ঘাস চাষ শেখার সেই সফরের প্রস্তাব একনেকে যাচ্ছে

আপডেট: 01:50:04 23/11/2020



img

জাফর আহমেদ : গবাদি পশুর খাদ্য পুষ্টিকর ঘাস চাষাবাদের কৌশল শিখতে প্রায় ডজনখানেক কর্মকর্তার বিদেশ যাওয়া নিয়ে সমালোচনার মধ্যেই প্রকল্পটি অনুমোদনের জন্য জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটিতে (একনেক) যাচ্ছে।
এর আগে খিচুড়ি রান্না, পুকুর কাটা, খাল খনন, মৎস্য চাষ, প্রযুক্তি হস্তান্তর, কাজুবাদাম চাষ এবং বিশেষ উঁচু ভবন দেখাতে কর্মকর্তাদের বিদেশ সফরে নিয়ে ব্যাপক সমালোচনার সৃষ্টি হয়।
সম্প্রতি পুষ্টিকর ঘাস চাষ শিখতে ৩২ জন কর্মকর্তাকে বিদেশ পাঠানো হচ্ছে- এমন খবর আলোচনায় আসে। বিষয়টি নিয়ে সামাজিক গণমাধ্যমে অনেকে সমালোচনাও করছেন।
দেশে গাভীর জন্য পুষ্টিকর ঘাস নিশ্চিত করে দুধের উৎপাদন বাড়াতে সরকার ‘প্রাণীপুষ্টির উন্নয়নে উন্নত জাতের ঘাসের চাষ সম্প্রসারণ ও লাগসই প্রযুক্তি হস্তান্তর’ শীর্ষক প্রকল্পটি আগামী মঙ্গলবার চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য একনেক সভায় তোলা হতে পারে বলে জানিয়েছেন পরিকল্পনা কমিশনের কৃষি, পানিসম্পদ ও পল্লী প্রতিষ্ঠান বিভাগের সদস্য মো. জাকির হোসেন আকন্দ।
পরিকল্পনা কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পটির মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ১০১ কোটি ৫৩ লাখ টাকা। এর মধ্যে উন্নত পুষ্টিসমৃদ্ধ ঘাসের চাষ শিখতে ৩২ সরকারি কর্মকর্তার বিদেশে প্রশিক্ষণের প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রত্যেকের পেছনে খরচ হবে দশ লাখ টাকা করে।
প্রকল্পটি একনেকের সায় পেলে চলতি বছর শুরু করে আগামী ২০২৪ সালের মার্চের মধ্যে এটি শেষ করবে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর।
প্রকল্পটি নিয়ে সমালোচনার প্রতিক্রিয়ায় পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য জাকির হোসেন আকন্দ বলেন, এই প্রকল্পে ৩২ কর্মকর্তার বিদেশ সফরের বিষয়টি নিয়ে সম্প্রতি কয়েকটি মিডিয়ায় বেশ সমালোচনা হচ্ছে।
‘না বুঝেই’ সমালোচনা করা হচ্ছে দাবি করে তিনি বলেন, “বর্তমানে যেসব দেশ সবচেয়ে বেশি দুগ্ধ উৎপাদন করে রপ্তানি করছে সেসব দেশ একটি সুশৃংখল নীতিমালা বাস্তবায়নের মাধ্যমে সফলতা অর্জন করেছে। ওই দেশগুলো গবেষণার মাধ্যমে উন্নত জাতের পুষ্টিকর ঘাস আবিষ্কার করেছে, যে ঘাস গাভীকে খাওয়ালে তুলনামুলকভাবে বেশি দুধ দেয়।”
“বর্তমানে আমাদের দেশে বছরে কয়েকশ কোটি টাকার গুঁড়োদুধ আমদানি করা হয়। কিন্তু আমরা যদি সঠিক নীতিমালা বাস্তবায়ন করে এগোতে পারি তাহলে মাত্র কয়েকবছর পর থেকে আমাদের আর গুঁড়োদুধ আমদানি করতে হবে না।”
পরিকল্পনা কমিশনের এই সদস্য বলেন, ছোট ছোট খামার করে গরুকে পুষ্টিকর উন্নত জাতের ঘাস এবং প্রয়োজনমতো দানাদার খাবার দিয়ে দুধের উৎপাদন বাড়ানো যায়।
“আমাদের দেশের আর্থিক সচ্ছলতার বিচারে অনেক বড় ডেইরি ফার্ম করার চেয়ে সাধারণ কৃষক ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের দিয়ে ছোট ছোট ডেইরি ফার্ম গড়ে তুলতে চাই। পৃথিবীর অনেক দেশে নতুন জাতের আবিষ্কৃত পুষ্টিকর এসব ঘাসের চাষ আমরা দেশেও ছড়িয়ে দিতে চাই। এই ঘাসের ব্যবস্থা করা গেলে দেশে অবশ্যই দুধের উৎপাদন বাড়বে।”
এক প্রশ্নে তিনি বলেন, দেশের ক্ষুদ্র উদ্যেক্তাদের বিদেশ গিয়ে প্রশিক্ষণ নেওয়া সম্ভব নয়।
প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রয়োজনীয় কয়েকজনকে বিদেশ থেকে প্রশিক্ষণ করিয়ে নিয়ে এসে তাদের দিয়ে সারা দেশের চাষি ও ডেইরি ফার্মের উদ্যোক্তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। এভাবে কয়েক বছরের মধ্যেই সারাদেশে উন্নতজাতের পুষ্টিকর ঘাস চাষ এবং গাভী পালনের প্রশিক্ষণের বিস্তার ঘটিয়ে বাংলাদেশ দুগ্ধ উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে উঠবে বলে তার বিশ্বাস।
তাই সমালোচনার কিছু নেই জানিয়ে তিনি বলেন, “১০১ কোটি টাকা বিনিয়োগ করে ভবিষ্যতে বছরে কয়েকশ কোটি টাকার গুঁড়োদুধ আমদানি বন্ধ করার উদ্দেশ্যেই এই প্রকল্পটি গ্রহণ করেছি।”
বিদেশে প্রশিক্ষণ নেওয়ার ক্ষেত্রে কোনো সমস্যা দেখছেন না শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়েরি এনিম্যাল সায়েন্স অ্যান্ড ভেটেরিনারি মেডিসিন অনুষদের ডিন ড. আনোয়ারুল হক বেগ। তবে তিনি মাঠপর্যায়ের কর্মীদের প্রশিক্ষণে গুরুত্ব দিয়েছেন।
অধ্যাপক বেগ বলেন, “উন্নত জাতের পুষ্টিকর ঘাসের চাষ দেখতে বিদেশ সফরে যাওয়া যেতেই পারে। এটা নিয়ে কোনো সমালোচনা হওয়াও উচিত নয়।
“কিন্তু এই বিদেশ সফরে কারা যাবেন সেটাই প্রশ্ন। যদি সংশ্লিষ্ট মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তা কর্মচারীদের প্রশিক্ষণে না পাঠিয়ে অপ্রয়োজনীয় কাউকে পাঠানো হয় তাহলে এই সফর ও প্রশিক্ষণ কোনো ফল বয়ে আনবে না।”
তাছাড়া প্রশিক্ষণার্থীর সংখ্যাও কমানো যেতে পারে মন্তব্য করে তিনি বলেন, “সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা বিশেষ করে বিভাগীয় ও জেলা পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের এই প্রশিক্ষণের জন্য পাঠানো হলে প্রকল্পটি দেশে দুগ্ধ উৎপাদন বাড়াতে অবদান রাখতে পারবে।”
অনেক আগে থেকেই প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করার কথা হচ্ছিল জানিয়ে তিনি বলেন, “আসলে উন্নত জাতের পুষ্টিকর ঘাস সাভার প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটেও (বিএলআরই) রয়েছে। আমাদের দেশীয় উদ্ভাবিত অনেক ঘাস এখানে চাষ করা হচ্ছে। এই প্রকল্পের মাধ্যমে হয়ত বিশ্বে সবচেয়ে সফলতা পাওয়া ঘাস চাষের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে।”
প্রকল্পটির বাস্তবায়নকারী সংস্থা প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আব্দুল জব্বার শিকদার বলেন, “আমাদের দেশে দশ বছর আগের তুলনায় গাভীর সংখ্যা তেমন একটা বাড়েনি। কিন্তু উন্নত জাতের গাভী বেড়েছে। এই উন্নত জাতের গাভীকে উন্নত জাতের পুষ্টিকর ঘাস দিয়ে বেশি দুধ উৎপাদনের জন্যই আমরা প্রকল্পটি প্রস্তাব করেছি।”
বিদশে প্রশিক্ষণের জন্য কারা যাচ্ছেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের অগ্রাধিকার দিয়েই তালিকা করার চেষ্টা হচ্ছে।
সূত্র : বিডিনিউজ

আরও পড়ুন