কোটি টাকার গাছ লোপাট, বঞ্চিত উপকারভোগীরা

আপডেট: 09:00:15 05/09/2020



img

মৌসুমী নিলু, নড়াইল : নড়াইলে-যশোর সড়কের দুই পাশে ‘সামাজিক বনায়ন কর্মসূচির’ মাধ্যমে লাগানো গাছ কেটে বিক্রি করে দিয়েছেন তুলারামপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মো. বুলবুল আহম্মেদ। কখনো দিনে কখনো রাতে, কখনো ভুয়া টেন্ডার দেখিয়ে।
এতে বঞ্চিত হচ্ছেন গাছের প্রকৃত মালিক উপকারভোগীরা। স্থানীয় প্রশাসন আর বনবিভাগের যোগসাজসে সড়কের পাশের কোটি টাকা গাছের নামমাত্র মূল্য দেখিয়ে অর্থ লোপাট হয়ে যাচ্ছে।
নড়াইল-যশোর সড়কের পাশে তুলারামপুর-মাইজপাড়া দশ কিলোমিটার সড়ক। সড়কটি বর্তমানে সড়ক ও জনপথ বিভাগের আওতায় হলেও এর পূর্ববর্তী মালিকানা ছিল এলজিইডির। নড়াইল-যশোর সড়কের তুলারামপুর ইউপি অংশের সাড়ে পাঁচ কিমি সরকারি খাস জমির ওপর লাগানো এক হাজার গাছের অধিকাংশই নিজেদের ইচ্ছামতো কেটে নিয়ে গেছেন প্রভাবশালীরা। সবশেষ ৩৭১টি বড় গাছের ভুয়া টেন্ডার তৈরি করে তা কাটা শুরু হয়েছে। স্থানীয় প্রশাসনের নাকের ডগায় কোটি টাকা দামের এসব গাছ মাত্র ১৩ লাখ টাকায় টেন্ডার ধরে অর্থ লোপাটের প্রক্রিয়া শুরু হয়। ১৭ দিনে প্রায় ২০০ গাছ কাটার পরে জেলা প্রশাসনের নজরে এলে টেন্ডার প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগে গাছ কাটা বন্ধ করে দেওয়া হয়। নিয়মবহির্ভূত এসকল টেন্ডারের অভিযোগ তুলারামপুর ইউপি চেয়ারম্যান মো. বুলবুল আহমেদের বিরুদ্ধে।
স্থানীয়রা জানান, সড়কের পাশে থাকা প্রায় ৫০০টি বড় মেহগনি, কড়াই, শিশুগাছের প্রতিটির দাম ২০ থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত। সেই হিসেবে ২৫ হাজার টাকা গড় দাম ধরলে গাছের দাম পড়ে প্রায় কোটি টাকা। অথচ বনবিভাগের সাথে যোগসাজসে ৩৭১টি গাছের মোট দাম ধরা হয়েছে ১৩ লাখ ৬৩ হাজার গড়ে প্রতিটি সাড়ে তিন হাজার টাকা। মাস খানেক আগে ইউপি চেয়ারম্যানের অভিযোগ বাক্সে টেন্ডার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেন ইউপি চেয়ারম্যান।
তুলারামপুর ইউপি চেয়ারম্যান মো. বুলবুল আহমেদের দাবি কোনো অনিয়ম হয়নি। তিনি বলেন, ‘গত দুই বছর ধরে এই সব গাছ বনবিভাগের মাধ্যমে মার্কিং করা হয়। এরপর গাছের মূল্য নির্ধারণ করে দেয় বনবিভাগ। এরপর যশোর সামাজিক বনবিভাগ, সড়ক ও জনপথ বিভাগ ঘুরে সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আমাকে টেন্ডারের অনুমোদন দেয়। স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের উপস্থিতিতে টেন্ডার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়।’
তুলারামপুর ইউনিয়ন পরিষদ সূত্রে জানা গেছে, ১৯৯৮ সালে তুলারামপুর মাইজপাড়া সড়কের সাড়ে পাঁচ কিলোমিটার অংশে এক হাজার গাছ রোপণ করা হয়। এলজিইডি, ইউনিয়ন পরিষদ, কেয়ার বাংলাদেশের পক্ষে গণসাহায্য সংস্থা এবং উপকারভোগীদের নিয়ে একটি চুক্তিনামা করা হয়। সেই চুক্তিতে ইউনিয়ন পরিষদ ৪০ ভাগ, উপকারভোগী ও জায়গার মালিক ৫০ ভাগ এবং এনজিও পাবে ১০ ভাগ। এই চুক্তি সামাজিক বনায়নের নিয়মবহিভর্‚ত হলেও চুক্তিতে থাকা এনজিও ও উপকারভোগীদের কোনো তথ্য না দিয়েই চেয়ারম্যান নিজের খেয়ালখুশি মতো অর্থ লোপাটের আশায় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে ‘ম্যানেজ’ করে গাছ কাটা শুরু করেন।
সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সালমা সেলিম বলেন, ‘এলজিইডির সাথে একটি চুক্তির ভিত্তিতে আমরা বনবিভাগের সাথে উপজেলা পর্যায়ে সভা করি। সড়ক বিভাগের একটি পত্রের ভিত্তিতে উপজেলা পর্যায়ে সভা হলেও জেলা পর্যায়ে সভা হয়নি। তবে, চেয়ারম্যান আমাকে না জানিয়েই টেন্ডার করেছেন। এখন ডিসি স্যার যে সিদ্ধান্ত নেবেন তাই হবে।’
১৯৯৮ সালে তুলারামপুর-মাইজপাড়া সড়কের সাড়ে পাঁট কিলোমিটার রাস্তার দুই পাশে সামাজিক বনায়নের আওতায় এক হাজার গাছ লাগানো হয়। ২২ বছরে প্রতিটি গাছের মূল্য ২০ থেকে ৫০ হাজার হলেও বনবিভাগ গড়ে দাম ধরেছে সাড়ে তিন হাজার টাকা। এই মূল্যে হতবাক গাছ সংরক্ষণকারী, যাদের গাছ বিক্রির ৫৫ ভাগ টাকা পাবার কথা।
মালিডাঙ্গা গ্রামের সড়কের জমির মালিক মিজানুর রহমান বলেন, ‘চেয়ারম্যান গাছ কেটে বিক্রি করেছে অথচ আমরা বছরের পর বছর ধরে গাছ দেখাশুনা করলাম। আমাদের কোনো খবর দিলো না। তবে সাংবাদিক আসার পর গাছ কাটা বন্ধ হয়ে গেছে।’
নিজের জমিতে প্রায় ২০টি গাছ দেখাশোনা করেছেন মন্নু বিশ্বাস। তিনি বলেন, ‘আমার জমিতে ২০টির মতো গাছ ছিল। একেকটির দাম ২০ হাজার থেকে ৫০ হাজার পর্যন্ত। একটি টাকা তো পেলামই না, এখন শুনছি গাছ বিক্রি করেছে পানির দামে।
অভিযোগ আছে, নানা প্রক্রিয়ায় গাছের কম মূল্য নির্ধারণ করে ইউপি চেয়ারম্যানকে অর্থ লোপাটের সুযোগ করে দিয়েছে স্থানীয় বন বিভাগ। এতে ওই বিভাগের কর্মকর্তারাও আর্থিকভাবে লাভবান হয়েছেন। কম মূল্য ধরে চেয়ারম্যানের সহযোগী হিসেবে কাজ করেছেন তারা।
নড়াইল বন বিভাগের ফরেস্টার এস কে আব্দুর রশীদ এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘মানুষ বন বিভাগের নাম শুনলেই কেমন করে ওঠে। কিন্তু আমরা যে ধরনের গাছ পেয়েছি, সেই মূল্য ধরেছি। বাজারের দামের চেয়ে সরকারি মূল্য অনেক কম। তাই কম ধরা হয়েছে।’
এদিকে, রাস্তার জমির মালিকানা রাজস্ব বিভাগের বলে দাবি করে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে গাছ কাটা বন্ধ করে দেওয়া হয়। চুক্তি এবং টেন্ডার প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ বেআইনি বলে দাবি জেলা প্রশাসনের।
নড়াইলের জেলা প্রশাসক আনজুমান আরা জানান, সরকারি খাস জমির গাছ কাটা হচ্ছে- এই অভিযোগ পাওয়ার পর তা বন্ধ রাখা হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘সড়কের এই জায়গা জেলা প্রশাসনের। সুতরাং আমাকে বাদ দিয়ে কোনো চুক্তি থাকতে পারে না। আমরা মামলা করবো।’

আরও পড়ুন