কেশবপুরে নির্বাচনী মাঠ সরগরম, নেই বিএনপি

আপডেট: 03:06:47 12/02/2020



img

স্টাফ রিপোর্টার, কেশবপুর (যশোর) : কেশবপুরে ভোটের মাঠ উত্তপ্ত হয়ে উঠছে।
যশোর-৬ কেশবপুর আসনটি শূন্য হওয়ায় এ আসনে সরকারি দলের মনোনয়ন পেতে চেষ্টা-তদবির শুরু করেছেন অনেকে। সংবাদ সম্মেলনের পাশাপাশি গণসংযোগ, মিছিল, মিটিংসহ শো-ডাউন করছেন তারা। অনেকেই বলছেন, দলীয় হাইকমান্ডের সিগন্যাল পেয়েই তারা মাঠে নেমেছেন।
সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক শিক্ষামন্ত্রী এ এস এইচকে সাদেক ও প্রয়াত সংসদ সদস্য ইসমাত আরা সাদেকের মেয়ে প্রকৌশলী নওরিন সাদেক, চিত্রনায়িকা শাবানার স্বামী ওয়াহিদ সাদিক, যশোর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক উপজেলা চেয়ারম্যান শাহীন চাকলাদার, কেশবপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি এস এম রুহুল আমিন ও সহ-সভাপতি এইচ এম আমির হোসেন। এদের মধ্যে ‘নৌকার মনোনয়ন নিশ্চিত’ বলে দাবি করছেন ওয়াহিদ সাদিক, নওরিন সাদেক ও শাহীন চাকলাদার। তবে স্থানীয় উপজেলা আওয়ামী লীগের প্রায় সকল নেতা-কর্মী ও সমর্থক এস এম রুহুল আমিন অথবা শাহীন চাকলাদারের মধ্যে যে কোনো একজনকে দলীয় প্রার্থী হিসেবে দেখতে চান। বসন্তের কোকিলদের আর মানতে নারাজ তারা। এমন দাবিতে তারা একাট্টাও হয়েছেন। তাদের দাবি যে নেতা স্থানীয়দের সঙ্গে মিশতে পারবেন তাকেই মনোনয়ন দেওয়া উচিত।
গত ১১ ফেব্রয়ারি বেলা ১১টায় কেশবপুর উপজেলা আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে এক সভা এসএম রুহুল আমিনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত হয়। সভায় সর্বসম্মতিক্রমে জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শাহীন চাকলাদারকে প্রার্থী হিসেবে সমর্থন জানানো হয়।
গত ২১ ফেব্রয়ারি কেশবপুরের সংসদ সদস্য (যশোর-৬) ইসমাত আরা সাদেক মারা যাওয়ায় এ আসনটি শূন্য হয়। তার মৃত্যুর পর আসন্ন উপ-নির্বাচনে সরকারি দলের প্রার্থী হতে বেশ কয়েকজন ভোটের মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন।
আগামী ১৬ ফেব্রয়ারি যশোর- ৬ কেশবপুর শূন্য আসনে উপ-নির্বাচনের তফশিল ঘোষণা করা হবে বলে নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে।
এদিকে, প্রধান বিরোধী শক্তি বিএনপি উপনির্বাচনে অংশ নেওয়ার ব্যাপারে দৃশ্যত ইতিবাচক হলেও দলীয় কোনো সম্ভাব্য প্রার্থীকে মাঠে দেখা যাচ্ছে না। তবে দলীয় সূত্রে জানা গেছে, উপ-নির্বাচনে প্রার্থী হতে চান কেশবপুর উপজেলা বিএনপির সভাপতি ও কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য আবুল হোসেন আজাদ এবং কেন্দ্রীয় ধর্মবিষয়ক সহসম্পাদক অমলেন্দু দাস অপু।
আবুল হোসেন আজাদ গত দু-দু’বার জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে লড়েছেন। এবারো দল যদি তাকে মনোনয়ন দেয়, তাহলে তিনি লড়বেন বলে জানান।
অপরদিকে বিএনপির কেন্দ্রীয় সহ-ধর্মবিষয়ক সম্পাদক অমলেন্দু দাস অপু গত ৬ ফেব্রয়ারি সন্ধ্যায় কেশবপুর প্রেসক্লাবে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে জানান, দল নির্বাচনে অংশ নিলে এ আসনে তিনি প্রার্থী হতে চান। এসময় তার সঙ্গে বেশ কয়েকজন নেতাকর্মী উপস্থিত ছিলেন।
যশোর-৬ সংসদীয় আসনটি বহুদিন বিএনপি-জামায়াতের দখলে ছিল। পরে এটি দখলে নেয় আওয়ামী লীগ। ১৯৭৯ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী হয়ে ধানের শীষ প্রতীকে গাজী এরশাদ আলি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এরপর ১৯৮৬ সালে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে আব্দুল হালিম এমপি হন। ১৯৮৮ সালে জাতীয় পার্টির অ্যাডভোকেট আব্দুল কাদের সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৯১ সালে জামায়াতের মনোনীত প্রার্থী মাওলানা সাখাওয়াত হোসেন জিতেছিলেন। ১৯৯৬-২০০১ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীকে এএসএইচকে সাদেক দুই বার নির্বাচিত হন। ২০০৮ সালে নৌকা প্রতীকে অভয়নগরের আব্দুল ওহাব জেতেন। ওই নির্বাচনের আগে সংসদীয় এলাকাটি পুনর্বিন্যাস হয়েছিল। ২০১৪ ও ২০১৮ সালের বিতর্কিত নির্বাচনে সাদেকের সহধর্মিনী ইসমাত আরা সাদেক দুইবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তার মৃত্যুর পর আসনটি শূন্য হয়েছে।
এদিকে ইসমাত আরা সাদেক সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর দলীয় নেতাকর্মীদের মূল্যায়ন করেননি বলে ব্যাপকভাবে অভিযোগ রয়েছে। ফলে কেশবপুর উপজেলা আওয়ামী লীগ দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে। এক পক্ষের নেতৃত্বে আছেন উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি এসএম রুহুল আমিন ও সাধারণ সম্পাদক গাজী গোলাম মোস্তফা। অপর পক্ষের নেতৃত্ব দিতেন প্রয়াত ইসমাত আরা সাদেক। ইসমাত আরা সাদেকের সঙ্গে ছিলেন উপজেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি তপনকুমার ঘোষ মন্টু ও তার বেশকিছু অনুসারী।
দলীয় সূত্রগুলো জানায়, তপনকুমার ঘোষ মন্টুসহ ছাত্রলীগ-যুবলীগের কয়েকজন নেতা ক্লিন ইমেজের হলেও অধিকাংশ নেতাকর্মী সুবিধাভোগী। অপরদিকে উপজেলা আওয়ামী লীগের ত্যাগী ও পোড় খাওয়া অধিকাংশ নেতাকর্মী ও সমর্থক দল ও অঙ্গসংগঠনগুলোর মূল স্রোতের সঙ্গেই আছেন। এরই মধ্যে গত বছর দলীয় হাই কমান্ডের নির্দেশে কেন্দ্রীয় নেতারা কেশবপুরে এসে সমঝোতার মাধ্যমে দুই পক্ষকে এক টেবিলে বসিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধ মীমাংশা করেন। কিছুদিন এক সঙ্গে চললেও ইসমাত আরা সাদেকের মৃত্যুর পর দলটির নেতাকর্মীরা ফের দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েন। তপনকুমার মন্টুর নেতৃত্বে থাকা নেতা-কর্মীরা কেশবপুরের উপ-নির্বাচনে ইসমাত আরা সাদেকের কন্যা আমেরিকায় কর্মরত প্রকৌশলী নওরিন সাদেকের পক্ষে অবস্থান নিয়ে উপজেলাব্যাপী মিটিং মিছিল ও গণসংযোগ করছেন। অপরদিকে, আওয়ামী লীগের মূল স্রোতে থাকা নেতা-কর্মী ও সমর্থকরা যশোর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শাহীন চাকলাদারের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। তারা চাকলাদারের পক্ষে শহরে মিছিল ও উপজেলাব্যাপী গণসংযোগ করছেন।
অন্যদিকে, শাবানার স্বামী ওয়াহিদ সাদেকের সঙ্গে রয়েছেন উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি সাবেক এমপি আব্দুল হালিমসহ তার অনুসারীরা।
দলীয় একাধিক সূত্র জানায়, গত প্রায় দুই যুগ ধরে কেশবপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সুখ-দুঃখের সাথী হয়ে সভাপতি হিসেবে সুনামের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে আসছেন এসএম রুহুল আমিন। তার সঙ্গে সাধারণ সম্পাদক হিসেবে আছেন গাজী গোলাম মোস্তফা। তাদের নেতৃত্বে দল বেশ সুসংগঠিত। নেতাকর্মীদের দাবি, স্থানীয় কোনো যোগ্য নেতাকে উপ-নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন দেওয়া হোক। এক্ষেত্রে শাহীন চাকলাদার হলে ভালো হয় বলে তাদের অভিমত।
এদিকে একাধিকবার রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকা বিএনপির সাংগঠনিক অবস্থা কেশবপুরে মোটেও ভালো যাচ্ছে না। মামলার ভয়ে রাজপথে নামেন না অধিকাংশ নেতা-কর্মী। কেন্দ্রঘোষিত কর্মসূচি পালিত হয় দলীয় কার্যালয়ে। দলটির হাল ধরে রেখেছেন উপজেলা বিএনপির সভাপতি আবুল হোসেন আজাদ। ব্যবসায়ী এই নেতা ঢাকার বাসিন্দা হলেও নিয়মিত আসেন নির্বাচনী এলাকায়।
যশোর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সদর উপজেলা চেয়ারম্যান শাহীন চাকলাদার বলেন, কেশবপুরের আওয়ামী লীগ এবং দলীয় প্রধান শেখ হাসিনা তাকে যোগ্য মনে করে যদি মনোনয়ন দেন তাহলে তিনি নির্বাচনে অংশ নেবেন। এখান থেকে তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হলে দল এবং কেশবপুরের উন্নয়নের জন্য সব কিছুই করবেন।
উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি এসএম রুহুল আমিন বলেন, দলীয় নেতাকর্মী ও সমর্থকরা স্থানীয় কোনো নেতা অথবা জেলার সাধারণ সম্পাদক শাহীন চাকলাদারকে প্রার্থী করার পক্ষে। তবে নেত্রী যাকে যোগ্য মনে করে মনোনয়ন দেবেন তার জন্য তিনি কাজ করবেন।
নওরিন সাদেক বলেন, তিনি দলীয় প্রধান শেখ হাসিনার কাছে মনোনয়ন চেয়েছেন। নেত্রী তাকে মনোনয়ন দিলে কেশবপুরের উপ-নির্বাাচনে অংশ নেবেন তিনি। জনগণ তাকে চাইলে তার বাবা-মায়ের অসমাপ্ত কাজ তিনি আগে করবেন।
ওয়াহিদ সাদেক বলেন, প্রধানমন্ত্রী ও দলীয় প্রধান শেখ হাসিনা যশোর-৬ কেশবপুরের উপ-নির্বাচনে তাকে মনোনয়ন দেবেন বলে জানিয়েছেন। তার অনুমতি নিয়েই কেশবপুরের প্রতিটি এলাকায় মিটিং এবং গণসংযোগ করছেন। ভোটাররা সাড়াও দিচ্ছেন দাবি করেন তিনি।
কেশবপুর উপজেলা বিএনপির সভাপতি কেন্দ্রীয় নেতা আবুল হোসেন আজাদ বলেন, দল যদি উপ-নির্বাচন করার সিদ্ধান্ত নেয়, আর দল যদি তাকে মনোনয়ন দেয় তা হলে তিনি প্রার্থী হয়ে নির্বাচনে অংশ নেবেন। তবে তিনি ভোট সুষ্ঠু হওয়া নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেন।
বিএনপির কেন্দ্রীয় সহ-ধর্মবিষয়ক সম্পাদক অমলেন্দু দাস অপু বলেন, তিনি নির্বাচন করতে ইচ্ছুক। তবে দল যদি তাকে মনোনয়ন দেয়, তবেই তিনি নির্বাচনে অংশ নেবেন।

আরও পড়ুন