জয় বাংলা বাজার

আপডেট: 02:43:25 14/02/2020



img
img

বিশেষ প্রতিনিধি, ঝিনাইদহ : চারিদিকে যুদ্ধ চলছে, গ্রামের মানুষেরা ভয়ে গ্রাম থেকে বের হতে পারছেন না। পাশের বাজারগুলোও বেশ দূরে। বাড়িতে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসেরও অভাব চলছে। এই পরিস্থিতিতে কয়েক যুবক দুই গ্রামের মাঝে বসিয়ে নিলেন কয়েকটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান।  সেটি ছিল ১৯৭১ সালের মাঝামাঝি সময়ের কথা।
গ্রামের সেই ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোতে কেনাবেচা হতো আর রেডিও’র মাধ্যমে এলাকার মানুষকে যুদ্ধের খবর শোনানো হতো। শত্রুপক্ষের পরাজয়, নিজের দেশের যোদ্ধাদের জয়ের খবর শুনে আন্দোলিত হতেন আর ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিয়ে মানুষেরা বাড়ি ফিরতেন। এই ‘জয় বাংলা’ স্লোগান থেকেই গ্রামের ছোট বাজারটির নাম হয়েছে ‘জয় বাংলা বাজার’; যেটি ঝিনাইদহ জেলার শৈলকুপা উপজেলার দিঘলগ্রাম ও পিড়াগাতী গ্রামের মাঝে অবস্থিত।
বাজারের ব্যবসায়ীরা বলছেন, স্বাধীনতার ৪৯ বছর পেরিয়ে গেলেও ‘জয় বাংলা বাজার’টির তেমন উন্নতি হয়নি। ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বেড়েছে সামান্য, বাজারে নেই কোনো চাদনি। নেই একটা যাত্রীছাউনিও। বাজারের মাঝ দিয়ে যাওয়া ঝিনাইদহ-শৈলকুপা সড়কটির ঝিনাইদহ অংশে এখনো ইট বিছানো। যার ওপর দিয়ে ছোট-বড় যানবাহন চালানো কষ্টকর। ব্যবসায়ীরা স্বাধীনতাযুদ্ধের স্মৃতিজড়িত বাজারটিকে একটি সুন্দর বাজার হিসেবে গড়ে তোলার জন্য সরকারের প্রতি দাবি জানিয়েছেন।
সরেজমিনে দেখা যায়, বাজারে ছোট-বড় ৪০টি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। চায়ের দোকানগুলোতে মানুষের ভীড়, সবাই চা পান করছেন আর দেশের নানা বিষয় নিয়ে বিতর্ক করছেন। বিকেলের চপ-পিয়াজি, তেলে ভাজার কাজ চলছে। মুখরোচক এই খাবার খাচ্ছেন অনেকে।
দোকানের সামনে দাঁড়াতেই দোকানির প্রশ্ন, ‘ভাই কী দেবো?’ পাশ থেকে একজন বললেন, ‘ভাই মনে হয় চা খেতে দাঁড়িয়েছেন।’
বাজারে বসেই কথা হয় পিড়াগাতী গ্রামের লুৎফর রহমানের সঙ্গে। তিনি বিল থেকে ধরে কিছু মাছ নিয়ে বসে আছেন। তিনি বললেন, আজ সাপ্তাহিক বাজার না হওয়ায় লোকজন কম। শুক্র আর মঙ্গলবার সাপ্তাহিক বাজারের দিন আসলে দেখা যেত কতটা দোকান বসেছে আর কত মানুষ কেনাবেচা করছেন।
‘জয় বাংলা বাজার’-এর নামকরণ কীভাবে- লুৎফর রহমানের কাছে এই প্রশ্ন করতেই জবাব এলো, এতোদিন কেউ বাজারটির নাম নিয়ে কোনো খোঁজ নেয়নি, আজ অন্তত কেউ খোঁজ নিচ্ছেন।
তিনি বলেন, ঝিনাইদহ জেলার শৈলকুপা উপজেলার শেষ গ্রাম পিড়াগাতী আর দিঘলগ্রাম। পাশাপাশি দুটি গ্রামের পরেই রয়েছে ঝিনাইদহ সদর উপজেলার চাপড়িগ্রাম। দুই উপজেলার সীমান্তবর্তী গ্রাম হওয়ায় তারা সবসময় থাকেন অবহেলিত। তাদের দুই গ্রামের পুবে বাকড়ি, পশ্চিমে ভাটই, উত্তরে শেখরা আর দক্ষিণে মধুপুর বাজার রয়েছে।
লুৎফর রহমান আরো জানান, ১৯৭১ সালে দেশে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়ে গেলে তাদের দুই গ্রামের চারপাশে শত্রুপক্ষ ঘোরাঘুরি করতে থাকে। গ্রামের মানুষেরা ভয়ে বাইরে বের হতে পারতেন না। বাড়িতেও তেল-লবণ, মরিচ-মসলার অভাব পড়ে যায়। তখন উপায় না দেখে গ্রামের মাঝে ফাঁকা একটি স্থানে তারা তিনজন তিনটি মুদি দোকান বসিয়ে নেন। গোপনে ঝিনাইদহ শহর থেকে মালামাল কিনে এনে এখানে বিক্রি করতেন। লুৎফর রহমান ছাড়াও ছিলেন বাবর আলী বিশ^াস ও ইন্তাজ আলী মোল্লা। লুৎফর রহমান এই দোকান বসানোর আগে গ্রামে গ্রামে গামাল করে তেল-লবণ বিক্রি করতেন। অন্যরা এলাকার মানুষের প্রয়োজনে দোকান বসিয়েছিলেন।
পিড়াগাতী গ্রামের রমজান আলী শেখ জানান, যুদ্ধের সময় দুই গ্রামের মানুষ বাইরে যেতে পারতেন না। যুদ্ধের খবর নিতে বিকেল হলেই বাবর আলীর দোকানে ভীড় করতেন। সেখানে রেডিও’তে খবর শোনার ব্যবস্থা ছিল। খবরে দেশের ছেলেদের জয় আর শত্রুদের পরাজয় শুনে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিয়ে আনন্দ প্রকাশ করতে করতে অনেকেই বাড়ি ফিরতেন। এ সময় গ্রামে একে অপরকে খোঁজ করলে বলা হতো ‘জয় বাংলা বাজার’-এ যেতে। এখান থেকেই বাজারটির নামকরণ হয়েছে ‘জয় বাংলা বাজার’। আজো বাজারটি ওই নামেই পরিচিত।
বাজারের ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি মেজবাউজ্জামান কল্লোল জানান, বাজারটি ‘জয় বাংলা’ নামেই পরিচিত। বাইরে থেকে এই নাম বললেই যে কেউ বাজারটির অবস্থান বলে দেবেন।
তিনি বলেন, বাজারটির সঙ্গে স্বাধীনতাযুদ্ধের যোগসূত্র রয়েছে। তারপরও তেমন উন্নত হয়নি। বাজারের সঙ্গে একটি মাদরাসা রয়েছে, আছে একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়; যেটি আজো এমপিওভুক্ত হয়নি। তিনি বাজারটি সরকারের আওতায় নিয়ে উন্নয়ন করা হবে বলে আশা করেন।
এ বিষয়ে স্থানীয় নিত্যানন্দপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. ফারুক হোসেন বিশ্বাসের সঙ্গে কথা হয়। তিনি জানান, বাজারটির নামের একটা গুরুত্ব রয়েছে। কিন্তু তেমন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে না ওঠায় সরকারের রাজস্ব খাতভুক্ত হয়নি। তারপরও কিছু উন্নয়ন হয়েছে এবং সম্প্রতি কিছু ব্যবসা প্রতিষ্ঠানও গড়ে উঠেছে। তারা এখন আশা করছেন, এটি রাজস্ব খাতে নিয়ে উন্নয়ন করা হবে।
ইতিমধ্যে ইউনিয়ন পরিষদের পক্ষ থেকে কিছু উন্নয়ন করা হয়েছে জানিয়ে চেয়ারম্যান বলেন, বাজারচাঁদনি আর যাত্রীছাউনীর প্রয়োজন রয়েছে। কিন্তু এগুলো নির্মাণে যে বরাদ্দ প্রয়োজন তা না পাওয়ায় এখনো করা সম্ভব হয়নি।
তিনি বাজারটির উন্নয়নে সরকারের দৃষ্টি কামনা করেছেন।