গাছফড়িং খেয়ে ফেলছে ধান

আপডেট: 03:49:28 29/10/2019



img
img

তারেক মাহমুদ, কালীগঞ্জ (ঝিনাইদহ) : ঝিনাইদহের মাঠে মাঠে আমন ধানের ক্ষেতে বাদামি গাছফড়িং বা কারেন্ট পোকার আক্রমণ দেখা দিয়েছে। গত কয়েকদিনের মধ্যে জেলার সব উপজেলার মাঠের পর মাঠ ধানক্ষেতে ছড়িয়ে পড়েছে এই ফড়িং। অনেকের জমিতে পোকার আক্রমণে ধান বিবর্ণ হয়ে যাচ্ছে। অনেকের ক্ষেতে আক্রমণ শুরু করেছে। ফলে দিশেহারা হয়ে পড়েছে কৃষক।
কৃষকদের আপদকালীন এই সময়ে কৃষি অফিসের কোনো কর্মকর্তা মাঠ পর্যায়ে কৃষকদের পাশে দাঁড়াননি বলে অভিযোগ। তবে বিভিন্ন ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিরা সকাল-বিকেল খোঁজ নিচ্ছেন ও নানা পরামর্শ দিচ্ছেন বলে জানিয়েছেন কৃষকরা। এই ক্ষেত্রে কোম্পানিগুলোর ব্যবসায়িক স্বার্থ কাজ করছে।
কৃষি অফিস পোকা আক্রমণের কথা স্বীকার করলেও তা নিয়ন্ত্রণে আছে বলে দাবি করে জানাচ্ছে, ধানের ফলনে এর তেমন প্রভাব পড়বে না।
দেখতে ছোট ছোট বাদামি পোকার মতো এই ফড়িং ধানগাছের রস চুষে নিচ্ছে। ফলে দুই ধেকে তিন দিনের মধ্যে ধান গাছ মরে হলুদ রং ধারণ করছে। এ পোকা প্রথমে ধান গাছের গোড়ায় আক্রমণ করায় কীটনাশক ছিটিয়েও দ্রুত দমন করা সম্ভব হয় না। কোনো এলাকায় আক্রমণ হলে দু-এক দিনের মধ্যে তা দ্রুত মাঠের পর মাঠ ছড়িয়ে পড়তে পারে। যে কারণে একে ‘কারেন্ট পোকা’ বলে।
কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, চলতি রোপা আমন মৌসুমে ঝিনাইদহ জেলায় এক লাখ পাঁচ হাজার ৬৪৬ হেক্টর জমিতে ধান চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। বিপরীতে চাষ হয়েছে এক লাখ চার হাজার ১২৫ হেক্টর জমিতে। বেশিরভাগ জমিতে চাষ হয়েছে স্বর্ণা জাতের ধান। এছাড়াও রয়েছে ব্রি-৪৯ জাত।
কৃষি বিভাগের হিসেবে, চাষ হওয়া জমি থেকে চার লাখ ৬২ হাজার ৪৪৩ মেট্রিক টন ধান উৎপাদিত হওয়ার কথা। এ ধান থেকে তিন লাখ ৫৮৮ টন চাল উৎপাদন হবে। হিসেব অনুযায়ী, প্রতি একরে ধান উৎপাদন হওয়ার কথা ৪৫ মণ।
কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ধানের সঠিক পরিচর্যা ও রোগ বালাই দমনে তারা বিভিন্ন প্রকার কীটনাশক ব্যবহার করেন। বর্তমানে কোনো কোনো জমিকে ধানের শীষ বের হয়েছে। কিছু কিছু জমিতে ধান পাকতে শুরু করেছে। কিন্তু হঠাৎ কারেন্ট পোকার আক্রমণ দেখা দেওয়ায় দিশেহারা হয়ে পড়েছেন চাষিরা।
কৃষকরা অভিযোগ করছেন, মাঠের পর মাঠ পোকায় ছেয়ে গেলেও সংশ্লিষ্ট উপজেলা কৃষি অফিসের কোনো কর্মকর্তা বা মাঠকর্মীদের দেখা মিলছে না। গত কয়েকদিনে কৃষি অফিসের কাউকে দেখা যায়নি। ফলে তাদের কাছ থেকে কোনো পরামর্শ বা সহযোগিতা পাওয়া যায়নি। তবে, বিভিন্ন ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিরা প্রতিদিন সকাল-বিকেল এসে খোঁজ নিচ্ছেন। কী ওষুধ দিতে হবে, কী পরিমাণ, দিতে হবে তা দেখিয়ে দিচ্ছেন সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর প্রতিনিধিরা। ব্যবসায়িক স্বার্থেই কোম্পানি প্রতিনিধিরা এই কাজে মনোযোগ দিচ্ছেন বলে সবাই নিশ্চিত।
তবে, কৃষি কর্মকর্তারা তাদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ স্বীকার করছেন না। তাদের দাবি, তারা ইউনিয়ন ও মাঠ পর্যায়ে রোগবালাই প্রতিরোধ ও রোগ বালাই দমনে নানা কৌশল এবং ওষুধের ব্যবহার বিষয়ে কৃষকদের ধারণা দিয়ে উঠান বৈঠক, লিফলেট বিতরণ করে যাচ্ছেন।
কালীগঞ্জ উপজেলার উল্লাহ গ্রামের কৃষক ফিরোজ হোসেন বলেন, ‘আমি এ বছর ১৪ বিঘা জমিতে আমন ধানের চাষ করেছি। সব ধান ক্ষেতে থোড় বা শীষ বের হচ্ছে। অনেক ক্ষেতে শীষ বের হওয়া শেষ হয়েছে। এমন সময় হঠাৎ পোকার আক্রমণ শুরু হয়েছে। এখন সব ক্ষেতে ওষুধ দিতে হচ্ছে। গত কয়েক দিনে কোনো কৃষি কর্মকর্তাকে দেখা না গেলেও বায়ার ও সিনজেন্টা নামের দুটি কীটনাশক কোম্পানির প্রতিনিধিরা নিয়মিত খোঁজ-খবর নিচ্ছে।’
ঝিনাইদহ সদর উপজেলার ভিটশ্বর গ্রামের কৃষক শরিফুর ইসলাম ও মন্টু দফাদার জানান, পোকা আক্রমণের পর থেকে ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিরা প্রতিদিন গ্রামের মোড়ে মোড়ে এসে কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে পরামর্শ দিচ্ছেন। কিন্তু এখনো পর্যন্ত কোনো কৃষি কর্মকর্তা এলাকায় আসেননি।
এদিকে, ঝিনাইদহ সদর উপজেলার হলিধানী এলাকা ঘুরে জাগো নিউজের ঝিনাইদহ প্রতিনিধি আব্দুল্লাহ আল মাসুদ বলছেন, কারেন্ট পোকার আক্রমণে এলাকার ধানচাষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রায় সব ক্ষেতেই এই পোকার আক্রমণ দেখা দিয়েছে। ফলে কৃষকদের চরম উৎকন্ঠায় দেখা গেছে।
এ বিষয়ে ঝিনাইদহের কৃষি বিভাগের উপ-পরিচালক আব্দুর রউফ জানান, দিনে গরম রাতে শীত এবং গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি হলে এই পোকার আক্রমণ বাড়ে।
‘আমরা শুরু থেকে গ্রামে গ্রামে উঠান বৈঠক ও হাজার হাজার লিফলেট বিতরণ করে কৃষকদের সচেতন করার চেষ্টা করেছি। কিন্তু ধানের দাম কম হওয়ায় প্রথমে কৃষকরা গুরুত্ব দেয়নি।’
পোকার আক্রমণ বেশি হলেও তা নিয়ন্ত্রণে আছে বলে দাবি এই কৃষি কর্মকর্তার।

আরও পড়ুন