করোনা কি পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে?

আপডেট: 10:39:05 31/07/2020



img

মেহদিউর রহমান টুটুল

করোনায় ধরাশায়ী ভূমণ্ডলের প্রান্তস্থ নাগরিক-চোখে ডিসেম্বর থেকে এই সময়কাল স্বাস্থ্য প্রপঞ্চ সবচেয়ে গুরুত্ব পেয়েছে দেখে কেমনতরো একটা বিস্ময়বোধে আচ্ছন্ন হই। মানুষের নানান কীর্তিগাথা মগজে এমনভাবে গ্রথিত হয়েছিল, হঠাৎ এই জীবাণুর আবির্ভাবে সেসকল সৌধ হুড়মুড় ভেঙে পড়তে দেখে বিমূঢ়তা কাটাতে কষ্ট হয়। অতীত মহামারির অসহায়তার তুলনায় বর্তমান খুব একটা যে এগিয়ে নেই, সেটা বোঝার জন্য বিজ্ঞানী হবার প্রয়োজন হয় না বিধায় অতীত ইতিহাসে ঢুঁ মারার বিকল্প মাথায় আসে না। ধাতস্ত হয়ে ভাবতে গিয়ে দেখি এ্যাতো এ্যাতো উন্নতির পরও প্রকৃতিতে মানুষ বড়ো অসহায়- দুনিয়ার উপর আধিপত্য যত সৃষ্টি হয়েছে সে তুলনায় তার শারীরিক নিরাপত্তা খুবই ভঙ্গুর।
স্বাস্থ্য বা চিকিৎসা সেবার যেসব কর্পোরেট অথবা বাজারভিত্তিক সাফল্য প্রচারিত হয়ে মানসলোকে যে চিত্রের ছাপ ছিল, টাকা থাকলেই মানুষ উন্নত চিকিৎসাসেবার সুযোগ পেতে পারে- করোনা প্যান্ডেমিক চোখে আঙুল দিয়ে দেখালো, দুনিয়ার স্বাস্থ্যব্যবস্থা কী বিস্ময়কর রকম নাজুক। উন্নত চিকিৎসা ব্যবস্থার দেশগুলোতে মানুষের মৃত্যুর মিছিল হতবাক করে দেওয়ার মতো। সম্পদের প্রাচুর্যতা এবং আমাদের জ্ঞাত উন্নত চিকিৎসা ব্যবস্থার অধিকারী পাশ্চাত্যের করোনা-সম্মুখে অসহায় আত্মসমর্পণ নতুন কিছু প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। অবকাশ সৃষ্টি হয়েছে স্বাস্থ্য ব্যবস্থার নানান বাণিজ্যিক ও মুনাফাকেন্দ্রীক দিক নিয়ে পুনর্ভাবনার।
বাজার এবং কর্পোরেট পুঁজিতন্ত্রের নিয়ন্ত্রিত চিকিৎসা ব্যবস্থার স্বরূপ এই মহামারিতে মুখোশপরা মানুষগুলোর সামনে উন্মোচিত হয়ে পড়েছে। কেন মধ্যম আয়ের একটি দেশ তার সরকারি হাসপাতালগুলোতে করোনা শনাক্তকরণ ব্যবস্থা এবং আইসিইউ ভেন্টিলেশন অক্সিজেন সরবরাহ করতে হিমশিম খাচ্ছে। খোদ রাজধানীতে যেসব বিশাল পুঁজির ব্যক্তিমালিকানাধীন বড় হাসপাতাল গড়ে উঠেছে অন্যান্য ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সাথে তার যে কোনো পার্থক্য নেই সেটা এবারের মহামারির সময়ের ভুক্তভোগীমাত্রই জানেন। প্রতিনিয়ত রাষ্ট্র পরিচালকদের কাছ থেকে উন্নয়নের গল্প-কিসসা শুনতে অভ্যস্ত আমরা স্বাস্থ্যব্যবস্থার এই বেহাল দশা দেখে জৈব সত্তার মানুষ হিসেবে হতাশাগ্রস্ত হই। এগুলো না হয় আমাদের রাষ্ট্র ব্যবস্থার কাঠামোগত সংকট, কিন্তু আমেরিকার মতন উন্নত স্বাস্থ্য ব্যবস্থার বেহাল দশার কারণ কী? সেখানেই তো মহামারিতে আক্রান্তের হার এবং মৃতের সংখ্যা সর্বাধিক। এসব মৃত মানুষের সিংহভাগই অতি দরিদ্র। তাদের ৬০ শতাংশ নিম্নআয়ের কালো মানুষ অথবা বাদামি কিম্বা এশিয়ার শ্রমজীবী মানুষ। এদের মধ্যে বাংলাদেশিরাও আছেন। আমেরিকার দুরাবস্থা আমাদের চিন্তাজগতে বর্তমান বিশ্বব্যবস্থার দুর্বলতার জায়গা চিহ্নিত করতে সহায়ক হয়েছে।
করোনার সময়ে প্রতিবেশি ভারত রাষ্ট্রের দরিদ্র-শ্রমজীবী জনগণের প্রতি আচরণ আমরা দেখতে পেলাম। শ্রমজীবী মানুষ দলে দলে শত শত মাইল হেঁটেও নিজ বাড়িতে পৌঁছুতে পারেনি; ক্লান্তি ও ক্ষুধায় মৃত্যুবরণ করেছে। পৃথিবীতে আজ উদার পুঁজিবাদী রাষ্ট্রগুলোর কাছ থেকে শিক্ষা গ্রহণের কিছু যে নেই, সেটা মহামারি বেশ ভালোভাবে বুঝিয়ে দিচ্ছে। আমাদের অবশ্যই ফিরতে হবে জীবন ও জীবীকার উপর দায়বদ্ধ উন্নয়ন দর্শনের দিকে যেখানে শুধু মুনাফাই একমাত্র লক্ষ হবে না। নতুন এই সংকটসৃষ্ট অভিজ্ঞতা থেকে মানবের মৌলিক চাহিদার জায়গা অন্ন-বস্ত্রের পাশাপাশি চিকিৎসাকে দিতে হবে অগ্রাধিকার- সেটা হবে কর্পোরেট পুঁজিতন্ত্রের মুনাফাভিত্তিক স্বাস্থ্যব্যবস্থার বিপরীতে গণমানুষের জৈব শরীর রক্ষার গণমুখী স্বাস্থ্যব্যবস্থা। সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় এখনই। রাষ্ট্রকে অবশ্যই সুস্থ-সবল-স্বাস্থ্যবান নাগরিক সৃজনের দায়িত্ব নিতে হবে। কারণ সুস্থ-সবল মানুষ দীর্ঘদিন শ্রমদান করে অর্থনীতির গতিপ্রবাহ সচল রাখবে। স্বাস্থ্যখাতে বাজেট বৃদ্ধি করতে হবে। ভাবতে হবে আমাদের খাদ্যাভ্যাস এবং খাদ্য নিরাপত্তা নিয়েও। এগুলোই সময়ের দাবি। করোনা উপলব্ধি করতে বাধ্য করলো আমাদের জৈব শরীর কত অনিরাপদ হয়ে পড়েছে সকল ক্ষেত্রে মুনাফাভিত্তিক একটা বিশ্বব্যবস্থার কারণে।
ইতিহাস ঘাঁটলেই দেখবো একটা মহামারি কীভাবে বিশ্বকে পাল্টে দিয়েছিল। পাল্টেছে মানচিত্র-রাজনীতি-বিশ্ব নেতৃত্বের পাশাপাশি উন্নয়নের চিন্তা বা ধরনও। করোনা প্যান্ডেমিকও বহু কিছুর ইঙ্গিত দিচ্ছে। ভবিষ্যৎদ্বাণী করা আমার পছন্দ নয়, তবে প্রত্যাশা করি বিশ্বে নতুন শুভশক্তির আগমন ঘটুক। যা মানুষের জন্য- মানবিকতার জন্য- মানুষকে ভালোবাসার জন্য- মানুষকে সুরক্ষার জন্য নতুন পৃথিবী গড়ে তুলবে।

লেখক : রাজনীতিক, সমাজচিন্তক

আরও পড়ুন