করোনায় সতর্ক হবেন কীভাবে

আপডেট: 03:37:33 11/03/2020



img

সায়েদুল ইসলাম : বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো করোনাভাইরাস (কোভিড-১৯) আক্রান্ত তিনজন রোগী শনাক্ত হয়েছে। এই ঘোষণার পর বাংলাদেশের নাগরিকদের মধ্যে একধরনের ভীতি ছড়িয়ে পড়তে দেখা গেছে। ওষুধের দোকানগুলো থেকে হাত জীবাণুমুক্তকরণ ও মাস্ক ফুরিয়ে গেছে। সরকারি যোগাযোগের নম্বরেও অনেকে ফোন করতে শুরু করেছেন।
এর আগেই করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের কারণে বিশ্বে স্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে ইউনিসেফ। তবে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা বলছেন, এ নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কোনো দরকার নেই। তারা কিছু নিয়ম মেনে চলার পরামর্শ দিয়েছেন।
কিন্তু করোনাভাইরাস সংক্রান্ত ব্যাপারে কী করা উচিত? কোথায় যাওয়া যাবে? বাংলাদেশের সক্ষমতা কতটা রয়েছে?

কী করবেন
আইইডিসিআরের পরিচালক মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা সংবাদ সম্মেলন করে বলেছেন, ''বিদেশ থেকে বাংলাদেশে এলে অন্তত ১৪ দিন বাড়িতেই থাকুন। এ সময় কারো সঙ্গে মেলামেশা করবেন না।''
আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশীদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেছেন, ''বিদেশ থেকে আসা প্রতিবেশী, আত্মীয়স্বজনের ক্ষেত্রে আপনারা নিশ্চিত করুন যেন তারা অন্তত ১৪ দিন বাড়িতেই থাকেন। তারা বাইরে বেরিয়ে এলে আপনারা বাড়িতে থাকার কথা মনে করিয়ে দিন।''
করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার লক্ষণগুলো দেখা দিতে ১৪ দিন পর্যন্ত সময় লাগে। ফলে এই সময়টাতে সবাইকে স্বেচ্ছা কোয়ারেন্টিনে থাকার পরামর্শ দিচ্ছেন চিকিৎসকরা। অর্থাৎ বাড়িতে একা থাকতে হবে, কারো সঙ্গে মেলামেশা করা যাবে না।
এই সময়ের মধ্যে ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার উপসর্গ দেখা দিলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হটলাইনে যোগাযোগ করতে হবে। সেখান থেকে নমুনা সংগ্রহ, চিকিৎসার ব্যাপারে পরামর্শ দেওয়া হবে।
নতুন হটলাইন নম্বর ১৬২৬৩
অব্যাহত চাপ কমাতে শিগগিরই জানিয়ে দেওয়া হবে আরো আটটি নতুন নম্বর।
এছাড়া পুরনো হটলাইন নম্বরগুলোও চালু থাকবে। এগুলো হলো :
০১৯৩৭০০০০১১
০১৯৩৭১১০০১১
০১৯২৭৭১১৭৮৪
০১৯২৭৭১১৭৮৫

কী ধরনের লক্ষণ দেখা দিলে চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে?
করোনাভাইরাসের লক্ষণ দেখা দিলে হটলাইন ১৬২৬৩ নম্বরে যোগাযোগ করার পরামর্শ দিয়েছে বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষ। এরপর তারাই পরীক্ষানিরীক্ষা, পরামর্শ বা হাসপাতালে নেওয়ার ব্যাপারে নির্দেশনা দেবেন।
জ্বর দিয়ে ভাইরাসের সংক্রমণ শুরু হয়, এরপরে শুকনো কাশি দেখা দিতে পারে। সেই সঙ্গে মাথাব্যথা, নাক দিয়ে পানি পড়া, গলা ব্যথা, জ্বর ইত্যাদি হতে পারে। প্রায় এক সপ্তাহ পরে শ্বাসকষ্ট শুরু হয়ে যায়। অনেক রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি করে চিকিৎসা দিতে হয়।
প্রতি চারজনের মধ্যে অন্তত একজনের অবস্থা মারাত্মক পর্যায়ে যায় বলে মনে করা হয়।
করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে হালকা ঠান্ডা লাগা থেকে শুরু করে মৃত্যুর সব উপসর্গ দেখা দিতে পারে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, এই ভাইরাসে আক্রান্ত ব্যক্তির লক্ষণ প্রকাশ পেতে ১৪ দিন পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।
বাংলাদেশের স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বলেছে, আক্রান্ত হলেও বাড়িতে বসেই চিকিৎসা নিতে হবে। তবে হাসপাতালে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হলে হটলাইন নম্বরে যোগাযোগ করে জানাতে হবে। তখন কর্তৃপক্ষই বাড়ি থেকে হাসপাতালে নিয়ে এসে চিকিৎসার ব্যবস্থা করবে।

যেসব সতর্কতা নিতে হবে
মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা বলছেন, ''হাত ধোয়া থেকে শুরু করে স্বাস্থ্য সতর্কতার যেসব নিয়মের কথা বলা হচ্ছে, সেগুলো মেনে চলুন।''
তিনি বলছেন, এই ভাইরাস প্রতিরোধ করতে নিয়মিত সাবান ও পানি দিয়ে দুই হাত ধোবেন অন্তত বিশ সেকেন্ড ধরে।
''অপরিষ্কার হাতে চোখ, নাক, মুখ স্পর্শ করবেন না। ইতোমধ্যে আক্রান্ত ব্যক্তিদের সংস্পর্শ এড়িয়ে চলুন। কাশি-হাঁচির সময় শিষ্টাচার মেনে চলুন।''
তিনি বলছেন, ''কারো সঙ্গে করমর্দন, কোলাকুলি ইত্যাদি থেকে বিরত থাকুন। জরুরি প্রয়োজন ব্যতীত বিদেশ ভ্রমণ থেকে বিরত থাকুন। যথাসম্ভব জনসমাগম এড়িয়ে চলুন।''

মাস্ক ব্যবহার কতটা জরুরি
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আবুল কালাম আজাদ বলছেন, সবার মাস্ক পরতে হবে- এমন কথা নেই। যারা চিকিৎসার সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত, তাদের অবশ্যই মাস্ক বা পোশাক পরতে হবে। কিন্তু অন্যদের মাস্ক পরা নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার দরকার নেই। হাত ধোয়ার জন্য সবচেয়ে ভালো সাবান-পানি ব্যবহার করা।
বিদেশ থেকে আসা স্বজনদের নিতে না আসা, পাবলিক পরিবহন ব্যবহার না করে নিজস্ব পরিবহন ব্যবহার করা, বাড়ি থেকে যেন কেউ গ্রহণ করতে না আসেন, সেজন্যও পরামর্শ দিয়েছে আইইডিসিআর।

চিকিৎসা ও পরামর্শ কোথায় পাওয়া যাবে
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আবুল কালাম আজাদ সাংবাদিকদের বলেন, ''প্রতিটি জেলার সিভিল সার্জনদের বলা হয়েছে যেন, জেলায়, উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত যেন কন্ট্রোল রুম স্থাপন করা হয়। সেখানে যোগাযোগের নম্বর দেওয়া হবে। কারো সমস্যা, প্রয়োজন বোধ করলে সেখানে যোগাযোগ করতে পারবেন।''
এছাড়া স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের জরুরি যোগাযোগ নম্বর ১৬২৬৩ নম্বরে যোগাযোগ পরামর্শ নিতে পারবেন। পাশাপাশি আরো কয়েকটি জরুরি নম্বর চালু করা হচ্ছে।
মি. আজাদ বলছেন, ''করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হলেও বাড়িতে থেকেই চিকিৎসা নেওয়া যাবে। আইইডিসিআরের হটলাইন থেকে এবং স্থানীয় নম্বরগুলোয় যোগাযোগ করে প্রয়োজনীয় পরামর্শ পাওয়া যাবে। খুব জরুরি দরকার হলে হাসপাতালে যাবেন।''
''আমরা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই চাইবো, মানুষ বাড়িতে বসেই চিকিৎসা নেবেন। টেলিফোনের মাধ্যমে পরামর্শ নিতে পারলে টেলিফোনেই নেবেন। যখন জটিলতা দেখা দেবে, হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার মতো পরিস্থিতি হবে, তখন আমাদের সঙ্গে টেলিফোনে যোগাযোগ করলে আমরাই পরামর্শ দেবো।''
''রোগী যদি গুরুতর অসুস্থ হয়, তাহলে আমরাই রোগীকে পরিবহন করে হাসপাতালে নিয়ে আসবো। সেই প্রস্তুতি আমাদের আছে।''
তিনি জানান, হাসপাতালগুলোকে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে যেন বহির্বিভাগে যেকোনো সর্দি-কাশির মতো রোগীদের আলাদাভাবে চিকিৎসার ব্যবস্থা একটু দূরে করা হয়। অনেক হাসপাতালে সেটা চালু করা হয়েছে।

পরীক্ষা
আইইডিসিআর পরিচালক মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা বলছেন, ''গতকাল থেকে আজ পর্যন্ত হটলাইনে করোনাসংক্রান্ত ৪৭৯টি টেলিফোন পেয়েছি। অনেকেই তাদের রক্তপরীক্ষা করাতে চান। কিন্তু নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে মাত্র চারজনের। আশঙ্কা নেই, এমন মানুষই বেশি ফোন করছেন। তার মানে রোগটি এখনো ছড়িয়ে পড়েনি, তাই শঙ্কিত হওয়ার, আতঙ্কিত হওয়ার দরকার নেই।''
''বিভিন্ন স্থানে আমাদের সার্ভেইল্যান্স নেটওয়ার্ক আছে, তার মাধ্যমে নমুনা সংগ্রহ করা হচ্ছে। এছাড়া উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত কন্ট্রোল রুম করা হচ্ছে।''
এখন পর্যন্ত আইইডিসিআরের ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষানিরীক্ষা করা হচ্ছে। কিন্তু আরো কয়েকটি ল্যাবরেটরি প্রস্তুত রাখা হয়েছে, প্রয়োজন হলে সেখানেও পরীক্ষানিরীক্ষা করা যাবে।
''আমাদের হটলাইন নম্বরে যেকেউ ফোন করতে পারবেন। কিন্তু তার পরীক্ষানিরীক্ষার প্রয়োজন আছে কিনা, সেটা আমরা যাচাই করে দেখবো।'' বলছেন মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা।

বাংলাদেশের সক্ষমতা কতটা?
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের আবুল কালাম আজাদ বলছেন, করোনাভাইরাস মোকাবেলায় সবরকমের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
তিনি বলছেন, জেলা-উপজেলা পর্যায়ে কন্ট্রোল রুম চালু করতে বলা হয়েছে। সেখানে এ সংক্রান্ত সবরকমের পরামর্শ, সেবা পাওয়া যাবে।
হাসপাতালগুলোকে রোগটি মোকাবেলায় বিশেষ প্রস্তুতি নিতে বলা হয়েছে বলে তিনি জানান।
স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী জাহিদ মালেক বলেছেন, দেশের সব জেলায় সিভিল সার্জনদের মাধ্যমে হাসপাতাল প্রস্তুত রাখা হয়েছে। সেখানে আলাদা আইসোলেটেড ইউনিট প্রস্তুত রাখা হয়েছে। পাশাপাশি চিকিৎসক ও নার্সদের প্রশিক্ষিত করা হয়েছে।
বাংলাদেশের কর্মকর্তারা দাবি করেছেন, করোনাভাইরাস নিয়ে বিশ্বব্যাপী আতংকের মুখে বাংলাদেশে সরকারি হাসপাতালগুলোতে দশ হাজার শয্যার ব্যবস্থা করাসহ প্রতিরোধ এবং চিকিৎসার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের পরিচালক মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা বলছিলেন, উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত সরকারি হাসপাতালে শয্যার ব্যবস্থা করা হচ্ছে এবং তাদের এই ব্যবস্থা যথাযথ বলে তারা মনে করছেন।
"সারাদেশে সব হাসপাতালে পাঁচটি করে বেড নিয়ে আইসোলেশন ইউনিট করে রাখা হচ্ছে। এছাড়া আরো কিছু হাসপাতাল ডেজিগনেট করে দেওয়া হচ্ছে। যেসব হাসপাতাল ভবন নতুন হয়েছে বা পড়ে আছে, যেমন ঢাকায় কুয়েত মৈত্রী হাসপাতালে আমরা অন্য রোগী ভর্তি বন্ধ করে দিয়ে করোনার জন্য ডেজিগনেট করেছি। এরকম ব্যবস্থা আমরা নিচ্ছি।"
তিনি এটাও বলেছেন যে, অন্য রোগীদের চিকিৎসায় যাতে কোনো সমস্য না হয়, সেই বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা হচ্ছে।
দেশের কয়েকটি জেলায় সিভিল সার্জনদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সরকারের নির্দেশ অনুযায়ী তারা সরকারি হাসপাতালগুলোতে করোনা ভাইরাসের রোগীর জন্য পাঁচটি করে শয্যা নির্দিষ্ট করে রেখেছেন।
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু হাসপাতালের শয্যা প্রস্তুত করলেই হবে না। ফুসফুসের জটিলতার চিকিৎসার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা থাকতে হবে, যেহেতু এই রোগে ফুসফুস আক্রান্ত হয়। জেলা বা উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোয় সেটা কতটা পাওয়া যাবে, তা নিয়ে তারা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
আইইডিসিআর জানিয়েছে, এ পর্যন্ত মোট আক্রান্ত দেশের সংখ্যা ১০২টি। নিশ্চিত রোগী শনাক্ত হয়েছে এক লক্ষ পাঁচ হাজার ৫৮৬ জন।
সারা বিশ্বের মোট মৃত্যুর সংখ্যা তিন হাজার ৫৮৪ জন।
সূত্র : বিবিসির বিশ্লেষণ