চোখ উপড়ে খুনের হুমকি আগেই দেওয়া হয়েছিল

আপডেট: 01:49:53 17/05/2020



img

রহিদুল ইসলাম খান, চৌগাছা (যশোর): চৌগাছায় তৃতীয় শ্রেণির ছাত্র সাকিব হত্যার এক সপ্তাহ পার হ‌লেও এখন পর্যন্ত এই ঘটনায় জড়িত কাউকে ধর‌তে পা‌রে‌নি পুলিশ। এতে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন নিহত সা‌কি‌বের স্বজনরা। গত ১০ মে রাতে সাকিবকে চোখ উপড়ে নৃশংসভাবে হত্যা করে অজ্ঞাত দুর্বৃত্তরা। এঘটনায় সা‌কি‌বের নানি ফা‌তেমা বেগম ১১ মে তিনজনের নাম উল্লেখসহ কয়েকজনকে অজ্ঞাত আসামি করে চৌগাছা থানায় হত্যা মামলা করেন। কিন্তু ঘটনার এক সপ্তাহ পার হলেও কাউকে গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা চৌগাছা থানার ইনসপেক্টর (তদন্ত) ইনামুল হক জানান, অভিযুক্তরা পলাতক রয়েছেন। গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে। খুব শিগগির আসামিদের ধরে হত্যার মূল রহস্য উদ্ঘাটন করতে পারবেন ব‌লে আশাবাদী তিনি।
নিহত সাকিবের মা রেকসোনা বেগম বলছেন, পারিবারিক দ্বন্দ্বের কারণে প্রায় পাঁচ বছর আগে তার স্বামী আলমগীর হোসেন খুন হন। এর পর থেকেই তিনি তার দুই ছেলেকে চৌগাছার হাকিমপুর ইউনিয়নের স্বরুপপুর গ্রামে নানার বাড়িতে রেখে ঢাকার একটি গার্মেন্টেসে চাকরি করতে যান। ছেলে হত্যার খবর শুনে পরের দিন বাড়িতে আসেন তিনি। এর পরই প্রিয় সন্তান হারানো বেদনায় কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন তিনি।
মামলার বাদী ফাতেমা বেগম জানান, তার নাতি সাকিবকে প্রায়ই হত্যার হুমকি দিতো চাচাতো নানা ইদ্রিস আলী।
কেন হুমকি দিতো জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘কয়েক মাস আগে প্রতিবেশি জালালের ছেলে ইন্তা বাজা‌রে এক‌টি মুরগি বিক্রি করতে যাওয়ার সময় সাকিবকে ডেকে নেয়। ওইদিন ইদ্রিসের একটি মুরগি হারিয়ে যায়। এতে ইদ্রিস সন্দেহ করে তার হারিয়ে যাওয়া মুরগি সাকিব চুরি করেছে।'
তিনি জানান, এ ঘটনায় পাড়ার বিশিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়ে বিচারও হয়। ‌বিচার চলাকা‌লে ইদ্রিসের না‌তি ছে‌লে নয়ন বিচারক‌দের সাম‌নেই সা‌কি‌বের ওপর চড়াও হয়। সে সময় বিচারক‌দের কেউ কেউ নয়নকে চড়-থাপ্পড় দেন। এই কার‌ণে বিচা‌রের মজ‌লি‌সে ইদ্রিস আলী হুঙ্কার দেয়, 'তোর নাতির কার‌ণে আমার নাতি মার খে‌য়ে‌ছে। ওর চোখ উপ‌ড়ে খুন করে ফেল‌বো।' ফা‌তেমা বেগম ব‌লেন, 'এর কয়েকদিন পরে ইদ্রিস ও তার নাতি নয়ন কয়েক দফায় আমার বাড়িতে এসে সাকিবের চোখ উপড়ে হত্যার হুমকি দেয়। এতে দুই পরিবারের দ্বন্দ্ব আরো বেড়ে যায়।'
সাকিবের নানা খলিলুর রহমান বলেন, ‘খুন হয়ে যাওয়ার ভয়ে বড় ভাই শরিফুল ছোট ভাই সাকিবকে নিয়ে চুয়াডাঙ্গায় তার দাদার বাড়িতে চলে যায়। সাকিবের জন্য আমা‌দের খুব খারাপ লাগছিল। তাই কয়েকদিন পরে আমি যেয়ে সাকিবকে আবারো নিয়ে আসি। সাকিব বাড়িতে এলে ইদ্রিস আবারো চোখ উপড়ে হত্যার হুমকি দেয়।'
অভিযুক্ত ইদ্রিস আলীর বাড়িতে গিয়ে দেখা হয় তার স্ত্রী আল্পনা বেগমের সঙ্গে। বাড়ির পুরুষরা কোথায় জানতে চাইলে তিনি বলেন, পুরুষরা বাড়িতে নেই। কোথায় গেছে তাও তিনি জানেন না বলে দাবি করেন।
সাকিব হত্যার ঘটনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, 'ওই রাতে বাড়ির সবাই ধান ঝাড়ার কাজে ব্যস্ত ছিল। রাতে ধান ঝেড়ে ক্লান্ত থাকায় পরিবারের বেশিরভাগ সদস্যই সকালে ঘুমিয়ে ছিল।'
সেদিন সন্ধ্যা থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত বৃষ্টি হয়েছে; আপনারা কীভাবে ধান ঝাড়লেন?- এমন প্রশ্নে চুপ থাকেন আল্পনা।
স্থানীয় ইউপি সদস্য রবিউল ইসলাম রবি গ্রাম্য শালিসের সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, ‘ওই পরিবার দু‌টি‌তে প্রায়ই বিবাদ লেগেই থাকে। এছাড়া ওই শা‌লি‌সে মুরু‌ব্বি‌দের ম‌ধ্যে দুই-একজন নয়ন‌কে চড়-থাপ্পড় ‌দেওয়ার ঘটনাও ঘ‌টে‌ছিল। তবে সেই কার‌ণেই যে সা‌কিব‌কে হত্যা করা হ‌য়ে‌ছে, এমন কথা বলা যা‌বে না। কী কার‌ণে যে মাসুম বাচ্চাটা‌কে হত্যা করা হ‌য়ে‌ছে তা বুঝ‌তে পার‌ছি না।'
হা‌কিমপুর ইউনিয়ন প‌রিষ‌দের চেয়ারম্যান মাসুদুল হাসান আশাবাদ ব্যক্ত ক‌রে ব‌লেন, খুব শিগগির দোষীদের গ্রেফতার করতে সক্ষম হ‌বে পু‌লিশ।
চৌগাছা থানার ওসি রিফাত খান রাজিব বলেন, মেডিকেল রিপোর্ট এখনো হাতে আসেনি। মামলায় অভিযুক্তদের গ্রেফতারের জোর চেষ্টা চলছে।
নিহত সাকিব চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার কুন্দিপুর বেলেমাঠ গ্রামের মৃত আলমগীর হোসেনের ছেলে। সে চৌগাছা উপজেলার স্বরূপপুর গ্রামে নানা খলিলুর রহমানের বাড়িতে থেকে স্বরূপপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তৃতীয় শ্রেণিতে পড়তো। ঘটনার দিন সন্ধ্যা থেকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না তাকে। পরের দিন ১০ মে সকালে স্বরুপপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাশের একটি খালে তার লাশ পড়ে থাকতে দেখেন স্বজনরা। তার একটি চোখ উপড়ানো ছিল। পরে পুলিশ লাশ উদ্ধার করে ময়না তদন্তের জন্য মর্গে পাঠায়।

আরও পড়ুন