গাছের পাতায় জীবিকা

আপডেট: 10:38:28 13/02/2020



img
img

বিশেষ প্রতিনিধি, ঝিনাইদহ : গাছের পাতা বিক্রি করেন কৃষক জয়নুদ্দিন খাঁ। এই পাতা বিক্রির টাকায় সংসারে সচ্ছলতা এসেছে। মাত্র ৪০ হাজার টাকা পুঁজিতে বছরে প্রায় পাঁচ লাখ টাকার পাতা বিক্রি করেন তিনি। এই পাতা অন্য দশটি গাছের পাতা নয়, এটি মশলা জাতীয় ফসল তেজপাতা; যা বাণিজ্যিকভিত্তিতে চাষ করছেন ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার কাদিরকোল গ্রামের কৃষক জয়নুদ্দিন খাঁ।
কৃষক জয়নুদ্দিনের কাছ থেকে জানা যায়, ২০০৮ সালে তিনি মাত্র এক বিঘা জমিতে শ’খানেক গাছ লাগানোর মাধ্যমে এই চাষ শুরু করেছিলেন। বর্তমানে তার চার বিঘায় প্রায় ৪০০ গাছ রয়েছে। এখন তাকে অনুসরণ করছেন গ্রামের আরো দুই কৃষক।
কালীগঞ্জ উপজেলার সুন্দরপুর-দুর্গাপুর ইউনিয়নের কাদিরকোল গ্রামে গিয়ে কথা হয় কৃষক জয়নুদ্দিনের সঙ্গে।
তিনি জানান, ২০০৭ সালে ভারতে বেড়াতে গিয়েছিলেন। সেখানে এই তেজপাতার চাষ দেখেন। তারও খুব আগ্রহ হয় তেজপাতা চাষের। কিন্তু কোথাও চারা পাচ্ছিলেন না। এমন সময় তার এক বন্ধু খবর দেন, এই চারা খুলনার বেজেরডাঙ্গা এলাকায় পাওয়া যায়। ২০০৮ সালে বেজেরডাঙ্গা থেকে চারা সংগ্রহ করেন।
জয়নুদ্দিন জানান, ওই বছর ২০০ টাকা পিচ দরে ১০০ চারা কিনেছিলেন। এগুলো বাড়ির পাশের জমিতে রোপণ করেন। এরপর পরিচর্যা করতে থাকেন গাছগুলো। এভাবে চার বছর পেরিয়ে গেলে গাছের ডাল পাতায় ভরে যায়। তখনই পাতা ভাঙতে শুরু করেন। সেই থেকে তিনি প্রতিবছর দুইবার গাছ থেকে পাতা ভেঙে বিক্রি করেন। ভালজনক হওয়ায় আরো গাছ লাগিয়েছেন পর্যায়ক্রমে। বর্তমানে তার চার বিঘা জমিতে প্রায় ৪০০ তেজপাতাগাছ রয়েছে। ৪৬ শতাংশে বিঘা হিসেবে প্রতি বিঘায় চারা রোপণ করা যায় গড়ে ১০০টি। প্রতিবছর তেজপাতা চাষ বাড়াচ্ছেন এই সফল চাষি।
কৃষক জয়নুদ্দিন খাঁ জানান, তেজপাতা চাষ করতে হলে জমিতে নামমাত্র চাষ দিয়ে নিতে হয়। এরপর সেখানে জৈব সার ছিটিয়ে দিতে হয়। তারপর সামান্য পরিমাণ রাসায়নিক সার দিয়ে চারা লাগাতে হয়। এই গাছ ছাগল-গরুতে খায় না। পাতা গাছের ডালে ডালে থাকায় চুরি হওয়ার আশঙ্কাও কম থাকে। চারা রোপণের চার বছর পর থেকে পাতা সংগ্রহ করা যায়। এভাবে একাধারে ৫০ বছর পর্যন্ত পাতা পাওয়া যাবে। বর্তমানে তার প্রতিটি গাছে বছরে গড়ে ২০ কেজি করে পাতা হয়; যা বাজারে ৬০ টাকা দরে বিক্রি করা যায়। এতে তার ৪০০ গাছে প্রায় পাঁচ লাখ টাকার পাতা বিক্রি হয়। এই পাতা পেতে বর্তমানে তার খরচ হয় গাছ প্রতি ১০০ টাকার মতো।
তিনি বলেন, তেজপাতা চাষে পরিশ্রম কম। আর একবার রোপণ করলে দীর্ঘ সময় ফলন পাওয়া যায়। তাই তিনি বাণিজ্যিকভিত্তিতে এই চাষ করছেন। তিন মণ পাতা বিক্রির মাধ্যমে তার হাতে টাকা আসতে শুরু করে। আগামী মৌসুমে ২০ মণ পাতা বিক্রি করা যাবে বলে তার আশা।
জয়নুদ্দিন খাঁ পেশায় কৃষক। মাঠে তার ১৮ বিঘা চাষযোগ্য জমি আছে। তার তিন মেয়ে আর এক ছেলে। মেয়ে রাজিয়া খাতুন, রুজিয়া খাতুন ও কাজল পারভিনকে বিয়ে দিয়েছেন। একমাত্র ছেলে জাকির হোসেনও বিয়ে করেছেন। ছেলে একটি বেসরকারি কোম্পানিতে চাকরি নিয়ে ঢাকায় থাকেন। জয়নুদ্দিন খাঁ তার স্ত্রী রাবেয়া খাতুনকে সঙ্গে নিয়ে গ্রামের বাড়িতে বসবাস করছেন। ইতিপূর্বে কাঁচা বাড়িতে থাকলেও বর্তমানে একতলা পাকা বাড়ি করেছেন। তেজপাতা চাষ করে সংসারে সচ্ছলতা এনেছেন। এক সময় মাঠে চাষযোগ্য জমি থাকা সত্ত্বেও ভালো ফসল ফলাতে না পেরে কষ্টে জীবন কাটাতে হয়েছে। এখন আর কোনো কিছুর জন্য কারো কাছে হাত পাততে হয় না।
জয়নুদ্দিন খাঁ জানান, তেজপাতার কোনো ফল হয় না। আবার কলম করেও চারা তৈরি করা যায় না। এর জন্য কাবাব চিনির গাছ প্রয়োজন। কাবাব চিনির ফল থেকে চারা তৈরি হয়। সেই চারায় কলমের মাধ্যমে তৈরি হয় তেজপাতাগাছ।
কাদিরকোল গ্রামের আবুল কালাম জানান, জয়নুদ্দিনকে দেখে তিনিও এই তেজপাতা চাষ শুরু করেছেন। প্রথম বছর ৩৫ শতক জমিতে চাষ করেছেন। ভালো পাতাও পাচ্ছেন। আগামীতে আরো বেশি চাষ করার ইচ্ছা রয়েছে এই কৃষকের।
আরেক কৃষক মিজানুর রহমানও বাড়ির আঙিনায় দশ শতক জমিতে তেজপাতা চাষ করেছেন।
এ বিষয়ে ঝিনাইদহ কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উপ-পরিচালক কৃপাংশুকুমার জানান, এটা খুবই লাভজনক ফসল। এই চাষ এ অঞ্চলের মানুষ বাণিজ্যিকভিত্তিতে করেন না; কাদিরকোল গ্রামের কৃষক জয়নুদ্দিন খাঁ করছেন। জয়নুদ্দিনকে তারা নানাভাবে সহযোগিতা করছেন বলে জানান।

আরও পড়ুন