ঐতিহ্যের স্মারক ইতনার নহবতখানা

আপডেট: 05:38:53 13/12/2020



img

রূপক মুখার্জি, লোহাগড়া (নড়াইল) : একসময় এ দেশে জমিদারি শাসন ব্যবস্থা প্রচলিত ছিল। অনেক জমিদার শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। মূলত জমিদারকে ঘিরেই আবর্তিত হতো জমিদারী শাসনব্যবস্থা। জমিদাররা এদেশে নির্মাণ করেন সুরম্য অসংখ্য অট্টালিকা। এসব কারুকার্যময় অট্টালিকার প্রধান আকর্ষণ ছিল প্রবেশদ্বারের ‘নহবতখানা’। বাদ্যযন্ত্রের সম্মিলিত সুর-ঝংকারের অন্যকম আকর্ষণ ছিল নহবতখানা। এ রকমই একটি নহবতখানা কালের সাক্ষী হয়ে আজও দাঁড়িয়ে আছে লোহাগড়ার ঐতিহ্যবাহী ইতনা গ্রামে।
এলাকার প্রবীণ মানুষজনদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, জমিদারবাড়ির বিশাল অট্টালিকার প্রবেশমুখে নহবতখানা নির্মাণ করা হতো। এটি ছিল সুউচ্চ, কাঠ দিয়ে নির্মিত। পাশাপাশি ইটের তৈরি সুরক্ষিত নহবতখানা ছিল নজর কাড়ার মতো। দৃষ্টিনন্দন ও নানা কারুকার্যখচিত নহবতখানা ঘিরে গড়ে ওঠে বাদ্যকর শ্রেণি। নহবতখানা ও বাদ্যকর ছিল একে অপরের পরিপূরক।
বাদ্যকরদের মধ্যে হিন্দু সম্প্রদায়ের পাশাপাশি মুসলমান সম্প্রদায়ের বাদ্যকররা সহশিল্পী হিসেবে বিভিন্ন উৎসব-অনুষ্ঠানে অংশ নিত। বাদ্যকরদের কাজ ছিল সকাল-সন্ধ্যা নানা বাদ্যযন্ত্রের সংমিশ্রণে রাগ-রাগিনীর সুর ঝংকারে জমিদারসহ প্রজাদের মনোরঞ্জন। বাদ্যকররা পূজা-পার্বনসহ বিভিন্ন উৎসব অনুষ্ঠানে প্রতিযোগিতামূলক সুরের লড়াইয়ে অবতীর্ণ হতো।
অট্টালিকার আশেপাশেই এসব বাদ্যকর পরিবার পরিজন নিয়ে বসবাস করতো। জমিদাররা বাদ্যকরদের বেতন ভাতাসহ সব ধরনের ব্যয়ভার বহন করতেন। এখনও এদেশের বিভিন্ন এলাকায় বাদ্যকর সম্পদায়ের অস্তিত্ব এবং উপস্থিতি দেখা যায়। আসলে, জমিদারি শাসনব্যবস্থায় গণবিনোদনের ক্ষেত্রে নহবতখানার গুরুত্ব ও অবদান স্বীকার্য।
সানাই, বাঁশি, ঢাক, ঢোল, খোল, তবলা, হারমোনিয়াম, করতাল, প্রেমজুড়ি, ম্যান্ডলিন, ক্লাইনেটসহ অন্যান্য দেশি-বিদেশি বাদ্যযন্ত্রের সমাহারে নহবতখানা মুখরিত থাকতো। যে জমিদারের ঐশ্বর্য, প্রভাব-প্রতিপত্তি বেশি ছিল, সে জমিদারের নহবতখানা ছিল বেশি জৌঁলুসপূর্ণ। তৎকালীন জমিদারি শাসনব্যবস্থায় বিনোদনের অন্যতম আধার ছিল নহবতখানা। শুধু যে জমিদাররাই নহবতখানা নির্মাণ করতো তা নয়-জমিদারদের পাশাপাশি রাজা, মহারাজা, জোতদার, গাতিদার, তালুকদারসহ ধনাঢ্য ব্যক্তিরাও এটি নির্মাণ করতেন।
জমিদারি শাসনব্যবস্থা উচ্ছেদ হওয়ার সাথে সাথে নহবতখানার অস্তিত্ব হুমকির সম্মুখীন হয়ে পড়ে। রক্ষণাবেক্ষণ ও সংস্কারের অভাবে নহবতখানা জৌলুস হারিয়ে শ্রীহীন হয়ে পড়ে। এখনো এদেশের অনেক এলাকায় নহবতখানার অস্তিত্ব পরিলক্ষিত হয়।
এ রকম একটি নহবতখানা আজও কালের সাক্ষি হয়ে দাঁড়িয়ে আছে নড়াইলের ইতনা গ্রামে। লোহাগড়া শহরের কুন্দশী চৌরাস্তা থেকে প্রায় আট কিলোমিটার পূর্ব-দক্ষিণে মধুমতি নদীর পাড়ে ব্যানার্জিবাড়ির প্রবেশমুখে নহবতখানার অবস্থান। ইটের তৈরি নহবতখানায় রয়েছে শৈল্পিক নানা কারুকার্য। প্রতি বছর দূর্গা পূজার সময় নহবতখানায় বাদ্যকররা বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্রের সমন্বয়ে সুরের ঝঙ্কার তুলে থাকেন। ঐতিহ্যের স্মারক নহবতখানা দেখার জন্য দর্শনার্থীরা আজও এ গ্রামে ভিড় জমান।
নহবতখানার মালিক ও বিশিষ্ট শিল্পপতি বাসুদেব ব্যানার্জি বলেন, 'আমার দাদা মন্মথনাথ ব্যানার্জি রানি রাসমণির স্টেটের অধীনে ‘গাতিদার’ ও ‘তালুকদার’ ছিলেন। সে সময়ে তিনি নিজের এবং এলাকাবাসীর মনোরঞ্জনে বাড়ির এই কারুকার্যময় নহবতখানা নির্মাণ করেন। জমিদারী প্রথা বিলুপ্তির পর স্থাপিত নহবতখানাটি সংস্কারের অভাবে অস্তিত্ব সংকটে পড়ে। পরবর্তীতে এ সম্পর্কে নতুন প্রজন্মকে পরিচয় করাতে সংস্কার করা হয়েছে। এখনো দুর্গাপূজাসহ বাড়ির অন্যান্য উৎসব অনুষ্ঠানে এই নহবতখানা থেকে বাদ্যযন্ত্র বাজানো হয়ে থাকে।

আরও পড়ুন