কবি আজীজুল হক

আপডেট: 02:43:02 26/05/2020



img

পাভেল চৌধুরী

কবি আজীজুল হকের ৯০তম জন্মদিন ছিল গত ৩ মার্চ। ফেসবুকের পাতায় তাঁর সম্পর্কে কিছু লেখালেখি পাওয়া গেল, কিছু ছবিও। এর বাইরে যশোর সাহিত্য পরিষদ তাঁকে নিয়ে ঘরোয়া একটা অনুষ্ঠান করেছিল। কবি আজীজুল হকের কাছে যশোর সাহিত্য পরিষদের দায় অনেক। এই সংগঠনটা গড়ে তোলার পেছনে তিনি শুধু প্রচুর সময় ও শ্রম দিয়েছিলেন এমন না, এই সংগঠনকে তিনি জাতীয় পর্যায়ে উন্নীত করেছিলেন। প্রায় ৪০ বছর তিনি যশোরের সাংস্কৃতিক জগতকে শাসন করেছিলেন, পথ নির্দেশ করেছিলেন এবং নিজের নব নব সৃষ্টিকর্মে বিমোহিত করেছিলেন সংস্কৃতিমানদের। ছায়ানাটক ছিল তাঁর এক অনবদ্য সৃষ্টি। সরকারী মাইকেল মধুসূদন কলেজ চত্বরে বিপুলসংখ্যক দর্শকের উপস্থিতিতে তাঁর রচিত ও নির্দেশিত ছায়ানাটক ‘কৃষ্ণচূড়ার কান্না’ দেখে সেই ছাত্রাবস্থায় অভিভূত হয়েছিলাম। মঞ্চে কোনো শিল্পী ছিল না, ছিল তাদের ছায়া আর সেই ছায়ার সঞ্চালন এমন এক বাকরুদ্ধ নাটকীয় পরিবেশ সৃষ্টি করেছিল যে পিনপতন নীরবতায় অভিভূত ছিল প্রায় হাজারখানেক দর্শক। শুধু এইটুকু না, সেই ছায়ানাটকের ছিল সোচ্চার সাম্রাজ্যবাদ উপনিবেশিক শক্তিবিরোধী বক্তব্য। ছায়ানাটকের এই ধারা অব্যাহত থাকেনি। আজীজুল হক স্যার নিজেও সেই চেষ্টা আর করেননি। হয়তো ছায়ানাটকের জন্য প্রয়োজনীয় জোগাড়যন্ত্র তাঁর পক্ষে করে ওঠা সম্ভব হয়নি। কবিতার বাইরে এছাড়া কিছু গীতিআলেখ্যও তিনি রচনা করেছিলেন।
মজলিশি মানুষ ছিলেন তিনি। যে কোনো অড্ডা দেড়-দু’ঘন্টা এককভাবে জমিয়ে রাখতেন। পোড়াবাড়ির চমচম থেকে কান্তাজীর মন্দিরের স্থাপত্যশৈলী কোনো কিছুই তাঁর আয়ত্তের বাইরে ছিল না। আবার ব্যাডমিন্টন খেলাতেও তাঁর আগ্রহ বা দক্ষতা ছিল। বাগ্মি ছিলেন অসাধারণ। এত আকর্ষণ ছিল তাঁর বক্তব্যের যে শ্রোতাদের অভিভূত না হয়ে উপায় ছিল না। সময় পার হত অজান্তেই। সব মিলিয়ে তিনি ছিলেন বড় মাপের মানুষ। মানুষের সৌন্দর্যের যা কিছু মৌলিক উপাদান—মানবিকতা, নৈতিকতা, দৃঢ়তা, আত্মমর্যাদাবোধ, জ্ঞানগরিমা, অনুসন্ধিৎসা ইত্যাদি, এই সবকিছুকেই তিনি ধারণ করেছিলেন উচ্চমাত্রায়, দক্ষতার সাথে। প্রচারবিমুখ ছিলেন তিনি। স্বীকৃতি বা শ্রদ্ধাপ্রাপ্তি তাঁর লক্ষ্য ছিল না কিন্তু যারা তাঁকে বুঝতেন তারা তাঁকে শ্রদ্ধা করতে পেরে ধন্য হোতেন। একবার জেলা পরিষদ মিলনায়তনে এক সঙ্গীত সন্ধ্যায় বিপুল মানুষের ভিড়ে ভক্তপরিবৃত অবস্থায় কণ্ঠশিল্পী নিলুফার ইয়াসমিনকে (প্রয়াত) দেখেছিলাম স্যারকে দেখা মাত্র ছুটে এসে অবনত শ্রদ্ধায় পায়ে হাত দিয়ে সালাম করতে। সেদিন এই ঘটনায় উপস্থিত শ্রোতৃবর্গ বিস্মিত হয়েছিল তাতে সন্দেহ নেই।
দীর্ঘ সময়ের ব্যবধানে ৪টে বই লিখেছিলেন তিনি। ৩টে কবিতার, ১টা প্রবন্ধের, বাংলা একাডেমির পুরস্কার পেয়েছিলেন। তাঁর ছাত্ররা সাহিত্য-সংস্কৃতি-চাকরী-রাজনীতিতে সুনামধন্য হয়েছিলেন কিন্তু আজীজুল হক কখনও কোনো রকম উচ্চতর সুযোগ সুবিধা অর্জনে প্রলুব্ধ হননি। মাগুরার শ্রীপুরে ১৯৩০ সালে তাঁর জন্ম হলেও প্রায় পুরো কর্মজীবন তিনি যশোরে থেকে গেলেন। শেষ জীবনে অনেকটা নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েছিলেন তিনি। বেজপাড়ার পিয়ারীমোহন রোডের এক বাড়িতে ভাড়া থাকতেন। রোগশয্যায় ছিলেন বেশ কিছুদিন। দরিদ্রতা ছিল, পারিবারিক অনিশ্চয়তাও। অবশেষে ২৭ আগস্ট, ২০০১ সালে তাঁর জীবনাবসান হল।
আজীজুল হক স্যারের নামের সাথে পরিচিত ছিলাম অনেক আগে থেকে কিন্তু তাঁকে প্রত্যক্ষ জানলাম ১৯৭৫ সালে। তখন আমরা সরকারী মাইকেল মধুসূদন কলেজে উচ্চমাধ্যমিক প্রথম বর্ষের ছাত্র। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে তখন বিশৃঙ্খল পরিবেশ, উচ্ছৃঙ্খলদের দাপট। আজীজুল হক স্যার বাংলা পড়াতেন, ক্লাসে আসতেন যথাসময়ে। ছাত্রদের চরম গোলযোগের মধ্যেও সামান্যতম বিরক্তি প্রকাশ না করে বলতেন, - যত যাই কর, ঠিক সময়মত আসবো, রোল কল করবো আবার ঘণ্টা বাজলে চলে যাব। আমাকে উত্ত্যক্ত করা যাবে না। - কাজেই যারা চাইত ক্লাসে থাকতো, যারা চাইত না নির্বিবাদে বের হয়ে যেত ক্লাস থেকে। অসাধারণ আকর্ষণ ছিল স্যারের ক্লাসের প্রতি। বিশুদ্ধ স্পষ্ট উচ্চারণ, সাবলিল বাক্য গঠন আর নিখুঁত শব্দ প্রক্ষেপণ সবমিলিয়ে তাঁর ছিল কথা বলার বিশেষ স্টাইল। কথ্য ভাষারও যে একটা নান্দনিক দিক থাকে আর সেটা যে আয়াসসাধ্য বিষয়, স্যারের কাছ থেকে সেই প্রথম ধারণা পেয়েছিলাম।
ছোটোখাটো খুবই হালকা পালতা গড়নের মানুষ ছিলেন তিনি। ঘাড় অবধি ছিল বাঁকান চুল, চোখে ভারী ফ্রেমের চশমা। কণ্ঠ ছিল তেজস্বী কিন্তু প্রীতিপ্রদ। একবার টাউন হলের মাঠে, রাতে, বিপুল শ্রোতার উপস্থিতিতে তাঁর উদাত্ত কণ্ঠে স্বরচিত কবিতা আবৃতি শুনেছিলাম, ‘বাংলাকে ভালবাসা বড় বেশী কঠিন ব্যাপার’। এখনও যেন সময় বিশেষে তাঁর সেই কণ্ঠ আর আবেগ নিজের মনে অবিকল অনুরণিত হয়।
আর একদিনের ঘটনা। আমাদের এক সহপাঠী মজা করার জন্য কলেজে আসার সময় প্যাকেটে করে কিছু মানুষের মাথার খুলি আর হাড়গোড় নিয়ে এল। তখন এসব যত্রতত্র পাওয়া যেত। সকলে তো মহাখুশি। আমাদের একজন অপছন্দের স্যার ছিলেন। তাঁর ক্লাসে সেগুলো সাজিয়ে রাখা হল টেবিলের উপর আর ব্লাকবোর্ডের কোণায়। যথাসময়ে স্যার এলেন। স্যারের প্রতিক্রিয়া দেখার জন্য সমস্ত ক্লাস নীরব, যা আগে কখনও থাকতো না। প্রথমত স্যার বিষয়টা না দেখার ভান করলেন কিন্তু সামান্য সময় তারপরই বিকট চিৎকার করে লাফ দিয়ে বেরিয়ে গেলেন ক্লাস থেকে। এরপর সমস্ত কলেজ জুড়ে তোলপাড় শুরু হয়ে গেল। এত ভয়ঙ্কর কাজ! বিশেষকরে ধর্মভীরু শিক্ষকরা তো রীতিমত আহাজারী শুরু করে দিলেন। আমরাও যে ঘাবড়ালাম না এমন না; ঘটনার প্রতিক্রিয়া যে এতটা হবে কেউ ধারণা করেনি। অধ্যক্ষের নেতৃত্বে শিক্ষকদের জরুরী মিটিং বসলো। তদন্ত কমিটি করে দোষীদের কলেজ থেকে চিরতরে বহিষ্কারের প্রশ্ন উঠল। আমরা সহপাঠীদের সম্ভাব্য পরিণতির কথা ভেবে উদ্বেগের সাথে শিক্ষকদের আলোচনা শোনার চেষ্টা করলাম। এমন সময় শোনা গেল আজীজুল হক স্যারের কথা, - আপনারা এত উত্তেজিত হচ্ছেন কেন, এরা সব তরুণ যুবক, এদের কত সাহস, কত প্রাণশক্তি, এরা কিই না পারে! ক’দিন পরে দেখবেন মানুষের খুলিতে করে এরা চা খাবে, ফ্রেঞ্চ রেভিলুশনের কথা ভাবুন, এরা কি কিছুকে ভয় পায়? - আশ্বস্ত হোলাম আমরা। অন্তত একজন আমাদের হয়ে বললেন। সে যাত্রা আমাদের রক্ষা হয়েছিল, যে কারণেই হোক।
স্যারের সাথে ঘনিষ্ঠতা হল ১৯৮৯ সালের পর। তিনি তখন সরকারী এমএম কলেজ থেকে অবসর নিয়েছেন। ততোদিনে আমি একটা বেসরকারী কলেজে অধ্যাপনায় কয়েক বছর পার করেছি। একদিন জিজ্ঞেস করলাম, - অবসর জীবনে কী করছেন? বললেন,- পড়ছি, দৈনিক অন্তত ১০/১২ ঘণ্টা। দর্শন পড়ছি। আধুনিক কবি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করায় তিনি বলেছিলেন; সাম্প্রতিক সময় পর্যন্ত বিজ্ঞান সাহিত্য দর্শনের অগ্রগতি ধারণ করে যিনি কবিতা লেখেন তিনিই আধুনিক কবি। সব বিষয়েই তাঁর জ্ঞান ছিল অসাধারণ। পরিযায়ী পাখি সম্পর্কে একদিন এত বিস্তারিত বললেন যাতে অবাক না হয়ে উপায় ছিল না। মেলামেশার ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন উদার। আমাদের থেকে তিনি অনেক বয়জ্যেষ্ঠ হলেও কিংবা আমাদের থেকেও যারা অনেক ছোটো তাদের সাথেও তিনি মিশতেন বন্ধুর মত। আসলে আজীজুল হক নিজেকে যে একজন বড় মানুষে উন্নীত করতে পেরেছিলেন তাঁর পেছনে কারণ ছিল এটাই যে সামাজিক দায়বদ্ধতাকে তিনি কখনও অস্বীকার করেননি। তিনি যে বড় কবি হয়েছিলেন তার মূল প্রেরণাই ছিল এখানে। প্রগতির পক্ষে ছিলেন তিনি। প্রগতিশীল রাজনৈতিক কিংবা সামাজিক আন্দোলনে কখনও প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ভূমিকা রেখেছিলেন। ১৯৫৮ সালে আইয়ুব খানের মার্শাল ল প্রথম ভঙ্গ হয়েছিল যশোরে। সেদিন ছাত্র-জনতা মিছিল করে মার্শাল ল-এর প্রতিবাদ করেছিল। মার্শাল ল ভাঙ্গার সেই মিছিলে প্রথম সারিতে ছিলেন তরুণ অধ্যাপক আজীজুল হক। ‘৬০ এর দশকের ছাত্র আন্দোলনে তাঁর বাড়ী ছিল আন্দোলনরত ছাত্রদের গোপন আশ্রয়স্থল। বড় ধরনের বিপদের ঝুঁকি নিয়ে হলেও আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী ছাত্রদের তিনি নৈতিক সাহস আর উৎসাহ যুগিয়েছিলেন।
তিনি অসুস্থ হয়ে পড়লেন বলা যায় পরিণত বয়সের আগেই। যশোরের সুধীজনরা তাঁর চিকিৎসার জন্য চাঁদা তুলেছিলেন। বিদেশেও গিয়েছিলেন তিনি চিকিৎসার জন্য কিন্তু সেসব চিকিৎসা খুব একটা কাজে আসেনি। রোগশয্যায় যাওয়ার আগে প্রায়ই দেখতাম উত্তীর্ণ সন্ধ্যায় আমাদের রেল রোডস্থ বাড়ির সামনের দিয়ে তিনি পা’য় হেঁটে কিংবা রিকসায় বাড়ি ফিরছেন। কোনো কোনোদিন আমাদের বাড়ীর সামনে আমরা বসতাম। নানা প্রসঙ্গে আলাপ হত। অধিকাংশ সময়ই তিনি থাকতেন বিষণ্ন। কায়দা-কৌশল না জানায় চাকরিতে তাঁর কাঙ্ক্ষিত উন্নতি হয়নি। আর্থিক অবস্থাও ভাল ছিল না, তার উপর ছিল অসুখের হুমকি। একদিন এরকম এক উত্তীর্ণ সন্ধ্যায় তিনি এসে বসলেন। খুবই বিষণ্ন দেখলাম তাঁকে। চুপচাপ কিছুক্ষণ বসে থেকে বললেন, - ‘দেখ, এখন আমার তো কোন ভবিষ্যৎ নেই, সবই অতীত। চোখ বুজলে সিনেমার স্লাইডের মত অতীতের সেই সব দিনগুলোর ছবি আমি একটার পর একটা দেখতে পাই। সেই সব উত্তাল দিনগুলো দেখি, নিজেকে দেখি, ছাত্রনেতাদের দেখি, তারা এখন সব কতভাবে প্রতিষ্ঠিত। আজকে তার (নাম উল্লেখ করলাম না) সাথে দেখা করতে যেয়ে আমাকে বাইরে দেড় ঘণ্টা বসে থাকতে হল’। তাঁর গলা ধরে এসেছে টের পেলাম কিন্তু কয়েক মুহূর্তের জন্য মাত্র। তিনি উঠে হাঁটা শুরু করলেন। অন্যদিন হলে হয়তো ডাকতাম কিংবা উঠে হাত ধরে বসাতাম কিন্তু সেদিন আর সে সাহস বা শক্তি পেলাম না।
কবি আজীজুল হক লিখেছিলেন; - অবিকল মানুষেরা চিরকাল আসেনি কি দেখে/যন্ত্রণার অর্থ নেই জীবনের সত্য আর স্বপ্ন ব্যতিরেকে।
সেই স্বপ্ন আর সত্যের সন্ধানে আমৃত্যু নিরন্তর সংগ্রাম করে গেলেন আমাদের প্রণম্য শিক্ষক, কবি আজীজুল হক।
[লেখক : গল্পকার]