কিনারা হয়নি ১৯ কেজি সোনা চুরির

আপডেট: 10:22:40 22/11/2019



img
img
img

সেলিম রেজা, বেনাপোল (যশোর) : চুরির পর ১২ দিন পার হয়ে গেলেও হদিস মেলেনি বেনাপোল কাস্টম হাউসের লকার থেকে চুরি যাওয়া ১৯ কেজি ৩৮০ গ্রাম সোনার। এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত কাউকে আটক করা সম্ভব হয়নি।
এরই মধ্যে গত বুধবার (২০ নভেম্বর) জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যানকে চিঠি দিয়ে ডিবি ও পিবিআইকে দিয়ে চুরির ঘটনা তদন্ত করার অনুরোধ করেছেন বেনাপোল কাস্টমস কমিশনার বেলাল হোসাইন চৌধুরী।
চিঠিতে বলা হয়, গত ৮ নভেম্বর থেকে ১০ নভেম্বর পর্যন্ত সাপ্তাহিক ছুটি, ঈদ-ই-মিলাদুন্নবী এবং ঘূর্ণিঝড় বুলবুল পরিস্থিতি চলাকালে বেনাপোল কাস্টম হাউসের শুল্ক গুদামের ‘নিরাপদ’ লকার থেকে ১৯ কেজি ৩৮০ গ্রাম সোনা চুরি করে নিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা। কিন্তু গত ১২ দিনেও সোনা উদ্ধার ও চোর শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। কাস্টম হাউসের রাজস্ব কর্মকর্তা এমদাদুল হক বাদী হয়ে বেনাপোল পোর্ট থানায় গত ১১ নভেম্বর একটি মামলা করেন। সর্বশেষ কাস্টমস, পুলিশ, ডিবি, পিবিআই ও র‌্যাবের ইনভেনটরি (চুরি যাওয়া জিনিসপত্রের তালিকা) অনুযায়ী, শুল্ক গুদাম থেকে ১৯ কেজি ৩৮০ গ্রাম সোনা, ১৯ হাজার ২৩০ ভারতীয় রুপি এবং ৩৭ হাজার বাংলাদেশি টাকা চুরি হয়।
চুরির ঘটনা জানার পরপরই লকারের গোডাউনে দায়িত্বরত সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা শাহিবুল সর্দারকে দায়িত্বে অবহেলার জন্য সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান ও সদস্যদের অবহিত করা হয়। বন্ধের সময় কর্মরত চার সিপাইকেও দায়িত্বে অবহেলার জন্য তাৎক্ষণিক সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। পুলিশ, পিবিআই, গোয়েন্দা, ডিবি, সিআইডিসহ সব আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাকে তাৎক্ষণিকভাবে তদন্তে সম্পৃক্ত করা হয়। তাদের তদন্ত চলমান রয়েছে।
যুগ্ম কমিশনারের নেতৃত্বে নয় সদস্যের একটি বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। ইতোমধ্যে কাস্টম হাউস ও চেকপোস্টের সামগ্রিক নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। মূল্যবান গুদাম পাহারার জন্য পৃথক সিপাই ও আনসার মোতায়েন করা হয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, চুরি যাওয়া সোনার বেশির ভাগই ২০১৭ ও ২০১৮ সালে শুল্ক গুদামে জমা হয়। ওই সময়ে সাত জন সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা (এআরও) মূল্যবান এই গোডাউনের দায়িত্বে ছিলেন। সবচেয়ে বেশি সময় ১৪ মাস দায়িত্বে ছিলেন এআরও বিশ্বনাথ কুণ্ডু। তাকে বদলি করে এআরও রিপনকান্তি ধর ও আব্দুল আউয়াল মজুমদারকে গুদামের দায়িত্ব দেওয়া হয়। তবে এই দুই কর্মকর্তা দীর্ঘ নয় মাসেও বিশ্বনাথ কুণ্ডুর কাছ থেকে দায়িত্ব বুঝে পাননি। পরে এআরও মো. অলি উল্লাহকে গতবছর ২৭ সেপ্টেম্বর দায়িত্ব বুঝিয়ে দেন বিশ্বনাথ কুণ্ডু। এআরও মো. অলি উল্লাহ ২০১৯ সালের ১৫ জানুয়ারি পর্যন্ত, এআরও মো. শহীদুল ইসলাম মৃধা ১২ এপ্রিল পর্যন্ত এবং এআরও আরশাদ হোসাইন ১৭ নভেম্বর পর্যন্ত গুদামের দায়িত্বে থাকেন। ১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৯ তারিখ থেকে এআরও শাহিবুল সরদার দায়িত্বে আছেন।
চুরির ঘটনায় বন্দর থানা পুলিশ সূত্রে জানা যায়, বহিরাগত ব্যক্তিদের মধ্যে আজিবর রহমান, মো. সুরত আলী, মহব্বত হোসেন, আসাদুজ্জামান, আলাউদ্দিন, সুলতান, আবুল হোসেন, টিপু সুলতান, ইমরান হোসেনকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে ডিবি পুলিশ। এদের মধ্যে কেউ কেউ বিভিন্ন সময়ে গুদাম পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজে নিয়োজিত ছিলেন। শুল্ক গুদামের নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত সিপাই এবং আনসার সদস্যদেরও জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।
যশোর জেলা পুলিশের নেতৃত্বে স্থানীয় ডিবি, এসবি, সিআইডি ও পিবিআই গত ১১ নভেম্বর থেকে লাগাতার তদন্ত চলছে। ইতোমধ্যে সন্দেহজনক কর্মচারীদের কয়েকজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে তারা। প্রকৃত অপরাধী এখনো চিহ্নিত করা সম্ভব হয়নি। প্রাথমিক তদন্তে চুরি যাওয়া সোনার পরিমাণ ১৯ কেজি ৩৮০ গ্রাম বলা হয়। পরবর্তীতে ইনভেনটরি করে দেখা যায়, শুল্কগুদামে ১৯৭৩ সাল থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত আটককৃত বিভিন্ন দেশের বিপুল পরিমাণ মুদ্রা, রুপা ও রৌপ্যসদৃশ বস্তু, সোনার গহনা ও সোনার বার, ঘড়ি, ইমিটেশনসহ আরো অন্যান্য মূল্যবান জিনিস রক্ষিত থাকলেও পুরনো জিআরের কোনো সোনা চুরি হয়নি। শুধু ২০১৭ ও ২০১৮ সালে উদ্ধার করা সোনাই চুরি হয়েছে। চুরি হওয়া ১৬.৫৮৮ কেজি সোনা এআরও বিশ্বনাথ কুণ্ডুর দায়িত্বে থাকাকালীন গুদামে জমা হয়।
বেনাপোলের এক ব্যবসায়ী (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) জানান, ‘রাষ্ট্রীয় সম্পদ চুরির সঙ্গে জড়িত চোরচক্রকে অবিলম্বে শনাক্ত ও গ্রেফতার না করলে এ ধরনের ঘটনা ঘটতেই থাকবে। প্রযুক্তিতে সমৃদ্ধ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ১২ দিনেও কেন আসামি শনাক্ত ও গ্রেফতার করতে পারেনি এ বিষয়ে বেনাপোলের ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষ বিস্মিত। কাস্টমসের ভেতর যেসব বহিরাগত বিভিন্ন ধরনের কাজে নিয়োজিত তারাও এ ঘটনায় জড়িত থাকতে পারে। কারণ লকার রুমের চাবি অনেক সময় তাদের কাছে দেওয়া হয় গুদাম পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করার জন্য।’
আরেক ব্যবসায়ী বলেন, ‘চুরির ঘটনা কাস্টমসের ভেতর থেকেই  ঘটানো হয়েছে। চোরেরা আগে থেকেই দীর্ঘ দিন পরিকল্পনা করে এ ধরনের চুরি করার সাহস পেয়েছে। কারণ চুরির সময় গোটা কাস্টম হাউসের সিসি ক্যামেরার সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে রাখা হয়। সিসি ক্যামেরার কন্ট্রোল রুম থেকে কীভাবে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হলো, আর ডুপ্লিকেট চাবি ব্যবহার করে সোনা লুট করা হলো কীভাবে, সেটাই এখন তদন্ত কর্মকর্তাদের দেখা উচিত।’
যশোরের পুলিশ সুপার মঈনুল হক জানান, সোনা চুরির পরপরই কাস্টমস থেকে সাত জনকে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। বিভিন্ন প্রযুক্তি ব্যবহার করে তদন্ত করা হচ্ছে। এখন পর্যন্ত তদন্ত অব্যাহত আছে।
সূত্র : বাংলা ট্রিবিউন

আরও পড়ুন