গারো লোকগল্প

আপডেট: 03:58:55 26/02/2020



img

সুবর্ণভূমি ডেস্ক : অমর একুশে গ্রন্থমেলায় প্রকাশিত হয়েছে ম্যাগডিলিনা মৃ-এর গ্রন্থ ‘গারো লোকগল্প’, প্রকাশ করেছে পেন্ডুলাম পাবলিশার্স, প্রচ্ছদ করেছেন আল নোমান, মূল্য ১৩৫ টাকা। বইমেলায় পেন্ডুলামের ২৭১ নম্বর স্টলে পাওয়া যাবে বইটি।
প্রথম বই প্রকাশের অনুভূতি এবং সাহিত্য-ভাবনা নিয়ে ম্যাগডিলিনা মৃর সঙ্গে কথা হয়েছে।

প্রথমে ‘গারো লোকগল্প’ গ্রন্থটি সম্পর্কে সংক্ষেপে কিছু বলুন...
গারো লোকগল্প মূলত গারো আদিবাসীদের লোকজীবন, লোকবিশ্বাস, লোকাচার এবং জনজীবনের পরম্পরায় মৌখিকভাবে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে প্রচলিত হয়ে আসা গল্প। এই গল্পগুলো গারোদের সংস্কৃতি বিকাশ এবং পরম্পরা সম্পর্কে জানতে কার্যকর ভূমিকা পালন করবে।
 
গারোরা নৃতাত্ত্বিকভাবে নিজেদের মান্দি দাবি করেন। সেক্ষেত্রে বইয়ের নাম হতে পারত ‘মান্দি লোকগল্প’। তাহলে ‘গারো লোকগল্প’ নাম দেওয়ার পেছনে যুক্তি কী?
এটা নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা আছে। এই সময়ে আমাদের জাতিগোষ্ঠীর বেশকিছু প্রগতিশীল তরুণই নিজেদের ‘মান্দি’ বা ‘আচিক’ বলতে পছন্দ করে। তাদের যুক্তি হলো ‘গারো’ নামটি মূলত নিন্দার্থে বহিরাগত বা ইনভেডার্সদের দেওয়া নাম। ‘গারো’ শব্দের উৎপত্তি নিয়েও নানা তত্ত্ব আছে। অনেকে আবার বলেন গারো শব্দটি এসেছে ‘গারু’ নামে তিব্বতের একটি অঞ্চলের নাম থেকে কিংবা প্রাচীন রাজ্য ‘গৌর’ বা ‘গরুরু পাখি’ থেকে। তবে আমরা নিজেদেরকে ‘মান্দি’ বলে ডেকেই অভ্যস্থ। ‘মান্দি’ শব্দটির অর্থ ‘মানুষ’। সেদিক থেকে আরেকটি আলোচনাও দাঁড় করানো যায়। যাই হোক, মান্দি, আচিক, গারো- এই তিনটি শব্দের মধ্যে গারো শব্দটি ‘মান্দি’ জনগোষ্ঠীদের আইন্ডেন্টিফিকেশনে বহুল প্রচলিত। এ পর্যন্ত নানা-তত্ত্ব-আলোচনা ইত্যাদির ক্ষেত্রে ‘গারো’ নামটিই ব্যবহৃত হয়েছে সবচেয়ে বেশি। এদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠদের কাছে ‘মান্দি’ শব্দটির চেয়ে ‘গারো’ নামটি অনেকটাই পরিচিত, ফলে পাঠকদের সহজে বোঝার সুবিধার্থে বইয়ের নাম রেখেছি ‘গারো লোকগল্প’।
 
বইয়ের গল্পগুলো তো একপ্রকার মান্দি ভাষা থেকে অনুবাদিত?
হ্যাঁ। এক প্রকার ভাষান্তরিত বই বলতে পারেন। আমি চরিত্রের নাম, স্থান, গল্পের আবহ ঠিক রেখে গল্পাকারে পাঠকদের সামনে তুলে ধরেছি। আমার উদ্দেশ্য ছিলো ছোট ছোট, ইনফরমেটিভ, মজাদার, হাস্যরসের গল্পগুলো, পাঠকের সামনে তুলে ধরা। সেক্ষেত্রে অনেক ব্যক্তির, দেবতা, কিংবা স্থানের নামের ডিটেল রেফারেন্সগুলো আমি বর্জন করেছি গল্প বলার স্বার্থেই।
 
লোকগল্প নিয়ে বই প্রকাশ করার সিদ্ধান্তে নিলেন কীভাবে?
ঠিক পরিকল্পনা করে এ বছর বই প্রকাশ করার সিদ্ধান্ত নিলাম তা কিন্তু নয়। বিগত দুয়েক বছর ধরেই বিভিন্ন লোকগল্প, লৌকিক দেবতা, বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর বিকাশ ইত্যাদি নিয়ে পড়াশোনা করার চেষ্টা করছি। এর মাঝেই মনে হলো আমাদের এখানে আদিবাসীদের নিয়ে তেমন উল্লেখযোগ্য কাজ হচ্ছে না। অল্পকিছু উল্লেখযোগ্য আদিবাসী তরুণদের উদ্যোগ ছাড়া যেটা হচ্ছে, সেটা হচ্ছে মূলত এনজিওদের প্রজেক্ট হিসেবে। যেহেতু আমি নিজে একজন মান্দি (গারো) তাই চেষ্টা ছিলো নিজ জাতি, সংস্কৃতি, লোকাচার ইত্যাদি নিয়ে কিছু করতে। সেই প্রচেষ্টাই মূলত লোকগল্পের সংকলন বইটি।
 
মৌলিক কবিতা/গল্প/উপন্যাসের বাইরে এসে প্রথম বই হিসেবে সংকলিত বই বেছে নিয়েছেন তাহলে শুধু সেই তাগিদ থেকে?
আসলে আমি নিজেকে একজন নিমগ্ন পাঠক মনে করি। বইয়ের পাতা থেকে জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত এবং বেঁচে থাকার যাবতীয় উপাদান থেকে পাঠ নিতে ভালোবাসি। আমার আগ্রহ মূলত লোকসংস্কৃতি, সাহিত্য এবং সঙ্গীতে। যেহেতু আমি নিজেই মান্দি সংস্কৃতি বিলং করি সেহেতু আমার নিজের সংস্কৃতির লোকসাহিত্যের গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ নিয়েই কাজ করার আগ্রহ হয়েছে, সেখান থেকে আমার এ বই।
 
এর আগে থকবিরিম প্রকাশনী থেকে সুমনা চিসিম গারোদের লোকগল্প নিয়ে একটি বই প্রকাশ করেছিলেন। সেখানে তিনি অথেনটিক সোর্স হিসেবে গল্পকার শানোন সাংমা থিগিডি'র নাম উল্লেখ করেছেন। যিনি মেঘালয়ের একজন বয়োবৃদ্ধ এবং অভিজ্ঞতাসম্পন্ন লোক (খামাল)। সেক্ষেত্রে আপনি কীভাবে সেসব গল্প নিয়ে কাজ করেছেন?
হ্যাঁ সুমনা দিদিও লোকগল্প নিয়ে কাজ করেছেন। দিদি প্রায় পাঁচ-ছয়টি লোকগল্প আমার এ পাণ্ডুলিপি থেকেই নিয়েছেন। আমরা জানি, বাংলাদেশ ও ভারতের মেঘালয়ে বসবাসকারী মাতৃতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় বিশ্বাসী গারো জনগোষ্ঠীদের একটি স্বতন্ত্র ধর্মমত রয়েছে। তাদের সমাজ ব্যবস্থায় প্রচলিত সৃষ্টিতত্ত্ব এবং লোকাচারের ভিত্তিতে গড়ে উঠেছে তাদের ধর্মবিশ্বাস এবং বৈচিত্র্যময় সাংস্কৃতিক জীবন। তাদের নিজস্ব সংস্কৃতির বীজমন্ত্র মূলত তাদের লোকাচারের মধ্যেই নিহিত। আর সেই লোকসাহিত্যে গারোদের আদি নিবাস আচিক আসং (মেঘালয়ের গারো পাহাড়) থেকে আসাম হয়ে বাংলাদেশ পর্যন্ত বসবাসকারীদের মুখে মুখে প্রচলিত অসংখ্য লোকগল্প (কলাগাছের বিয়ে, টুনটুনি, ভূত, শ্রমিক ইত্যাদি) রয়েছে। বিভিন্ন পশুপাখি, জীবজন্তুকে কেন্দ্র করে প্রচলিত এই লোকগল্পগুলোতে রয়েছে পুরাণকথা, ব্যঙ্গকথা, নীতিকথা, ব্রতকথা, রোমান্স, সৃষ্টিতত্ত্ব। এই বইটিতে বাংলাদেশ ও ভারতের মেঘালয় ও আসামে বসবাসকারী গারোদের মধ্যে প্রচলিত ২৩টি লোকগল্প (প্রথম সাতটি গল্পের ইলাস্ট্রেশনসহ) রয়েছে। আগ্রহী পাঠক এই গল্পগুলোর মাধ্যমে গারো জনগোষ্ঠীদের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র, বিশ্বাস, সৃষ্টিতত্ত্ব এবং লোকাচার সম্পর্কে চমৎকার তথ্য এবং ধারণা পাবেন।
 
আমরা জানি মান্দি সংস্কৃতি-সাহিত্য একটা রিচেবল সাহিত্য। কিন্তু সে তুলনায় বাংলা ভাষাভাষী পাঠকের কাছে পৌঁছাচ্ছে না মনে হয়। এ অবস্থার সৃষ্টি কীভাবে? এ থেকে উৎরানোর উপায় কী?
আমি বলবো মান্দিদের নিজেদের সংস্কৃতি, লোকাচার, লোকসাহিত্য ইত্যাদি নিয়ে আরও বেশি বেশি কাজ করা দরকার। এটার জন্য আমি একদিক থেকে কেবলমাত্র ‘মান্দিদের’ দায়ী করবো না। এখন অনেক তরুণ মান্দিরাই কাজ করছেন। লেখক মিঠুন রাকসাম, পরাগ রিছিল, লেবিসন স্কু, ওয়ারি নকরেকসহ আরো বেশ কিছু তরুণের নাম বলা যায়। মান্দি জনগোষ্ঠী ছাড়াও এ অঞ্চলের চাকমা, সাঁওতাল, কোচসহ আরও বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর সংস্কৃতি কিংবা লোকসাহিত্যই অনেক সমৃদ্ধ। আমি একটি অনলাইন সাহিত্য পত্রিকা ‘লেখালেখির উঠান’-এর সঙ্গে যুক্ত। আমরা গুরুত্ব সহকারে ‘দেশে নানা ভাষার সংস্কৃতি’ নামে একটি বিভাগে লেখা সংগ্রহ করার চেষ্টা করছি বিগত দুই বছর ধরে, কিন্তু তেমনভাবে আমরা পাচ্ছি না। আসলে ভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর সংস্কৃতি বিকাশের জন্য রাষ্ট্রেরও দায়বদ্ধতা থাকে, যেটার ঘাটতি রয়েছে এই বিষয়ে। তাছাড়া বাঙালি তরুণদেরও বাংলাদেশের বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীদের নিয়ে আগ্রহ, পড়াশোনা ইত্যাদি হওয়া উচিৎ বলে আমি মনে করি। তাহলে দেশের নানা ভাষার সংস্কৃতি আরও সহজে বাঙালি পাঠকদের নাগাল পাবে।

আশা করি বই সম্পর্কে পাঠক অনেকটাই ধারণা পাবে এ আলাপের মাধ্যমে। ধন্যবাদ আপনাকে।
আপনাকেও ধন্যবাদ। ভালো থাকবেন।
[বাংলা ট্রিবিউন থেকে]