করোনাকালে নারী নেতৃত্ব গড়বে নতুন সমতার বিশ্ব

আপডেট: 12:38:06 09/03/2021



img

শাওলী সুলতানা:  এক বছরেরও বেশি সময় ধরে মহামারী পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে করতে আজ আর কেউ করোনাকে ভয় পায় না। কিন্তু গত বছরেরঠিক এইসময় মানুষ প্রচণ্ড আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটিয়েছে। ভয়ে বাড়িতেই বেশি সময় থেকেছে। যদিও রাস্তায় অল্পকিছু লোকজন দেখা যেতো, তাদের প্রায় সকলের মুখে থাকতো মাস্ক, কারো কারো হাতে গ্লাভস- এমনকী পকেটে বা ব্যাগে থাকতো হ্যান্ড স্যানিটাইজার। 
মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে আমার জন্ম হয়নি; অভিভাবকদের কাছে শুনেছি। গতবছরের মার্চ থেকে ৫-৬ মাস মানুষের মৃত্যু, আতঙ্ক, হতাশা আর নিস্তব্ধতায় মনে হয়েছে- খুব শিগগির এই জন্মভূমি বিরাণ হতে চলেছে।
মার্চের ২২ তারিখ থেকে আমাদের অফিস পুরোপুরি বন্ধ। নতুন এক অভিজ্ঞতা ঝুলিতে জমা হয়; বাসায় থেকে অফিস করা। প্রথমদিকে বেশ খুশিই লাগছিল, বাসায় থেকে অফিস! অফিসের কাজ করবো, আবার বাড়িতেও ছেলেমেয়েদের সময় দিতে পারবো। কিন্তু কিছুদিন যেতে না যেতে খারাপ লাগা শুরু হয়ে যায়। ফিল্ডে কাজ করা মানুষ কি চার দেয়ালে বন্দি থাকতে পারে? প্রাণটা আইঢাঁই করতে লাগলো; কলিগদের মুখ দেখা হয় না। ভিকটিমদের সাথে আলাপ হয় না সরাসরি। বাচ্চারা স্কুলে বা কলেজে যেতে পারছে না। বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিতে পারছে না। লেখাপড়ায় মনোযোগ নেই; সময়মতো খেতে চাইছে না- সে এক দুর্বিষহ অবস্থা!
আমি পেশায় একজন সোস্যাল ওয়ার্কার। একটি আন্তর্জাতিক সংস্থায় পাচারের শিকার মেয়েদের নিয়ে কাজ করি। মেয়েদের সাথে কথা না বললে, দেখা না হলে মনে হয় যেন কোনো কাজই করিনি। সংস্থার সহায়তায় মার্চ মাসেই ভারত থেকে পাচারের শিকার ১১ মেয়েকে দেশে ফেরত আনা হয়। নিয়মানুযায়ী পারিবারিক একত্রীকরণের আগপর্যন্ত মেয়েদের শেল্টারহোমে রাখতে হয়। করোনার কারণে ওই মুহূর্তে তাদের পরিবারের কাছেও হস্তান্তর করা যাচ্ছে না। শেল্টারহোমে থাকায় মেয়েরাও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত। এ অবস্থায় তাদের সাথে নিয়মিতভাবে দেখা এবং তাদের মানসিক সাপোর্ট আমার দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে।
অফিসের নির্দেশনা অনুযায়ী মেয়েদের মোবাইলফোনে মাধ্যমে করোনার ভয়াবহতা ও সেখান থেকে উত্তরণে করণীয় সম্পর্কে জানাতে হবে। তাদের বোঝাতে হবে- কীভাবে এ রোগ ছাড়ায়, পরিত্রাণের উপায়, এমনকী কোথায় গিয়ে চিকিৎসা নিতে হবে- সে সম্পর্কে অবগত করা শুরু করি। এরই মধ্যে আরেক সমস্যা, মেয়েদের ঘরে খাবার নেই। কর্মসংস্থানের অভাবে পরিবারের আয়ের একমাত্র ব্যক্তিটিও বেকার। সবার মধ্যে হাহাকার, হতাশা। জানতে পারি, কোনো কোনো ভিকটিমের পরিবারের এমনই অবস্থা যে, তাদের দু'বেলা খাবার জুটছে না। কেউ কেউ রাস্তায় বের হয়েছে চাল যোগাড়ের উদ্দেশ্যে। চেয়ে চিনতে যা পায়- তাতেই খুশি। রাতটা তো অন্ততঃ দু'মুঠো খেয়ে ঘুমানো যাবে।  
বিষয়টি অফিসকে জানাই। তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সারভাইভরদের মাঝে ত্রাণ দিতে হবে।
বাজেট পাশ হয়ে হাতে টাকা আসতে অনেক সময়ের ব্যাপার। এতোদিন অপেক্ষা করা যাবে না। শহরের বড়বাজারের রঘুদা'র দোকানে ফোন দেই। প্রথম অবস্থায় সারভাইভরের জন্য এক মাসের গ্রোসারি (মুদি মালামাল)সহ হাইজিন ম্যাটেরিয়ালের (সাবান, হ্যান্ড স্যানিটাইজার, ন্যাপকিন) ২৮টি প্যাকেট নিই। সেগুলো পৌঁছে দিতে হবে সবার বাড়ি বাড়ি। সারভাইভরদের বাড়ি কিন্তু বিভিন্ন জেলায়। কারো যশোর, কেউ সাতক্ষীরার। এছাড়া মাগুরা ও খুলনা জেলারও রয়েছে।
সরকারি নির্দেশনা, খুব বেশি প্রয়োজন না হলে ঘরের বাইরে যাওয়া যাবে না। কিন্তু পরিস্থিতি বলছে- এখনই বাইরে যাওয়া সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। করোনার ভয়ে না খেয়ে মানুষ মারা যাবে- সেটি আরও ভয়ঙ্কর।
বাড়িতে স্বামী-সন্তান রেখে নিজে যতটুকু সম্ভব করোনারোধে ব্যবস্থা নিয়ে বের হই। প্রত্যেক সারভাইভরের বাড়িতে পৌঁছে দিই তাদের জন্যে তৈরি খাবার আর হাইজিনের প্যাকেট। প্যাকেট পেয়ে সারভাইভর ও তাদের পরিবারের সদস্যদের চোখে-মুখে যে কৃতজ্ঞতার চকচকে জল দেখেছি, তাতে ভুলে গেছি করোনায় আক্রান্ত হওয়ার ভয়। সে এক দারুণ ভাললাগা, সে এক দারুণ পরিতৃপ্তি!
সময়ের সাথে সাথে করোনার ভয়াবহতা বাড়তে থাকে। এবার আর বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে খাদ্যসামগ্রী দেওয়া যাবে না। সারভাইভরের হাতেও টাকা দেওয়া যাবে না। কী করা যায়? তাদের তো চলতে হবে, খেতে হবে।
শেষমেষ সিদ্ধান্ত, মোবাইলফোনের মাধ্যমে মুদিদোকানিদের সহায়তায় খাবার দিতে হবে। ডিজিটাল বাংলাদেশের ডিজিটাল পদ্ধতি! সারভাইভররা স্থানীয় মুদি দোকানে গিয়ে দোকানির হাতে ফোন দেয়। আমি নিত্য প্রয়োজনীয় সামগ্রীর (মালামাল) তালিকা দেই। আর উনারা সেই বাজেট অনুযায়ী তাদের হাতে মালামাল দেয়। এরপর বিকাশের মাধ্যমে টাকা পেমেন্ট। বেশিরভাগ দোকানি এই কাজে সহায়তা করলেও কিছু কিছু দোকানদার আমাকে নাকানি চুবানি খাওয়ায়। এরপর ভিকটিমের কাছ থেকে বিল নেয়া, মালামালসহ ভিকটিমদের ছবি নেয়া- আর কত কী?
ইমো অ্যাপ কানেক্ট করতে অনেক সময় ঘণ্টার পর ঘণ্টা চলে যায়। তাদের বোঝাতে সময় লাগে। এক একজন ভিকটিমের জন্য কমপক্ষে ১/২ ঘণ্টা সময় ব্যয় হত।
এদিকে, শেল্টারহোমে থাকা ভিকটিমদের কথাও ভাবতে হচ্ছে। সেখানকার খাবার, পরিবেশ, বাথরুম কোনোকিছুই তাদের পছন্দ হচ্ছে না। সারভাইভররা যার যার বাড়িতে পাঠানোর জন্য বারবার তাগাদা দিচ্ছে। এসব মেয়েদের মধ্যে পাচারের সাথে জড়িত কারো ফুফু, কারো মা, আবার কারো বাবা। কীভাবে পাঠাই তাদের অনিশ্চতায় মধ্যে! তাদের কাউন্সেলিং দেই, যাতে মানসিকভাবে স্থির হতে পারে। এরমধ্যে তুলনামূলক যারা কম ঝুঁকিপূর্ণ, তাদের পরিবারের কাছে হস্তান্তর করি। কিন্তু থেকে যায় আরও ৭ জন। এ মধ্যে ২ জন সারভাইভরের মাধ্যমে খুলনা ও মাগুরা থানায় অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে মামলাও করা হয়েছে।
যখন শেল্টারহোমে যাই, চারদিক থেকে বাচ্চারা আমার কাছে ছুটে আসে। তাদের চোখে-মুখে অনেককিছু খুঁজে পাই। কী বলবো তাদের, একই কথা তো বারবার বলা যায় না। অনেক কষ্টে বুঝিয়ে শুনিয়ে যখন নিজের বাড়ি ফিরি, তখন এক ধরনের পূর্ণতা কাজ করতো।
মনে পড়ে ১৬ মার্চের কথা। পূজার (ছদ্মনাম) বয়স মাত্র ১২। জন্ম বাংলাদেশ হলেও ছোটবেলা ভারতের ব্যাঙ্গালোরে দাদির কাছে বড় হয়েছে। দাদি সেখানকার পতিতালয়ের একজন সর্দারনী। বাবা আজাদুল একজন পাচারকারী। বিয়ের প্রলোভনে বাংলাদেশ থেকে বহু মেয়েকে সে নিয়ে গেছে ভারতে। এরপর পূজার দাদির কাছে বিক্রি করে ফিরে আসে। পূজা ছোটবেলা থেকেই দাদির কাছে; সে কখনই বিশ্বাস করেনি- তার বাবা পাচারকারী। মেয়েকে ফেরত দেবার নাম করে আমরা খুলনার একটি থানায় যাই। মেয়েকে জিম্মায় নেয়ার জন্য পূজার বাবা পৌঁছানোর সাথে সাথেই পুলিশ তাকে পাকড়াও করে। সে মানবপাচারের একটি মামলার ১ নম্বর অভিযুক্ত। পরিবারে ফিরিয়ে দেয়ার লক্ষ্যে পূজার মাকেও অনেক খোঁজাখুজি করা হয়। কিন্তু তার খোঁজ মেলেনি।
সেই মার্চ মাস থেকে আজ পর্যন্ত পূজা শেল্টারহোমে আমাদের তত্ত্বাবধানেই ছিল। তার হাহাকার উপলদ্ধি করেছি। সমব্যথী হয়ে তাকে বোঝানোর চেষ্টা নির্মম বাস্তবতা। কিন্তু পাচারকারীদের সাথে কোনো সমঝোতা করিনি। পূজার বাবাকে আইনের আওতায় আনাটা আমাদের কর্তব্য। ঠিক একইভাবে আমাদের দায়িত্ব পূজাকে নিরাপদে রাখা। এ মাসেই তাকে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার অংশ হিসেবে তাকে আরেকটি শেল্টারহোমে স্থানান্তর করেছি। মেয়েটির ভবিষ্যৎ কী হবে, জানি না। “লেখাপড়া শিখে মানুষের মতো মানুষ হও পূজা”- এটিই প্রত্যাশা।
আরেকটি মেয়ের কথা বলতে চাই। নিশি। বয়স মাত্র ১৬। গতবছরের জুলাই মাসে সাতক্ষীরার কলারোয়া সীমান্ত থেকে ভারতে প্রবেশের প্রাক্কালে বিজিবির মাধ্যমে উদ্ধার হয়। এরপর কলারোয়া থানা থেকে সংস্থার জিম্মায়। মেয়েটি সে ছোটবেলা থেকে ঢাকার যাত্রাবাড়ী এলাকায় একটি ব্রিজের নিচে থাকতো। মা আছে, একটি হোটেলে কাজ করে। বসবাসের জায়গা না থাকায় সে রাস্তায় রাস্তায় থাকতো। সাবান শ্যাম্পুর অভাবে উসকো-খুসকো চুল, মাথায় জট, গায়ে গন্ধ, দাঁতগুলো হলুদ। এলাকার প্রভাবশালী ব্যক্তিদের দ্বারা বহুবার যৌন হয়রানির শিকার হয়েছে। গর্ভের ভ্রূণও নষ্ট করতে হয়েছে কয়েকবার। স্থানীয় এক মেয়ের সহায়তায় চাকরির প্রলোভনে সে ভারতে যাচ্ছিল। কিন্তু ভাগ্য ভাল, সে উদ্ধার হয়েছে। নিশিকে কোনোভাবেই শেল্টারহোমে রাখা যাচ্ছিল না। একবার সে পালানোরও চেষ্টা করে।
সেই নিশিকে এখন স্বয়ং তার মা দেখলেও চিনতে পারবে না। এখন সে টেইলরিংয়ের প্রশিক্ষণ গ্রহণ করছে। তার ইচ্ছে, স্বাবলম্বী হওয়ার।
করোনার মধ্যে ঘটে যাওয়া প্রতিটি ঘটনা আমার কাছে স্পষ্ট। এক একজন মানুষকে তার অবস্থা ও অবস্থানের পরিবর্তন করতে পারা কত যে খুশির, আনন্দের- তা কিন্তু বলে বোঝানো যাবে না।
তাদের কথায়, আমার সাথে কথা বললে তাদের হালকা লাগে, সব হতাশা দূর হয়ে যায়- তখন বুকটা গর্বে ভরে ওঠে। যখন প্রকাশ্যে নিশি বলে, আপনার মতো মানুষ আছে বলেই আমরা পরিবর্তন হই। যখন পায়েল বলে, আপু পাশে না থাকলে আমি হয়তো আবার ভারতে চলে যেতাম। এর পেছনে যে কতটা ভালবাসা, কতটা কষ্ট ছিল, কত বিবেচনা- আসলে বোঝানো যায় না। এসব উপলব্ধির ব্যাপার। কোনো স্বীকৃতি কিংবা পুরস্কার লাভের আশায় নয়। সেইসব বাচ্চাদের মুখের দিকে তাকালে নিজসন্তানদের মুখটাই ভেসে উঠেছে। সন্তানের মঙ্গলে পরিশ্রম- তা তো আর ঢাকঢোল পিটিয়ে লোকজন জানানোর দরকার নেই। এই কাজ আমার প্যাশন, কোনো কিছু পাওয়ার আশায় আমি ছুটছি না।  

লেখক: একটি আন্তর্জাতিক সংস্থায় কর্মরত

আরও পড়ুন