয়েক আগে একবার বড় ধরনের হেনস্তার শিকার হতে হতে বেঁচে গেছি। তখন যিনি জেলা পুলিশের কর্তা ছিলেন, তাকে নিয়ে ভয়ঙ্কর সব নেতিবাচক কথাবার্তা বাজারে চালু ছিল। লোকে বলে, ওই পুলিশ কর্তা অনিয়ম, দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহারের যে নজির সৃষ্টি করেন, যশোরের ইতিহাসে তেমনটি আর কখনো ঘটেনি। যদিও এইসব অভিযোগ প্রমাণ করা কঠিনই বটে। তো যাই হোক, ওই ঘটনার পর পুলিশের প্রতি আমার বিতৃষ্ণা বহুগুণ বেড়ে যায়।
ওই পুলিশ কর্তা বিদায় হওয়ার পর এখানকার অবস্থা রাতারাতিই পাল্টে যায়। পুলিশের প্রতি ‘গণঅনাস্থা’ ক্রমেই দূরীভূত হতে থাকে। এখন যশোর পুলিশের যিনি কর্ণধার, তার সম্বন্ধে আমার ব্যক্তিগত রিডিং নেই। তবে দেখে-শুনে যা মনে হয়, তিনি বেশ ‘মানবিক গুণসমৃদ্ধ’।
একসময় রাজনীতিতে সক্রিয় থাকায় সমাজ, রাজনীতি, অর্থনীতি, ইতিহাস-ঐতিহ্য সম্বন্ধে জানা-বোঝার চেষ্টা করেছি। কর্মজীবনে এসেও তা ইচ্ছায়-অনিচ্ছায় ধরে রাখতে হয়েছে। ব্যক্তিগতভাবে আমার বোধ হলো, পুলিশ তখনই শত অপকর্মে জড়িয়ে পড়ে, যখন তাদের রাজনৈতিকভাবে ব্যবহারের চেষ্টা করা হয়। কুর্সিতে বসতে যদি পুলিশকে ব্যবহার করতে হয়, তাহলে সেই বাহিনীকে দিয়ে সুকর্ম করানো কঠিন হওয়াটাই স্বাভাবিক। যেখানে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে পুলিশকে ব্যবহার করা হয় না, সেখানকার বাহিনী অনেক বেশি স্বচ্ছতা, যোগ্যতার সাথে কাজ করতে পারে।
বর্তমানে বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বে এক নজিরবিহীন অবস্থা বিরাজ করছে। দৃশ্যত দেশে সব ধরনের রাজনৈতিক তৎপরতা বন্ধ। ফলে পুলিশকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তাও নেই। মানুষ এখন ঘোরতর বিপদে। এই বিপদের সময় জনগণের পাশে প্রথম যারা এসে দাঁড়িয়েছে, পুলিশ নিঃসন্দেহে তার অগ্রভাগেই আছে। এর খেসারতও দিতে হয়েছে ও হচ্ছে বাহিনীটির সদস্যদের। এখন পর্যন্ত দেশে প্রায় দুই হাজার পুলিশসদস্য করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। মারা গেছেন অন্তত ছয়জন। পেশাজীবীদের মধ্যে স্বাস্থ্য বিভাগের পর আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যায় এটা দ্বিতীয় বৃহৎ।
যশোরেও আমরা করোনাভাইরাস বিস্তৃতির প্রথম দিন থেকে দেখেছি পুলিশ বাহিনীর তৎপরতা। প্রতিকূল এই পরিস্থিতিতে বাহিনীর সদস্যরা মাঠে রয়েছেন ভীষণ ঝুঁকি নিয়ে। মানুষ সরকারি নির্দেশনা মানতে চাইছে না। অথচ দায়িত্বরত পুলিশ জনতার ওপর চড়াও হয়েছে- এমন ঘটনা ঘটেনি বললেই চলে। তারা বরং মানুষকে বুঝিয়ে-শুনিয়ে বাড়ি ফেরাতে সচেষ্ট হয়েছেন। বুঝেছেন, মানুষের পেটে খিদে থাকলে তাকে আইন মানানো কঠিন। ক্ষুধার্ত মানুষের সাথে যেমন আচরণ সঙ্গত, আমার মনে হয় যশোর পুলিশ তেমনটিই করেছে। হয়তো দু’-এক ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম হতে পারে।
পুলিশের জেলা ইউনিট-প্রধানের তৎপরতা তো শুরুতেই দৃষ্টি কাড়ে। অনাহারি মানুষের বাড়ি পর্যন্ত গিয়ে রাতের আঁধারে খাদ্যসামগ্রী পৌঁছে দেওয়ার মতো মহতী কাজ তিনি করে চলেছেন।
গতকাল যখন চার কনস্টেবলের উৎসব ভাতার টাকায় ছিন্নমূলদের ইফতার করানোর রিপোর্টটা পড়ছিলাম, তখন এক জায়গায় গিয়ে চোখ আটকে গেল। কনস্টেবলদের একজন যা বলেছেন, তা মোটামুটি এরকম- ‘এসপি স্যারের মহতী উদ্যোগে অনুপ্রাণিত হয়ে আমরা এই কাজ করছি’। ওই পুলিশকর্মী সত্যিটাই বলেছেন বলে ধরে নিচ্ছি। কারণ একজনের ভালো কাজ আরো দশজনকে উদ্বুদ্ধ করে- এটা চিরাচরিত। আর তা যদি হয় ঊর্ধ্বতনের, তাহলে অধীনস্তদের মনে গভীরভাবে রেখাপাত করবে- এটাই স্বাভাবিক। একইভাবে দুষ্কর্মে জড়িত ওপরওয়ালার কাজ অধীনস্তদের অধঃপাতে নিয়ে যেতে পারে সহজেই।
‘পুলিশ বাহিনী জনগণের সেবক’, ‘পুলিশই জনতা, জনতাই পুলিশ’ ইত্যকার নানা গালভরা বুলি আমরা সেমিনার-আলোচনায় শুনে থাকি। মানুষ যে এই কথাগুলো কতটা হাস্যকর মনে করে, আমার ধারণা সংশ্লিষ্টরা তা ভালোমতোই জানেন। দেয়ালের লিখন তারাও তো পড়েন!
এখনকার পরিস্থিতি খুবই নাজুক। আমরা কেউই জানি না, কে বাঁচবো আর কে মরবো। পুলিশকে জনবান্ধব হয়ে ওঠার এটাই সময়। আর ঠিক এই কাজটিই এখন করছে মুক্তিযুদ্ধে আত্মদানকারীদের উত্তরসূরিরা। দুর্যোগে নিপতিত দেশবাসীর পাশে থেকে, সহায়তা দিয়ে, জীবন দিয়ে যেভাবে পুলিশ সদস্যরা কাজ করে চলেছেন- আমার জীবদ্দশায় তা আর দেখিনি (আমি মুক্তিযুদ্ধ দেখিনি)। তাদের সাহস জোগানো, অনুপ্রেরণা দেওয়া সবার নৈতিক দায়িত্ব।
শাবাশ যশোরের পুলিশ মিডিয়া সেলে কর্মরত চার কনস্টেবল (যাদের ব্যক্তিগতভাবে আমি চিনি না)। আপনারা স্যালুট পাওয়ার যোগ্য। যারা মিডিয়ার অগোচরে নিভৃতে এমন আরো ভালো ভালো কাজ করে চলেছেন, নাম না-জানা সেইসব পুলিশ সদস্যের প্রতি আমার সালাম।

লেখক : সম্পাদক, সুবর্ণভূমি; সেক্রেটারি, প্রেসক্লাব যশোর