খামারিদের হতাশা

আপডেট: 04:40:03 24/07/2020



img
img

স্টাফ রিপোর্টার, বেনাপোল (যশোর) : করোনার প্রাদুর্ভাবে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সবচেয়ে বড় পশুর হাট যশোরের সাতমাইলে বেচাকেনা নেই বললেই চলে। অথচ হাটে উঠছে উল্লেখযোগ্য পশু।
হাটে ক্রেতারা গরু কিনে খুশি হলেও বিক্রেতারা খুশি হতে পারছেন না। খামারিরা বলছেন, গরু পালনে খরচের তুলনায় এ বছর লাভ হচ্ছে না। আর যদি ভারতীয় গরু আসে, তাহলে স্থানীয় খামারিরা চরম ক্ষতির সম্মুখীন হবেন।
যশোর জেলা শহর থেকে ৩৭ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে যশোর-সাতক্ষীরা মহাসড়কের পাশে বসে এই অঞ্চলের বৃহত্তম সাতমাইল পশুহাট। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে পাইকাররা এসে এই হাট থেকে গরু কিনে নিয়ে যান।
হাটের ইজারাদার নাজমুল হাসান বলেন, কুষ্টিয়া, ফরিদপুর, সিরাজগঞ্জ, টাঙ্গাইল, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, ঝিনাইদহ, রাজশাহী, চট্টগ্রাম, ঢাকাসহ অন্তত ২০টি জেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ব্যাপারিরা আসেন এ হাটে। কিন্তু এবার তারা এখনো খুবএকটা আসেননি। তাই বেচাকেনা কম। খামারিরা বিক্রির উদ্দেশে হাটে গরু নিয়ে গেলেও দিনশেষে পশুসহই ফিরে যাচ্ছেন বাড়িতে।
খামারিরা বলছেন, এবার পরিস্থিতিগত কারণে কুরবানি নিয়ে মানুষের মধ্যে আগ্রহ অনেক কম। গত বছর এই সময়ে রাস্তায়, হাটে, খামারে ক্রেতারা কুরবানির জন্যে ঘোরাঘুরি করেছেন, কিন্তু এবার কারোরই দেখা মিলছে না।
শার্শার নারায়ণপুর গ্রামের খামারি আনিছুর রহমান সাতমাইল হাটে গরু এনে দুপুর নাগাদ বিক্রি করতে পারেননি।
আনিছুর বলেন, ‘অন্যান্য বছর কুরবানির এক মাস আগে থেকেই বাড়ি বাড়ি ঘুরে ব্যাপারিরা গরু কিনেছেন। এবার একটা ব্যাপারিও আসেনি। করোনাভাইরাস নিয়ে সবাই আতঙ্কের মধ্যে আছে।’
তিনি বলেন, দাম কম, ক্রেতা নেই। দেনা করে গরু পাললাম। এখন দাম পাচ্ছিনে। গত বছর বন্যার কারণে লাভ হয়নি। আর এবার দেশের যে অবস্থা, তাতে চালানটাই বাঁচবে কি-না সন্দেহ।’
নারায়ণগঞ্জের মাহফুজুর রহমান মাহফুজ ব্যাপারি প্রতিবছর প্রতিহাটে অন্তত পাঁচ ট্রাক গরু কিনলেও মঙ্গলবারের হাটে তিনি মাত্র দুই ট্রাক গরু কিনেছেন বলে জানালেন। এবার বিভিন্ন এলাকায় করোনা ও বন্যার কারণে পশুর চাহিদা কম। দামও তুলনামূলক অনেক কম।
ঢাকার রাসেল ব্যাপারি বলেন, মঙ্গলবার হাটে দুপুর পর্যন্ত তিনি ২৫টি গরু কিনেছেন। এর মধ্যে ২০টি গরু দিয়ে একটি ট্রাক ঢাকার গাবতলী হাটে পাঠিয়েছেন। বাজারের অবস্থা বোঝার চেষ্টা করছেন। ভালো হলে আরো দুই ট্রাক পাঠানোর প্রস্তুতি রয়েছে তার। এসব গরু ৭০ হাজার থেকে দেড় লাখ টাকায় বিক্রি করবেন বলে তিনি জানান।
শার্শার খামারি আখতারুজামান বলেন, ‘গ্রামেও এখন গরু সস্তা, নেওয়ার লোক নেই। যে গরুগুলো হাটে আনিছি গত বছর এই মাপের গরু ৬০-৬৫ হাজার টাকায় বিক্রি হয়েছে। এবার ৪৫-৪৮ হাজারের ওপর দাম ওঠেনি। এই দামে গরু বিক্রি করলে লস হবে। তবে ভাবছি, চালানটা তোলার জন্য। চালান হাতে এলেই গরু বিক্রি করে বাড়ি চলে যাব।’
কুরবানির গরু কিনতে আসা বেনাপোলের কামরুজ্জামান বলেন, এ হাটে প্রচুর গরু আছে। কিন্তু ব্যবসায়ীরা গরুর দাম কমাচ্ছে না। যে কারণে বেচাবিক্রি একটু কম।
সামটার ইকবাল হোসেন বলেন, সাড়ে চার মণ মাংস হতে পারে- এমন একটা গরু কিনেছেন ৭৫ হাজার ৫০০ টাকায়। অন্য সময় এর দাম লাখের বেশি হতো। কম দামে গরু কিনতে পেরে বেজায় খুশি তিনি।
ঝিকরগাছার দেউলি গ্রামের আব্দুস সামাদ চার মণ মাংস হতে পারে- এমন একটি গরু কিনেছেন ৬৭ হাজার টাকায়।
বেনাপোলের নামাজ গ্রামের আবু নিদাল ফয়সল একটি ষাঁড় কিনেছেন ৮০ হাজার টাকায়। তিনি বলেন, হাটে মাঝারি গরুর চাহিদা বেশি হওয়ায় দাম কিছুটা বেশি। তবে বড় গরুর দাম তুলনামূলক অনেক কম।
হাট কমিটির সভাপতি স্থানীয় চেয়ারম্যান ইলিয়াছ কবির বকুল বলেন, এই হাটে ক্রেতা-বিক্রেতাদের থাকা-খাওয়া সুব্যবস্থা রয়েছে। পশুর স্বাস্থ্য পরীক্ষায় সতর্ক থাকায় এখানে সুস্থ ও মানসম্মত পশু পাওয়া যায়। নিরাপত্তা দিতে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সর্বদা নিয়োজিত রয়েছে। করোনার কারণে হাটে জীবাণুনাশক স্প্রে করা হচ্ছে। হাত ধোওয়ার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এখানে শনি ও মঙ্গলবার সপ্তাহে দুই দিন হাট বসে।’
খামারিদের হতাশা সম্পর্কে শার্শা উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মাসুমা আখতার বলেন, এ বছর এ উপজেলায় ৯৯০ জন খামারি তিন হাজার ৬৪৫টি ষাঁড়, ৬০২টি বলদ, দুই হাজার ৮৪১টি ছাগলসহ মোট সাত হাজার ১৭৮টি গরুছাগল কুরবানির জন্য প্রস্তুুত করেছেন, যা উপজেলার চাহিদার দ্বিগুণ। কিন্তু ক্রেতার অভাবে বেচাকেনা কম। স্বাস্থ্যবিধি মেনে ব্যবসায়ী ও ক্রেতারা যাতে হাটে আসে সেদিকে লক্ষ্য রাখা হচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘খামারিরা খরচের টাকাও তুলতে পারছেন না বলে খবর পাচ্ছি। লোকসানের বোঝা মাথায় নিয়ে বাড়ি ফিরছেন।’

আরও পড়ুন