ঝিনাইদহ সীমান্তে হঠাৎ বেড়েছে অনুপ্রবেশ

আপডেট: 09:20:10 20/11/2019



img

তারেক মাহমুদ, কালীগঞ্জ (ঝিনাইদহ) : ঝিনাইদহ সীমান্ত দিয়ে হঠাৎ করে অবৈধ অনুপ্রবেশ বেড়ে গেছে। প্রায় প্রতিদিনই ভারত থেকে অবৈধ পথে বাংলাদেশে ঢুকছে নারী-পুরুষ-শিশুরা। চলতি মাসের গত ১৫ দিনে দুই শতাধিক অনুপ্রবেশকারীকে আটক করেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি); যাদের কাছে কোনো দেশেরই বৈধ পাসপোর্ট নেই।
সম্প্রতি ভারত সরকার আসামে জাতীয় নাগরিক নিবন্ধন (এনআরসি) প্রকাশ করে। অন্য কয়েকটি প্রদেশেও একই প্রক্রিয়া চালানোর তোড়জোড় করছে ক্ষমতাসীন বিজেপি। এই কারণে নির্যাতনের ভয়ে দলে দলে লোকেরা সীমান্ত পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করছে বলে জানিয়েছে বিজিবি ও জেলা প্রশাসন। তবে এসব অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের ঠেকাতে কঠোর নজরদারি করছে বিজিবি।
এ বিষয়ে বিজিবি বলছে, যারা অবৈধভাবে সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করছেন, তাদের বেশির ভাগই মুসলমান। এরা এনআরসি আতঙ্ক ও স্থানীয়দের নির্যাতনের ভয়ে ভারত ছেড়ে চলে আসছেন। তারা আর ভারতে যাবেন না বলে বিজিবির কাছে জানিয়েছেন। সহায়-সম্বল নিয়ে তারা এদেশে চলে এসেছেন। ধরাপড়া অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
ঝিনাইদহের মহেশপুর উপজেলার সীমান্তবর্তী জলুলী, পলিয়ানপুর ও খোসালপুর সীমান্ত দিয়ে বেশিরভাগ অনুপ্রবেশকারী বাংলাদেশে আসছে। গত ১৫ দিনে ৭৫ নারী, ৬৪ পুরুষ ও ৬৪ শিশুকে আটক করেছে বিজিবি। সবশেষ গেল মঙ্গলবার (১৯ নভেম্বর) আটক করা হয়েছে চারজনকে।
চলতি নভেম্বরের ১৫ দিনে শুধু মহেশপুর থানার মাধ্যমে ১৫৭ অনুপ্রবেশকারীকে আদালতে পাঠানো হয়েছে। এরমধ্যে সবথেকে বেশি অনুপ্রবেশকারীকে আটক করা হয় চলতি মাসের ১৩ ও ১৪ নভেম্বর। এই দুই দিনে যথাক্রমে ৩৩ ও ৪৯ জন ধরা পড়েন।
খালিশপুর ৫৮ বিজিবির অতিরিক্ত পরিচালক লে. কর্নেল কামরুল হাসান বলেন, মাইগ্রেশন করে যারা ভারতে গিয়েছিল তাদের সেখানে বসবাসে অসুবিধা হচ্ছে। নানাভাবে তাদের চাপের মধ্যে পড়তে হচ্ছে। বিশেষ করে আসাম ও ব্যাঙ্গালুরু এলাকায় এই সমস্যা বেশি হচ্ছে। যে কারণে তারা ভারত ছেড়ে বাংলাদেশে আসার চেষ্টা করছেন। আটককৃতরা এক সময় বাংলাদেশে ছিলেন বলে দাবি করছেন। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে বলে জানান এই বিজিবি কর্মকর্তা।
অবশ্য স্থানীয়রা বলছেন, বিজিবি যে ক’জনকে আটক করতে পেরেছে, অনুপ্রবেশকারী তার চেয়ে অনেক বেশি; যারা বিজিবির চোখ ফাঁকি দিয়ে এদেশে প্রবেশ করেছে। তবে, খালিশপুর ৫৮ বিজিবির উপ-অধিনায়ক কামরুল হাসানের দাবি, তারা কঠোর নজরদারি করছেন। সেক্ষেত্রে চোখ ফাঁকি দিয়ে প্রবেশের সুযোগ নেই।
এ বিষয়ে মহেশপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রাশেদুল আলম বলেন, যারা আটক হচ্ছেন, তাদের পরিচয় নিয়ে দেখা যাচ্ছে, বেশির ভাগ বাগেরহাট ও খুলনা এলাকার মানুষ। তারা গড়ে দুই দশক ধরে ভারতে কাজ করছিলেন। সেখানে এনআরসি ঝামেলায় চলে আসছেন। তাদের বাংলাদেশে আত্মীয়-স্বজন রয়েছেন।
এ বিষয়ে ঝিনাইদহের মানবাধিকার কর্মী আমিনুর রহমান টুকু বলেন, সম্প্রতি ভারত সরকার ভারতের প্রকৃত নাগরিকদের তথ্য বের করতে জাতীয় নাগরিক নিবন্ধন প্রকাশ করে। সেখানে নাম না থাকায় নির্যাতনের ভয়ে এসব অনুপ্রবেশকারী নারী পুরুষ বর্ডার পার হয়ে বাংলাদেশে চলে আসছে বলে জানা গেছে। তারা যদি আমাদের দেশ থেকে চলেই যায়, তাহলে এখন আবার অবৈধভাবে ফিরে আসছে।
তিনি বলেন, আমাদের দেশে রোহিঙ্গাদের মানবিক কারণে জায়গা দেওয়া হয়েছে। এভাবে যদি আবার ভারত থেকে মানুষ চলে আসে তাহলে আমাদের আরো একটা সমস্যা সৃষ্টি হবে। তারা অনেকেই সম্পত্তি বিক্রি করে চলে গিয়েছিল। এখন ফিরে এসে তারা কর্মসংস্থান না পেয়ে বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এছাড়া যারা ভারত থেকে আসছে তারা কোনো মারাত্মক রোগের জীবাণু বহন করছে কি-না এটাও দেখার বিষয়।
ঝিনাইদহ জেলা প্রশাসক সরোজকুমার নাথ জানান, শনিবার থেকে প্রচুর অবৈধ অনুপ্রবেশকারী নারী-পুরুষ ঝিনাইদহের মহেশপুর সীমান্ত অঞ্চলে আটক হচ্ছেন। আটককৃতরা দাবি করছেন, তারা বাংলাদেশের নাগরিক।
‘কারাগারে পাঠানোর পর তাদের সাথে আমি কথা বলেছি। তাদের ভাষ্য, তারা পাসপোর্টবিহীন ভারতে ছিল। ওখানে বাসা-বাড়ি বা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কাজ করতো। সম্প্রতি ওখানে তাদেরকে কিছু লোকজন খোঁজ করছে। এছাড়া যারা তাদের আশ্রয় দিয়েছিলেন, তারা বলেছেন, আর রাখতে পারবেন না। ফলে বাধ্য হয়ে তারা ভারতের দালাল ধরে ঝিনাইদহের মহেশপুর সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করার চেষ্টা করছে। আমি তাদের বক্তব্য যাচাই করেছি, তারা বাংলাদেশের নাগরিক। তারা পাসপোর্ট ছাড়াই ভারতে গিয়েছিল,’ বলছিলেন ঝিনাইদহের জেলা প্রশাসক।

আরও পড়ুন