কৃত্রিম সংকট, চৌগাছায় চড়া দামে সার বিক্রি

আপডেট: 10:31:48 07/09/2020



img

রহিদুল ইসলাম খান, চৌগাছা (যশোর) : চৌগাছায় কৃত্রিম সংকট দেখিয়ে সরকার-নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে কৃষকদের সার কিনতে বাধ্য করার অভিযোগ পাওয়া গেছে।
তবে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রইচ উদ্দিন বলছেন উপজেলায় সারের কোন সংকট নেই এবং বেশি মূল্যে সার বিক্রির সুনির্দ্দিষ্ট কোনো অভিযোগ তারা পাননি। পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তবে কৃষি অফিসেরই একটি সূত্র জানিয়েছে, সার উত্তোলন না করার অভিযোগে চৌগাছা শহরের ডিলার মেসার্স শয়ন ট্রেডার্সের বিক্রয় কেন্দ্র চারদিন বন্ধ করে দেয় কৃষি অফিস। সূত্রমতে, সারের নির্ধারিত মূল্যের অতিরিক্ত দাম ও কৃত্রিম সার সংকট ঠেকাতে গত ১২ আগস্ট উপজেলা কৃষি কর্মকর্তাদের সারের বাজার মনিটরিং করার জন্য জোর তাগিদ দিয়ে একটি পত্র দেওয়া হয়। এরপরই কৃষি কর্মকর্তারা মাঠে মনিটরিং জোরদার করেন।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) চাপ উপেক্ষা করে ২০০৮-০৯ অর্থবছর থেকে ২০১৯-২০ অর্থবছর পর্যন্ত পাঁচ দফা সারের দাম কমিয়েছে সরকার। এভাবে কমিয়ে ৮০ টাকার টিএসপি ২২ টাকায়, ৭০ টাকার এমওপি ১৫ টাকায় এবং ৯০ টাকার ডিএপি ১৬ টাকায় কৃষক পর্যায়ে বিতরণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। ডিলার পর্যায়ে প্রতি কেজি সার কৃষক পর্যায় থেকে দুই টাকা কমে বিতরণ হচ্ছে। এই নির্ধারিত মূল্যে কৃষকের কাছে পৌঁছে দিতে গত ১২ বছরে শুধু সারে সরকার ভর্তুকি দিয়েছে প্রায় ৭৪ হাজার কোটি টাকা। ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে ডিএপি সারের দাম কমিয়ে ২৫ টাকা থেকে ১৬ টাকা কেজি করা হয়। এতে সরকারের বছরে ডিএপি সারে বাড়তি প্রণোদনা দিতে হবে ৮০০ কোটি টাকা।
তবে ডিলারদের কারসাজির কারণে সরকারের কোটি কোটি টাকার প্রণোদনার সুফল সম্পূর্ণ পাচ্ছেন না উপজেলার কৃষকরা।
চাষিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বর্তমানে টিএসপি সার নির্ধারিত ২২ টাকা মূল্যে কোথাও পাওয়া যাচ্ছে না। তাদের ২৮ থেকে ৩২ টাকা কেজি পর্যন্ত কিনতে হচ্ছে। একইভাবে ডিএপি ১৬ টাকার স্থলে ২০ থেকে ২২ টাকা, এমওপি ১৫ টাকার স্থলে ১৮ থেকে ২০ টাকা, ইউরিয়া ১৬ টাকার স্থলে ১৮ থেকে ২০ টাকা করে কিনতে হচ্ছে।
উপজেলার চৌগাছা, সলুয়া, সিংহঝুলি, পুড়াপাড়া, মাশিলা, হাকিমপুর, পাশাপোল, নারায়ণপুর, চাঁদপাড়াসহ বিভিন্ন বাজারে ঘুরে বেশি দামে সার বিক্রি করতে দেখা গেছে। ডিলাররা সিন্ডিকেট করে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করছেন বলে সুবর্ণভূমির কাছে অভিযোগ করেন কৃষক ও খুচরা বিক্রেতারা।
উপজেলার চাঁদপাড়া গ্রামের আশরাফুল ইসলাম জানান, তিনি গত সপ্তাহে গ্রামের বাজার থেকে নিজের মাছের ঘেরের জন্য এক বস্তা টিএসপি সার কেনেন। বিক্রেতা তাকে জানান, বাকিতে নিলে এক হাজার ৫৪০ টাকা বস্তা, আর নগদে নিলে দেড় হাজার টাকা বস্তা। পরে তিনি বাকিতে এক হাজার ৫৪০ টাকায় এক বস্তা সার কিনতে বাধ্য হন।
খড়িঞ্চা গ্রামের চাষি রফিকুল ইসলাম বলেন, তিনি দুই বিঘা জমিতে আমনের চাষ করেছেন। এছাড়া সবজির আবাদ রয়েছে। তার দাবি, সারা বছরই টিএসপি ২৫ টাকা, ডিএপি ১৮ থেকে ২০ টাকা এবং ইউরিয়া ১৮ থেকে ১৯ টাকা কেজি দরে কিনতে হয়। আগস্ট মাসেও তিনি এই দামে সার কিনেছেন।
বাঘারদাড়ি গ্রামের মিজানুর রহমান জানান, তিনি এক বিঘার কম জমিতে আমন চাষ করেছেন। প্রায় দুই বিঘা জমিতে সবজি (পটল, করলা, মরিচ ইত্যাদি) চাষ রয়েছে তার। ৫ সেপ্টেম্বর তিনি বলেন, ‘সারা বছরই টিএসপি সার ২৫ টাকা কেজি দরে কিনতে হয়। গত সপ্তাহেও একবস্তা টিএসপি সার কিনেছি ২৫ টাকা কেজি দরে। তবে এখন দাম আরো বেশি। টিএসপি ২৮ থেকে ৩০ টাকা কেজিও বিক্রি হচ্ছে।’
কর্মকর্তারা জিজ্ঞেস করলে একই কথা বলবেন কিনা জানতে চাইলে এই চাষি বলেন. ‘অবশ্যই বলবো।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন খুচরা বিক্রেতা বলেন, বিসিআইসি-নির্ধারিত ডিলাররা বরাদ্দ নেই অজুহাতে সারের দাম বাড়িয়ে দিয়েছেন। ফলে চাষিদের অতিরিক্ত মূল্যে সার কিনতে হচ্ছে।
তিনি বলেন, টিএসপি সার আগে ডিলারদের কাছ থেকে তারা কিনতেন এক হাজার ১৪০ টাকা বস্তা। অর্থাৎ প্রায় ২৩ টাকা কেজি। তারা বিক্রি করতেন ২৪-২৫ টাকা কেজি দরে। এখন তাদের এক হাজার ৪৫০ টাকা পর্যন্ত বস্তা (৫০ কেজি) কিনতে হচ্ছে। ফলে গ্রামের চাষিদের সর্বোচ্চ এক হাজার ৬০০ টাকা পর্যন্ত বস্তা প্রতি টিএসপি কিনতে হচ্ছে। একইভাবে ইউরিয়া সার তারা ৭৯০ টাকা, ডিএপি ৮৫০ টাকা পর্যন্ত কিনছেন।
তিনি বলেন, বেশিরভাগ ডিলার চট্টগ্রাম থেকে বিসিআইসির বরাদ্দের সার উত্তোলন করে সেখানেই কালোবাজারে বেশি দামে বিক্রি করে দেন। সার না এনে তারা বলেন, বরাদ্দ নেই। বিএডিসির বরাদ্দের সারও যশোর থেকে না এনে সেখানেই বিক্রি করে দেন। একইভাবে ভর্তুকি মূল্যে আমদানি করা সারেরও সংকট তৈরি করে বেশি দামে কিনতে বাধ্য করেন ডিলাররা।
তিনি প্রশ্ন রাখেন, ‘সার না এনেও ডিলাররা কীভাবে অ্যারাইভাল (আগমনী বার্তা) জমা দিয়ে, কেউ আবার না দিয়েও পার পেয়ে যান?’
নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক বিসিআইসির একজন ডিলারের সহোদর ও খুচরা বিক্রেতা জানান, এবছর সার বিক্রিতে বেশ লাভ হচ্ছে। তার তথ্য, টিএসপি ২৭-২৮ টাকা, ডিএপি ১৮-২০, ইউরিয়া ১৮-২০ এমওপি ১৮-২০ টাকা কেজি দরে বিক্রি করছেন তিনিসহ অন্য খুচরা বিক্রেতারা।
উচ্চ দর কেন- জানতে চাইলে তিনি বলেন, জুলাই-আগস্ট মাসে সারের বরাদ্দ নেই। তাই বাইরের সার কিনে এনে বিক্রি করায় দাম বেশি।
তাকে জানানো হয়, জুলাই মাসে ১৫০ মেট্রিক টন টিএসপি এবং ৪০০ টন ডিএপি চৌগাছার জন্য বরাদ্দ হয়েছে। এপর্যায়ে তিনি বলেন, ডিলাররা চট্টগ্রাম থেকে সার তুলে সেখানেই ১২০-১৩০ টাকা বস্তাপ্রতি বেশি দামে বিক্রি করে দিয়ে আসেন। একইভাবে বিএডিসির বরাদ্দের সারও বিসিআইসি ও বিএডিসি ডিলাররা যশোরেই বিক্রি করে দেন। ফলে বাজারে সার সংকট হয়।
বাজারে সার সংকট কেন জানতে চাইলে উপজেলার সিংহঝুলি ইউনিয়নের বিসিআইসি ডিলার মেসার্স দিপু এন্টারপ্রাইজের সত্বাধিকারী শাহাবুদ্দিন চুন্নু ওরফে বড় মিয়া প্রথমে বলেন, এই দুই মাসে (জুলাই-আগস্ট) টিএসপি সারের কোনো বরাদ্দ নেই। বরাদ্দ নেই?- ফের প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, অল্প কিছু সার বরাদ্দ আছে। যা আনতে খরচ অনেক বেশি হবে বলে সার উত্তোলন করা হয়নি।
উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, চৌগাছা উপজেলায় জুলাই মাসে সারের চাহিদা ছিল ইউরিয়া এক হাজার ৪০০ মেট্রিক টন, টিএসপি ২২৫, ডিএপি ৬০০, এমওপি এক হাজার ১০০, জিপসাম ৬০০ এবং বোরন আট টন। এর বিপরীতে ইউরিয়া বরাদ্দ ছিল ৯৬০ টন। ভুর্তুকির আওতাভুক্ত হিসেবে টিএসপি বিসিআইসি থেকে ৫৯ এবং বিএডিসি থেকে ৯১ মোট ১৫০ টন, বিএডিসি থেকে ডিএপি ৪০০ এবং এমওপি ৩০০ টন বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
নিয়ম রয়েছে, যে মাসের সার বরাদ্দ হবে ওই মাসসহ দুই মাসের মধ্যে সেই সার সংশ্লিষ্ট উপজেলার ডিলারদের নির্ধারিত গুদামে তুলে উপজেলা কৃষি অফিসে অ্যারাইভাল রিপোর্ট (আগমনী বার্তা, অ্যারাইভাল রিপোর্টকেই সার উত্তোলন করে সংশ্লিষ্ট উপজেলায় আনার প্রমাণ হিসেবে ধরা হয়) জমা দিতে হবে। এরপর উপজেলা কৃষি অফিসার বা কৃষি সম্প্রসারণ অফিসার নিজে গিয়ে সার গুনে দেখে বিক্রির অনুমতি দেবেন।
তবে বরাদ্দের দুই মাস ছয় দিন পার হলেও সোমবার পর্যন্ত বিএডিসির বরাদ্দ ৯১ টন টিএসপির বিপরীতে ৩৭ জন ডিলারের মধ্যে ১৩ জন ৩৯ দশমিক ৪৫ টনের অ্যারাইভাল (আগমনী বার্তা) জমা দিয়েছেন। বিসিআইসির বরাদ্দ ৫৯ টন টিএসপির বিপরীতে ১৬ ডিলারের মধ্যে ১৪ ডিলার ৫৫ দশমিক ৩৫ টনের অ্যারাইভাল (আগমনী বার্তা) জমা দিয়েছেন। তবে বিসিআইসি ডিলাররা এসব আগমনী বার্তা জমা দিলেও সার এলাকায় আনেননি বলে খুচরা বিক্রেতা ও কৃষকদের অভিযোগ।
এছাড়া বিএডিসি থেকে বরাদ্দ ৪০০ টন ডিএপি সারের বিপরীতে উপজেলার ৩৭ জন ডিলারের মধ্যে সোমবার পর্যন্ত ২৩ জন মোট ২৯৩ দশমিক ৫৫ টন ডিএপি সারের অ্যারাইভাল (আগমনী বার্তা) জমা দিয়েছেন। অর্থাৎ বরাদ্দের এক চতুর্থাংশ সার উপজেলায় আসেনি। অথচ সার সংকট, বাইরে থেকে সার আনতে হচ্ছে বলে চাষিদের কাছ থেকে অতিরিক্ত দাম আদায় করা হচ্ছে।
এসব বিষয়ে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রইচ উদ্দিন বলেন, বাজারে সার সংকট নেই। এখন পর্যন্ত সংকটের সুনির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ পাইনি। অভিযোগ পেলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
লাল সালুতে মূল্যতালিকা না টাঙানোর বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা গিয়ে দেখেছি ঝুলিয়েছে। তবে আমাদের অফিসের লোকজন চলে এলে বিক্রেতারা আবার সেটা খুলে ফেলছে।’
তিনি বলেন, ‘গত ২৬ আগস্ট আমরা ডিলারদের ডেকে এবিষয়ে কথা বলেছি। কোনোভাবেই যেন নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে সার বিক্রি না হয় তাদের সে বিষয়ে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।’
উপজেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির সভাপতি এবং চৌগাছা উপজেলা নির্বাহী অফিসার এনামুল হক বলেন, ‘আমি এখানে নতুন এসেছি। সম্প্রতি আমরা মিটিং করে ডিলারদের এ বিষয়ে দিকনির্দেশনা দিয়েছি। তবে বেশি দামে সার বিক্রি হচ্ছে- এমন কোনো সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাইনি। পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

আরও পড়ুন