করোনা জীবন নিল ফজল-এ-খোদার

আপডেট: 09:51:40 04/07/2021



img

সুবর্ণভূমি ডেস্ক: “সালাম সালাম হাজার সালাম, সকল শহীদ স্মরণে। আমার হৃদয় রেখে যেতে চাই, তাদের স্মৃতির চরণে।”
একাত্তরে স্বাধীন বাংলা বেতারের যে উজ্জয়িনী গানগুলো মুক্তিকামী বাঙালিকে মরণপণ লড়াইয়ের শক্তি যুগিয়েছিল, যে গানগুলো পাঁচ দশক পর আজও বাংলাদেশের মানুষকে আন্দোলিত করে, এ গান তারই একটি।  
আবদুল জব্বারের সুরে, তার কণ্ঠে গাওয়া ‘সালাম সালাম হাজার সালাম’ গানটি ২০০৬ সালে বিবিসির জরিপে ‘সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ’ ২০ বাংলা গানের তালিকায় দ্বাদশ স্থান পায়।
বাঙালির স্বাধীনতার ইতিহাসে অমর এ গানের গীতিকার, বাংলাদেশ বেতারের সাবেক পরিচালক ফজল-এ-খোদা চিরবিদায় নিয়েছেন রোববার।
করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে গত কয়েক দিন ধরে ঢাকার শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন ফজল-এ-খোদা। কিন্তু তার আর বাসায় ফেরা হয়নি।   
জীবদ্দশায় বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে ‘সালাম সালাম হাজার সালাম’ গানটির পেছনের গল্প বলে গেছেন ফজল-এ-খোদা।
ভাষাশহীদদের শ্রদ্ধা জানানোর পাশাপাশি পাকিস্তানি শাসকদের বিরুদ্ধে সংগ্রামের কথা তুলে ধরে ১৯৬৯ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি গানটি লিখেছিলেন তিনি। গানটি লেখার আগে শিল্পী বশির আহমেদের সঙ্গে তার কথা হয়েছিল। তখন সুর দেওয়া হলেও রেকর্ডিং আর হয়নি।
দুই বছর পর এলো অগ্নিঝরা একাত্তর। শিল্পী আব্দুল জব্বার একদিন ফজল-এ-খোদাকে বললেন, বঙ্গবন্ধু ভাষা শহীদদের নিয়ে একটি গান করতে বলেছেন।
ফজল-এ-খোদা তখন তার লেখা ‘সালাম সালাম’ গানটির কথা বলেন। কিন্তু বেতারে সেই গান প্রচার করতে বাদ সাধেন তখনকার সংগীত বিভাগের প্রধান নাজমুল আলম।
তার আপত্তি ছিল গানের ‘বাংলাদেশের লাখো বাঙালি, জয়ের নেশায় চলে রক্ত ঢালি’ কথাগুলো নিয়ে। পরে ঢাকা বেতারের আঞ্চলিক পরিচালক আশরাফ-উজ-জামান খানের পরামর্শে ‘চলে রক্ত ঢালি’ বদলে ‘আনে ফুলের ডালি’ লেখেন গীতিকার ফজল-এ-খোদা।
১৯৭১ সালের ১৪ মার্চ আব্দুল জব্বারের সুরে ও ধীর আলী মিয়ার সংগীতায়োজনে গানটি রেকর্ড করে সেদিন থেকেই প্রচার শুরু হয়।
ততদিনে বাঙালির মুক্তির সংগ্রাম চূড়ান্ত পর্যায়ে।
স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্রে সালাম ‘সালাম সালাম হাজার সালাম’ গানটি প্রচারের পর কলকাতার হিন্দুস্থান রেকর্ডস থেকে ‘সোনার বাংলা’ সিরিজে গানটি আবার রেকর্ড করা হয়।
আর স্বাধীনতার পর লন্ডন থেকে বের হয় মিউজিক অব বাংলাদেশ নামে একটি লং প্লে, সেখানে এগারোটি গানের একটি ছিল 'সালাম সালাম হাজার সালাম'।
মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে ফজল-এ-খোদার একটি ডায়েরি  সংরক্ষিত আছে। তার নিজের হাতে লেখা ‘সালাম সালাম হাজার সালাম’ গানটি ছাড়াও বেশ কয়েকটি দেশাত্মবোধক গান রয়েছে সেখানে।
ছড়াকার খালেক বিন জয়েনউদদীন তার ‘আত্মপ্রকাশের দীপাবলি’ বইয়ে ‘সালাম সালাম হাজার সালাম’ গানটি চুরি করার অভিযোগ আনলে বছর তিনেক আগে আদালতেও গিয়েছিলেন ফজল-এ-খোদা।
ওই গানের লেখক হিসেবে কাজী সালাউদ্দিন নামে একজনের কথা উল্লেখ করা হয়েছিল বইটিতে; যিনি শিল্পী আব্দুল জব্বারের ছাত্র বলে পরিচয় দেন।
খালেক বিন জয়েনউদদীন ও সাত ভাই চম্পা প্রকাশনীর প্রকাশক নিলুফা ইয়াসমিনকে বিবাদী করে মানহানির ওই মামলা করেছিলেন ফজল-এ-খোদা।
তবে বেতার ও টেলিভিশনের প্রচারিত গানে গীতিকার হিসেবে ফজল-এ-খোদার নামই রয়েছে। হিন্দুস্তান রেকর্ডস থেকে প্রকাশিত গানেও ফজল-এ-খোদার নাম উল্লেখ রয়েছে।
১৯৪১ সালের ৯ মার্চ পাবনার বেড়া থানার বনগ্রামে ফজল-এ-খোদার জন্ম।  তার বাবা মুহাম্মদ খোদা বক্স, আর মা মোসাম্মাৎ জয়নবুন্নেছা।
এক সাক্ষাৎকারে ফজল-এ-খোদা বলেছিলেন, যখন প্রথম গান লিখেছিলেন তখন ছিলেন পাকিস্তান এয়ারফোর্সে ক্যাডেট। সেখানকার এক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের জন্য ‘আমাদের দেশটা সুজলা সুফলা/ কী সুন্দর কী চমৎকার মুখে যায় না বলা’ শিরোনামে একটি বাংলা গান লেখার দায়ে তাকে শাস্তির মুখে পড়তে হয়েছিল। পরে চাকরি ছেড়ে দেশে চলে আসেন।
১৯৬৩ সালে বেতারের তালিকাভুক্ত গীতিকার হিসাবে যাত্রা শুরুর পর ১৯৬৪ সালে টেলিভিশনেও গীতিকার হিসেবে তিনি তালিকাভুক্ত হন। বাংলাদেশ বেতারের পরিচালক হিসেবে অবসরে যান তিনি।
গীতিকার হিসেবে দীর্ঘ ক্যারিয়ারে ‘যে দেশেতে শাপলা শালুক ঝিলের জলে ভাসে’, ‘ভালোবাসার মূল্য কত আমি কিছু জানি না’, ‘কলসি কাঁধে ঘাটে যায় কোন রূপসী’, বাসন্তী রং শাড়ি পরে কোন বধূয়া চলে যায়’, আমি প্রদীপের মতো রাত জেগে জেগে’, ‘প্রেমের এক নাম জীবন’, ‘ভাবনা আমার আহত পাখির মতো, পথের ধুলোয় লুটোবে’র মতো গান লিখেছেন তিনি।
তার লেখা গানে সুরারোপ করেছেন আজাদ রহমান, আবদুল আহাদ, ধীর আলী, সুবল দাস, কমল দাশগুপ্ত, আবেদ হোসেন খান, অজিত রায়, দেবু ভট্টাচার্য, সত্য সাহার মতো সংগীতজ্ঞরা।
আর গান কণ্ঠে তুলে মানুষের মুখে মুখে ছড়িয়ে দিয়েছেন বশীর আহমেদ, আবদুল জব্বার, মোহাম্মদ আলী সিদ্দিকী, রথীন্দ্রনাথ রায়ের মতো শিল্পীরা।
স্ত্রী মাহমুদা সুলতানা এবং তিন ছেলে ওয়াসিফ-এ-খোদা, ওনাসিস-এ-খোদা ও ওয়েসিস-এ-খোদাকে রেখে গেছেন ফজল-এ-খোদা।
সূত্র : বিডিনিউজ

আরও পড়ুন