গান কী

আপডেট: 02:04:12 10/07/2020



img

গোলাম মুরশিদ

আবেগ মেশানো কথাকে বলে গান। তাই বলে কথার সঙ্গে আবেগ মেশালেই সেটা গান হয় না। কেননা, আবেগটা বেজায় রাগের হতে পারে, তীব্র ঘৃণার হতে পারে। একটা উদাহরণ দিয়ে বলি। ‘ভালোবাসি’ কথাটা নানাভাবে বলা যায়। সান্ত্বনা দিয়ে মা তার সন্তানকে বলতে পারে, কেঁদো না, বাবু, তোমাকে আমি খুউব ভালোবাসি। কথাটা কোনো আবেগ ছাড়াই মা বলতে পারে, অথবা আবেগ দিয়েও বলতে পারে। কিন্তু প্রেমিক যখন তার প্রেমিকাকে চমৎকার একটা সন্ধ্যায় বলে ‘লক্ষ্মীটি, বিশ্বাস করো, সমস্ত অন্তর দিয়ে তোমাকে আমি ভালোবাসি। তখন অবশ্যই তাতে আবেগ মেশানো থাকে। তাই বলে সেটাও গান নয়। আবার রাগ করে একজন চেঁচিয়ে বলতে পারে: তোমাকে ভালোবাসি? কক্খনো নয়! আবেগ থাকলেও, এ কথাটা গান না-হওয়ারই সম্ভাবনা। কারণ গলায় এমন করে আবেগ মেশেনি, যাতে সেটাকে গান বলা যায়।
অপর পক্ষে, একজন যদি গলাটাকে একটু একটু করে উঁচুতে তুলে আবেগ মিশিয়ে মিষ্টি স্বরে বলে ‘ভালোবাসি’, তারপর গলাটাকে আবার নীচু থেকে উঁচু করে এবং একটু লম্বা করে আরও আবেগ দিয়ে বলে ‘ভালোবাসি’, তখন সেটা গান হয়ে যেতে পারে – ‘ভালোবাসি, ভালোওওবাসি’। আসলে আবেগের কথা হলে আমরা স্বাভাবিক গলায় কথা বলতে পারি না, সেটা গান হোক, রাগের কথা হোক, অথবা বিস্ময়ের কথা হোক।
সত্যি বলতে কী, মানুষ বিভিন্ন উপায়ে মনের ভাব প্রকাশ করে। তার মধ্যে একটা উপায় হলো: গলার স্বর ওঠা-নামা করা। আর-একটা উপায় হলো গলাটা নরম করে বলা। অথবা গলাটাকে উঁচিয়ে চেঁচিয়ে বলা। তবে গলাটাকে ওঠা-নামা করালেই গান হয় না। নির্দিষ্ট মাপে গলা ওঠা-নামা করানোর ফলে সেটা সুর হয়ে উঠলে, তবে তা গানে পরিণত হয়।
মানুষ অবশ্য আগে থেকে মাপ ঠিক করে নিয়ে তারপর সেই মাপ অনুসারে গলা ওঠা-নামা করায় না। বিষয়টা অনেকটা ভাষার মতো। আগে মানুষ কথা বলতে শিখেছে। তারপর সেই কথাগুলোর অর্থ তৈরি হয়েছে। তারপর সেই ভাষার ব্যাকরণ তৈরি করেছে। গানও তেমনি। আগে মানুষ সুর সৃষ্টি করেছে, তারপরে সেই সুরকেই একজন সঙ্গীতজ্ঞ সূক্ষ্ম কাঠামোর মধ্যে ফেলে এক-একটা রাগিণীর রূপ দিয়েছেন। উল্টোটা হয়নি। অর্থাৎ আগে রাগিণী তৈরি করে নিয়ে তারপর গান বাঁধেননি। অথবা আগে শাস্ত্রীয় সংগীত সৃষ্টি করার পর মানুষ লোকসংগীত রচনা করেনি। মানুষ আগে সুরে-বেসুরে মনের ভাব প্রকাশ করেছে। তারপর সেই জিনিশটাকে মেজে-ঘষে গান তৈরি করেছে।
গান হতে হলে সুরের সঙ্গে আরও একটা জিনিশ থাকতে হয় – সেটা তাল। তবে তাল ছাড়াও গান হতে পারে। তাল থাক অথবা নাই-থাক সবচেয়ে বড়ো কথা: শ্রোতার কাছে তা গানের মতো শোনাতে হবে। যেমন, মিষ্টি গলায় কেউ যখন ধর্মগ্রন্থ থেকে আবেগের সঙ্গে আবৃত্তি করে, তখন সেটাকে গানের মতো সুমধুর শোনাতে পারে – তার অর্থ বুঝতে না-পারলেও।
কখন মানুষ গলাটাকে ওঠা-নামা করাতে শিখলো, তার চেয়েও বড়ো কথা এই ওঠা-নামাটাকে নিয়ন্ত্রণ করতে শিখলো, সেটা বলা যায় না। এই যে সুনির্দিষ্ট নিয়মের মধ্যে থেকে গলাটাকে উঁচুতে-নীচুতে ওঠা-নামা করে একটা ধ্বনি সৃষ্টি করা, সেই ধ্বনিকে বলে ‘স্বর’। এ রকমের মোট সাতটা স্বর আছে – সা, রে, গা, মা, পা. ধা, নি। ভারতবর্ষে এই স্বরগুলোকে জন্তুর ডাকের সঙ্গে মিলিয়ে ভাবা হয়েছে। যেমন, কোকিলের ডাকের সঙ্গে পা ধ্বনির মিল আছে বলে ধরে নেওয়া হয়েছে। কল্পনা করা হয়েছে যে, ময়ূরের ডাকের সঙ্গে মিল আছে নি-র। এই স্বরগুলোকে একত্রে বলে ‘স্বরসপ্তক’। এক দিনে মানুষ সাতটা স্বর গলায় তুলতে শেখেনি। শুরু করেছিলো হয়তো তিনটা স্বর দিয়ে। এখনো ধর্মগ্রন্থ থেকে আবৃত্তি করতে অনেকে তিনটি স্বরই ব্যবহার করে। তা ছাড়া, কোনো কোনো লোকগীতি পাঁচটি স্বর দিয়ে রচিত; এমন কি, চারটি দিয়ে।
ভাবলে অবাক লাগে যে, সব দেশে, সব সভ্যতায়ই স্বরের সংখ্যা সাত। তবে কোনো কোনো দেশে সাতটি স্বরকে আরও ছোটো ছোটো ভাগে বিভক্ত করা হয়েছে। যেমন, প্রাচীন কাল থেকেই ভারতবর্ষে সাতটি স্বরকে মোট একুশটি ‘শ্রুতি’তে ভাগ করা হয়েছে। কিন্তু পশ্চিমা সংগীতে সাতটি স্বরকে ভাগ করা হয়েছে বারোটি ভাগে।
প্রশ্ন হচ্ছে: সব সভ্যতায় সাতটি করে স্বর থাকলো কী করে? উত্তর হলো: গণিতের হিসেব অনুযায়ী। বলা হয়, পশ্চিমা সভ্যতায় এই হিসেবটা আবিষ্কার করেন পিথাগরাস। কিংবদন্তী আছে যে, তিনি একদিন এক কর্মকারের দোকানের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। সেখানে একটা উত্তপ্ত লোহার দণ্ড পেটানোর শব্দ শোনেন তিনি। শব্দটা শুনে অমনি তাঁর মাথায় একটা চিন্তা খেলে যায়। তারপর হিসেব-নিকেশ করে তিনি আবিষ্কার করলেন যে, দণ্ডটিকে একটা নির্দিষ্ট মাপে কেটে ফেললে প্রতিবার তার কম্পন-সংখ্যা বৃদ্ধি পায়; ফলে আওয়াজ একটু চড়ায় ওঠে। এমনি করে তিনি সাতটি স্বর আবিষ্কার করেন। তারপর দেখতে পান যে, অষ্টম স্বরটি প্রথম স্বরটির তুলনায় ঠিক দ্বিগুণ জোরে কাঁপে। তার আওয়াজও দ্বিগুণ চড়ায় ওঠে।
কিন্তু তিনি এ হিসেবটা আবিষ্কার করলেও, তার বহু আগে মানুষ যে, সাতটি স্বর খুঁজে পেয়েছিলো, বেবিলনে আবিষ্কৃত একটি গানের ‘স্বরলিপি‘ থেকে এটা জানা যায়। এটি খ্রিস্টের জন্মের ১৪০০ শো বছর আগেকার কথা। তা থেকে বোঝা যায় যে, তার অনেক কাল আগেই গানের স্বরসপ্তক গড়ে উঠেছিলো। প্রাচীন গ্রীসেও বহু পুরোনো – খ্রিস্টপূর্ব ৬৫০ বছরের পুরোনো একটি গানের স্বরলিপি পাওয়া গেছে। কাজেই গানের ইতিহাস অতি প্রাচীন – মনুষ্য সভ্যতার ইতিহাসের মতোই পুরোনো। তিরিশ-চল্লিশ হাজার বছরের পুরোনো হাড়ের বাঁশি পাওয়া গেছে। এমন কি, বহু হাজার বছরের পুরোনো গুহাচিত্রে বাদ্যযন্ত্রের ছবি দেখা গেছে।
ভারতবর্ষেও সংগীত শাস্ত্রের বিকাশ ঘটেছিলো অনেক কাল আগে। খ্র্রিস্টের জন্মের পাঁচ-ছ হাজার বছর আগে সিন্ধুনদের অববাহিকায় অনার্যদের একটি সভ্যতা গড়ে উঠেছিলো— ময়েঞ্জোদারো আর হরোপ্পা। মাটি খুঁড়ে সেখানে যেসব প্রত্ন উপকরণ পাওয়া গেছে, তার মধ্যে আছে পোড়ামাটির বাঁশি এবং ঢোলক-কাঁধে নারীমূর্তি। আর ভারতে আগত আর্য-সভ্যতায় খ্রিস্টপূর্ব এক হাজার সালের দিকে রচিত সামবেদ থেকেও সংগীতের তথ্য পাওয়া গেছে। এতে সাতটি স্বর এবং একুশটি শ্রুতির কথা জানা যায়। এ থেকে আভাস পাওয়া যায় যে, ভারতবর্ষে আগত আর্যরা তারও আগে স্বরসপ্তক আবিষ্কার করেছিলো।
হয়তো সবাই মিলে কাজ করতে করতে অথবা ফুর্তি করতে করতে, একটা কথা বারবার আবৃত্তি করার মাধ্যমে মানুষ তালের ধারণা পেয়েছে। তারপর লাঠি দিয়ে কাঠের ওপর বা পাথরের ওপর পিটিয়ে শব্দ করতে করতে তাল জিনিশটা শিখে ফেলেছে। তালে তালে কাজ করার প্রতি মানুষের স্বাভাবিক একটা প্রবণতা আছে। ধরা যাক, যে-ব্যক্তি বাসন মাজে, লক্ষ করলে দেখা যাবে যে, সে তালে তালে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে বাসনটা ধোয় – একবার দ্রুতগতিতে, একবার ধীরগতিতে ধোয় না। এমন কি, এর থেকেও সহজ একটা উদাহরণ দিয়ে বলতে পারি: মানুষ যখন সহজ সমতল একটা পথ দিয়ে হাঁটে, তখন বাধা না-পেলে সাধারণত তালে তালেই হাঁটে। কাজেই ধরে নিতে পারি যে, তাল জিনিশটা এসেছে বহু যুগ আগে। হয়তো স্বরসপ্তক আবিষ্কারেরও অনেক অনেক আগে। এটা মানুষের স্বভাবের মধ্যেই আছে। এমন কি, গান জিনিশটাও মানুষের সহজাত প্রবণতা এ কথা বললেও পুরোপুরি ভুল বলা হবে না।
তাল, স্বর আর আবেগের সমন্বয়ে এভাবে সংগীতের জন্ম। যতো সময় গেছে, স্বর আর তালে ততোই বৈচিত্র্য এসেছে। সূক্ষ্মতা এসেছে। যেমন, গোড়াতে তাল ছিলো একই রকম। তার মানে, সময়ের মাপে সমান সমান বিরতিতে তাল পড়তো— অনেকটা ঘড়ির টিক টিক শব্দের মতো। কিন্তু এখন তালের গতি ও বিরতিতে অনেক বৈচিত্র্য এসেছে।
গানের সঙ্গে আর-একটা জিনিশও জড়িয়ে গেছে – সেটা নাচ। তালওয়ালা গান শুনলে তার সঙ্গে নাচতে ইচ্ছে করে। অনেকে নাচেও। প্রাচীন কালের বহু নাচের মূর্তি পাওয়া গেছে। নাচ ছাড়া, আরও একটা জিনিশ সংগীতের অংশ বলে মনে করা হয়: সেটা হলো বাজনা। এ জন্যে সংগীতের পুরো সংজ্ঞা হলো: নৃত্য, গীত ও বাদ্যের সমাহার।
[বিডিনিউজ থেকে]