জীবন রাঙাতে রঙিন মাছের চাষ

আপডেট: 07:01:43 26/01/2020



img
img

বিশেষ প্রতিনিধি, ঝিনাইদহ : পুকুরের পানিতে খেলে বেড়াচ্ছে রঙ-বেরঙের মাছ। লাল, নীল, কমলা, কালো, বাদামি, হলুদ রঙের মাছের ছড়াছড়ি। গোল্ড ফিস, কমেট, কই কার্প, রেপটিকা, ওরেন্টা গোল্ড, সিল্কি কই, মৌলি, মলি, গাপটি, অ্যানজেলসহ রয়েছে ১৬ জাতের মাছ; যা দেখলে যে কারো মন ভরে যায়। বাসাবাড়ির অ্যাকুরিয়ামে শোভা পেয়ে থাকে এইসব মাছ। সেই রঙিন মাছের চাষ করেছেন ঝিনাইদহের কালীগঞ্জের শিহাব উদ্দিন (২৩)।
শাহাব উদ্দিন জানান, এই রঙিন মাছের চাষ তার জীবনকে রাঙিয়ে দেবে। বর্তমানে এই মাছ চাষের মাধ্যমে তার পড়ালেখার খরচ চলছে। গরিব বাবাকে কষ্ট করে ছেলের পড়ার খরচ যোগাড় করতে হচ্ছে না। তাছাড়া বেকারত্ব দূর করতে ইতিমধ্যে অনেকে এই মাছের চাষ করার ইচ্ছা পোষণ করেছেন।
কালীগঞ্জ উপজেলার রাখালগাছি ইউনিয়নের হাসানহাটি গ্রামের আব্দুল মান্নানের ছেলে শিহাব। তিনি যশোর মাইকেল মধুসূদন কলেজে ব্যবস্থাপনা বিষয়ে অনার্স করছেন। এবার দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। তার আরেকটি বোন ফারজানা ইয়াসমিন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখা করেন। আর ছোট ভাই ফরহাদ উদ্দিন নবম শ্রেণির ছাত্র।
২০১৮ সালের গোড়ার দিকে শিহাব উদ্দিন বাড়ির আঙিনার একটি পরিত্যক্ত জমিতে ছোট্ট পরিসরে গড়ে তুলেছিলেন অরনামেন্টাল ফিস ফার্ম। প্রথম বছরই এই খামারের মাছ বিক্রি করে তার আয় হয়েছে প্রায় এক লাখ টাকা। এবছর মা মাছ ছেড়েছেন পুকুরে। বাচ্চা তৈরি করবেন হাউজে। 
শিহাব জানান, ২০১৮ সালে এক বাসায় একটি অ্যাকুরিয়ামে কয়েকটি রঙিন মাছ দেখে ভালো লাগে তার। কৌতূহলী হয়ে মাছের দাম জানতে চান। জানতে পারেন, মাছগুলোর দাম অনেক। তিনি আরো জানতে চান এগুলো কোথা থেকে এসেছে। ওই বাসার মালিক জানান, রঙিন মাছগুলো বিদেশ থেকে আনা হয়। বর্তমানে দেশেও এই মাছের চাষ হচ্ছে। সেখান থেকেই রঙিন মাছ চাষের পরিকল্পনা মাথায় আসে যুবক শিহাব উদ্দিনের।
তিনি জানান, বছরের শুরুতে মাটিতে গর্ত খুঁড়ে পলিথিন বিছিয়ে একটি চৌবাচ্চা তৈরি করে অল্প কয়েকটি রঙিন মাছ ছাড়েন। দুই মাসের মধ্যে ছোট মাছগুলো বেশ বেড়ে ওঠে। দেখতে এতোটা সুন্দর হয় যে, তার ভালো লেগে যায়। তখন আরো মা মাছ সংগ্রহ করেন সাতক্ষীরার কলারোয়া এলাকা থেকে। ১৬০টি বিভিন্ন প্রজাতির মাছ নিয়ে আসেন। এই মাছ বড় করতে তাকে আরো পাঁচটি চৌবাচ্চা (হাউজ) তৈরি করতে হয়। ২০১৮ সালের এপ্রিল মাসে দশ ফুট দৈর্ঘ্য আর পাঁচ ফুট প্রস্থের চারটি ও পাঁচ ফুট দৈর্ঘ্য আর চার ফুট প্রস্থের দুটি- মোট ছয়টি চৌবাচ্চায় রেণু ছাড়া হয়। এরপর খামারে থাকা মাছগুলো বড় হতে থাকে। এক পর্যায়ে মাছ ডিম দেয়। ডিম থেকে রেণু পোনা উৎপাদিত হয়, যা বাজারে বিক্রি করেন। অ্যাকুরিয়ামের ব্যবসায়ীরা এই মাছগুলো কেনেন। এ থেকে তার প্রায় এক লাখ টাকা আয় হয়েছে।
২০২০ সালের শুরুতে তিনি ছয়টি চৌবাচ্চার পাশাপাশি আরো একটি পুকুরে এই মাছের চাষ করছেন। যেখানে তিনি দেড় হাজার মা মাছ আর ১৫০টি পুরুষ মাছ ছেড়েছেন।
তিনি জানান, তিন থেকে চার মাসের মধ্যে এগুলো বড় হবে। তখন চৌবাচ্চায় দিয়ে ডিম ফোটাবেন। তারপর রেণু বিক্রি করবেন। আশা করছেন, এবার কয়েক লাখ টাকার রঙিন মাছ বিক্রি করতে পারবেন।
শিহাব উদ্দিন জানান, বর্তমানে তার খামারে গোল্ড ফিস, কমেট, কই কার্র্প, রেপটিকা, ওরেন্টা গোল্ড, সিল্কি কই, মৌলি, মলি, গাপটি, অ্যানজেল, প্লাটিসহ ১৬ প্রজাতির ব্রুড (মা) মাছ রয়েছে। যার একটি মাছ বছরে প্রায় তিন হাজার রেণু পোনা দেবে। আকারে তিন থেকে চার ইঞ্চি হলে এই মাছ বিক্রি করা হয়। মাছগুলো বছরে একবার ডিম দেয়; ৭২ ঘণ্টার মধ্যে ডিম ফুটে বাচ্চা বের হয়। এ সময় অক্সিজেন দেওয়া ছাড়াও নানা সতর্কতা অবলম্বন করতে হয়।
শিহাব বলেন, ‘শুরুতে এলাকার মানুষ তার এই চাষ দেখে হাসাহাসি করতেন। সবাই মনে করতেন, এটা আমার খেয়ালিপানা। কিন্তু হাল ছাড়িনি। এখন এলাকার মানুষ ছাড়াও মৎস্য কর্মকর্তারাও এই মাছ দেখতে আসছেন। অনেকে খামার দেখতে এসে মাছ কিনেও নিয়ে যাচ্ছেন।’
তিনি আরো জানান, একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন তাকে এই মাছ চাষে আর্থিক সহযোগিতা দিয়েছে। যে কারণে ভালোভাবে চাষটি করতে পারছেন। সরকারিভাবে এ বিষয়ে প্রশিক্ষণ ও সহজ ঋণের ব্যবস্থা থাকলে ভালো হয় বলে জানান শিহাব উদ্দিন। সব ঠিকঠাক থাকলে এই খামারই জীবন বদলে দেবে- এমনটি আশা তার।
এ বিষয়ে কালীগঞ্জ উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা সাইদুর রহমান জানান, শিহাব উদ্দিনের রঙিন মাছের চাষ তিনি দেখতে গিয়েছিলেন। দেখে খুবই ভালো লেগেছে।
তিনি বলেন, ‘আমাদের এই অঞ্চলের আবহাওয়ায় এই মাছ চাষ সম্ভব। শিহাব উদ্দিকে নানা পরামর্শসহ সার্বিক সহযোগিতা করা হচ্ছে।’
পাশাপাশি তাকে ঋণ সহযোগিতা দেওয়ার চেষ্টা করছেন বলে জানিয়েছেন এই কর্মকর্তা।

আরও পড়ুন