খাতুনে জান্নাতের নয়টি কবিতা

আপডেট: 03:27:16 11/09/2020



img

জীবন-পাঠ

শব্দের উঁকিঝুঁকি- কলমে তৃতীয়া চাঁদ
কোঁচড়ে কলমী-শাক যে মেয়েটি
দাঁড়ায় অবেলা খিলানে হেলান-
চোখে কথকতা, বিস্ময় গ্রন্থিকা।
ওলানে-হাত লাথি খেয়ে বিহ্বল গোয়ালা-
সাপ সাপ
ঢালে বিষ জীবনের খোলা কলসিতে!
কী মায়ায় ডাকি-
'আয় আয় সোনামুখী সুঁই
গাঁথি বেদনা খসার চাবি'
নাকছাবি খুলে কার আরুদ্র সকাল
কেঁদে-কেঁদে যায় রাতের বাড়ি
ছুঁই তার বিন্যস্ত বিরহ,
আদি-অন্ত দাবি।
শব্দেরা লুকোচুরি খেলে
জ্বলছে আগুন
আগুনপোড়া হাত আগুন কীভাবে নেভায়!



যুবতী জ্যোৎস্নায়

নাড়ার আগুনে শীত ভাঙে যুবতীরা
উনুনের ভাপে রাখে ভেজা হাত
উষ্ণতা বেয়ে উষ্ণতা উঠে যায়
কোষ কলায় সঞ্চারী ধারাপাত...

শ্রাবণ ঝরছে অঘ্রান ডালে ডালে
ফাল্গুন চইত আড়াআড়ি চোখ মারে
গ্রীষ্মপ্রখর পোড়াবার কামনায়
পেড়োবাড়ি ধরে কোণাকোণি হেঁটে যায়...

ঢেউ ভাঙে ঢেউ স্রোত স্রোত টানে
দাঁতে কামড়ে ধরে আঁচলের খুঁট
রাতের ছায়ায় অমাবস্যা থমথম
দেহের পূর্ণিমা হতে চায় লুট...



পাতা ঝরার চমক

পাতা ঝরার শব্দে চমকে চাইলে
যেন বা শুনতে পাও পুরনো কম্পন
যখন স্পর্শ করে সকাল-সন্ধ্যা
চিরহরিৎ বনের পাশ দিয়ে বাঁকানো রাস্তায়
কয়েকটি থেমে যাওয়া মুহূর্ত ও তো
আঁজলা ভরে রাখে মুহূর্তকাল;
তোমার পিঠের কাছে জমানো ব্যথা
শরীরে প্রাগৈতিহাসিক ছায়া ও ইঁদুরের কঙ্কাল
তুমি কেটে যাচ্ছ আবহমান সুতো
শুধু নোঙ্গরে জমা হয় গুটিকয় মুহূর্তের
চমকে-ওঠা বার্তা…



ভোরের বেহালা

সকাল গাইছে বেদনা
মৃতদের জন্য কয়েক ছত্র শোক
কেন্দ্র ঝুলে পড়ে বৃত্ত থেকে
শিশুরা গিলছে গপাগপ ললিপপ
বৃষ্টির বেহালা বাজছে
ভাষা ছুটে যাচ্ছে মুখ ও কলম থেকে
ধূসর পাতা উল্টাচ্ছে প্রগাঢ় ধূসরতা
কেউ চাইছে না কারও দিকে
দেখছে গোর খোদক
ছায়াহীন পাথর গড়িয়ে পড়ছে...



যাবতীয় সন্তাপ

পথ চিনতে চিনতে সকাল গড়িয়ে ভোর...
বৈশাখ গুজরাতে গুজরাতে চৈত্রের খরায়
টেবিলে চায়ের বাষ্প, সিগারেটের ছাই।
কীটেরা মিলেমিশে গুছিয়ে নেয় সংসার।
বরফ গলনে কমে যায় ভূমি
এরই ফাঁকে কেউ কেউ লিখে ফেলে অগনিত প্রেমপদ্য।
রাতের নিস্তব্ধতা ভেদ করে পাহারাদারের সতর্কিত হুইসেল-
অথচ চুরি হয়ে যায় প্রতিদিনের মণিমুক্তো...
কারও কারও মতো আমরা টুপিতে ঢাকি
অন্ধকার ও যাবতীয় সন্তাপ...



গোলকধাঁধা

হেঁটে যাচ্ছে পা
পা’র নীচে মাটি নেই
তবে কি বাতাস!
বিশাল বাংলাদেশ পড়ে আছে একাত্তরে
সমুদ্র পা’র কাছে চলে এলো বলে!
গোবরে পোকা উড়তে শুরু করেছে
নড়ছে উঁইয়ের ডিবি
আমরা কার কাছে যাবো?
গন্তব্য জানা নেই অর্বাচীন মনের!
রাজাকার মুক্তিযোদ্ধা না মুক্তিযোদ্ধা রাজাকার-
চিনতে চিনতে কেটে গেছে পঞ্চাশ বছর।
কোনো খেলাই হলো না শেষ
খেলছি তো গোলকধাঁধা খেলা
এখন দেখছি করোনার খেলাধুলা...
করোনাও আমলাতান্ত্রিক ভাইরাস
শেষ হয়ে হইলো না শেষ...



ন আর্য

হাজার বছর ধরে বেড়ে ওঠা
অনার্য জাতির দুঃখ আজও মহীরুহ;
রক্ত-ভূমি ফুঁড়ে তুলে রাখে মাথা।
পূর্ব-জনের ভিটিবালির উত্তাপে-
বোবা-কান্নার কীর্তিনাশা স্রোত
ঝলমল বর্তমান পাঁজরে ক্রীতদাসের দগদগে ঘা।
শিল্প-মলম মেখে জীবন জরায়ু মালিশ করে করে
রোগ, শোক, ক্ষুধা, বিড়ম্বনা প্রহার পেয়ে পেয়ে
যেতে হবে কত পথ কে বা জানে...



আবর্তিত

ছুঁতে পারছি না তোমার স্পর্শ—হে নিস্তব্ধতা
আকর্ষি হ’য়ে জড়ায় অস্থিরতা
আঙুলের সঙ্গমে যে কলম তার নিবে লেপে আছে চিরহরিৎ রক্ত
লেখনি বেপথু হবার পথে আবর্তিত প্রায়...
যেমন বৃত্তের আলিঙ্গনে জড়ানো বৃত্ত
প্রেমালিঙ্গনে চতুরতা
মাছির ঘোঙানিতে মাতোয়ারা চেনা জানা
গড়িয়ে পড়া ভুলের ঝনাৎকার
হ্রস্বস্বরে হারানো স্বরলিপি সমাচার…
ছুঁতে পারছি না তোমার স্পর্শ— হে নির্জনতা
দূরে ঠেলে দেয়া অক্ষরের অহংকার ঝেড়ে
নিকোটিনের টানে কেবল ধোঁয়া আর ধোঁয়া
ঠোঁটের কিনারে চোটের বাড়াবাড়ি
দাঁতে চেপে ধরা ঘা থেকে গড়িয়ে পড়ে কাল, মহাকাল...



তোমার ফাগুন চোখ
.
তোমার ফাগুন চোখ জেগে
এই শিল্পিত কল্পিত কাননে
সিঁদুরের ছায়াঘন আলো যেন সিঁথির ছায়ায়...
ফাগুন কি ফোটায় ফুল দূরতম গ্রাম, মরুপথে!
ফাগুন কি অপেক্ষা জ্বালে যেখানে নদীর ডাক,
বটের ঝুরি নুয়ে ছুঁয়ে দেয় অনুপ্রাসকাল!

[পরিচিতি: কবি, সাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক, অনুবাদক, গীতিকার খাতুনে জান্নাত-এর জন্ম ১২ জুলাই ১৯৬৯ খ্রিস্টাব্দ। সিলেট জেলার ফেঞ্চুগঞ্জে। তবে স্থায়ী ঠিকানা লক্ষ্মীপুর জেলার গোপীনাথপুর গ্রামে। ভালোবাসেন মানুষ ও প্রকৃতি; দুর্বলের প্রতি সহিংসতা ও অভিন্নতার মুক্তি চান তিনি। কবিতাগ্রন্থ চারটি ও একটি উপন্যাস (কিশোর)। নির্বাচিত কবিতার অনুবাদ গ্রন্থ রয়েছে। অনুবাদ ব্রজেন চৌধুরী। পুরোপুরি লেখা শুরু ২০০৮ থেকে। লিটলম্যাগ ও জাতীয় দৈনিকে নিয়মিত লিখছেন। বাংলাদেশ ভারত, যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন দেশের পত্রিকায় বাংলা কবিতা ও তাঁর কবিতার ইংরেজি অনুবাদ কবিতা প্রকাশিত হচ্ছে। কবিতার বই নিয়ে আলোচনা করেছেন বিভিন্ন গুণীজন। সখ: ছবি আঁকা। ২০টির অধিক তৈলচিত্র রয়েছে। গান, শিশুতোষ ছড়া, সাহিত্য ও নারী বিষয়ক প্রবন্ধ ও নিবন্ধ লিখেছেন।]