ট্রাম্পকে কি চিরতরে নিষিদ্ধ করা সম্ভব?

আপডেট: 12:39:43 15/01/2021



img

সুবর্ণভূমি ডেস্ক : ক্যাপিটল হিলে ট্রাম্প সমর্থকদের তাণ্ডবের পর, ওই দাঙ্গায় "প্ররোচনা" দেবার দায়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে রাজনীতি থেকে সরিয়ে দেবার দাবি আরও গতি পেয়েছে তার বিরুদ্ধে অভিশংসন প্রক্রিয়া শুরুর পক্ষে হাউসে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটের পর।
ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় অসদাচরণের অভিযোগে দ্বিতীয়বারের মত অভিশংসন প্রক্রিয়ায় বিচারের মুখোমুখি হতে যাচ্ছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প।
মি. ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ফলাফলে কারচুপি হয়েছে বলে বারবার ভিত্তিহীন অভিযোগ তোলার পর গত সপ্তাহে ক্যাপিটল হিলে যে তাণ্ডব হয়েছে, তাতে উচ্ছৃঙ্খল জনতাকে তিনিই উস্কানি দিয়েছিলেন এই অভিযোগে তাকে বিচারের মুখোমুখি করা হচ্ছে। ঐ দাঙ্গায় প্রাণ হারিয়েছে পাঁচজন।
বুধবার হোয়াইট হাউস ত্যাগ করার পর মি. ট্রাম্পকে বিচারের সম্মুখীন হতে হবে।
তিনি যদি দোষী প্রমাণিত হন, সেনেটররা তাকে ভবিষ্যতে কোনরকম রাজনৈতিক পদ গ্রহণ থেকে নিষিদ্ধ করার ব্যাপারেও ভোট দিতে পারবেন।
কংগ্রেসের নিম্ন কক্ষ হাউস অফ রেপ্রেজেনটিটিভ বা প্রতিনিধি পরিষদে বুধবার তার বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিশংসন প্রক্রিয়া শুরুর পক্ষে ভোট পড়ে। ছয়ই জানুয়ারি ক্যাপটল হিলের দাঙ্গার ব্যাপারে "বিদ্রোহে ইন্ধন" জোগানোর জন্য প্রেসিডেন্টকে অভিযুক্ত করা হয়।
রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট এই সহিংসতার পেছনে তার কোন ভূমিকার কথা অস্বীকার করেছেন।
ভোটাভুটির পর এক ভিডিও প্রকাশ করে ডোনাল্ড ট্রাম্প তার সমর্থকদের শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। ঐ ভিডিওতে তিনি তার অভিশংসন সম্পর্কে কোন মন্তব্য করেননি।

এরপর কী হতে যাচ্ছে?
মার্কিন কংগ্রেসের উচ্চ কক্ষ সেনেট প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য বিচার প্রক্রিয়া চালাবেন।
সেনেটে রিপাবলিকান পার্টির নেতা মিচ ম্যাককনেল বলেছেন প্রেসিডেন্টের বিচার প্রক্রিয়ার জন্য যেসব "নিয়মবিধি ও পদ্ধতি রয়েছে এবং সেনেটের আগের বিচারগুলোর নজির বিবেচনায় নিলে" এই বিচারের ফলাফল "ন্যায্য বা যথাযথ" হবার সুযোগ প্রায় নেই বললেই চলে।
মি. ট্রাম্পকে দোষী সাব্যস্ত করতে গেলে দুই তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার প্রয়োজন। এর অর্থ হল ১০০ আসনের উচ্চ কক্ষে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে অন্তত ১৭ জন রিপাবলিকানকে ডেমোক্র্যাটদের পক্ষে ভোট দিতে হবে।
বিশজন রিপাবলিকান প্রেসিডেন্টের বিচারের পক্ষে খোলাখুলি তাদের মত দিয়েছেন বলে মঙ্গলবার নিউ ইয়র্ক টাইমস তাদের এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে। সহকর্মীদের লেখা এক নোটে মি. ম্যাককনেল বলেছেন তিনি কোন্ পক্ষে ভোট দেবেন সে ব্যাপারে তিনি এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেননি।
মি.ট্রাম্প দোষী প্রমাণিত হলে, সেনেটররা আরেকটি ভোটের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন তাকে পুনর্বার প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা থেকে নিষিদ্ধ করা হবে কিনা। মি. ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন ২০২৪ এর নির্বাচনে আবার প্রার্থী হিসাবে দাঁড়ানোর পরিকল্পনা তিনি করছেন।
মি. ট্রাম্পকে ২০১৯ সালে হাউস প্রথমবার অভিশংসিত করেছিল ইউক্রেনকে আমেরিকার রাজনীতিতে মাথা গলানোর অনুরোধ জানানোর অভিযোগে। কিন্তু সেনেট সেসময় তাকে বিচারে অব্যাহতি দেয়।
ডোনাল্ড ট্রাম্প দোষী প্রমাণিত হলে আমেরিকায় ১৯৫৮ সালে প্রণীত সাবেক প্রেসিডেন্ট সম্পর্কিত ধারা অনুযায়ী প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট যেসব সুযোগ সুবিধা ভোগ করেন, যেমন জনগণের অর্থে অবসর ভাতা, স্বাস্থ্য বীমা এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার সুযোগ সেসবও তিনি হারাবেন।

অভিশংসন: এক নজরে
অভিশংসন কখন হতে পারে?- যখন ক্ষমতাসীন অবস্থায় কোন প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগ ওঠে। এ ক্ষেত্রে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বিরুদ্ধে ক্যাপিটলে হামলা চালানোর জন্য সমর্থকদের উৎসাহিত করে বিদ্রোহে উস্কানি দেবার অভিযোগ আনা হয়েছে তার বিরুদ্ধে।
ক্ষমতা থেকে অপসারণের প্রক্রিয়া - হাউস অফ রেপ্রেজেনটিটিভ ইতোমধ্যেই মি. ট্রাম্পকে অভিশংসিত করেছে। এখন তার বিচার হবে সেনেটে। কিন্তু মি. ট্রাম্প ২০শে জানুয়ারি ক্ষমতা ছেড়ে দেবার আগে এই বিচার প্রক্রিয়া শুরু করা যাবে না।
চূড়ান্ত পদক্ষেপ কী হতে পারে? মি. ট্রাম্প যদি সেনেটে দোষী সাব্যস্ত হন তাহলে আইনপ্রণেতারা চাইলে আরেকটি ভোট অনুষ্ঠিত করতে পারেন যা তাকে ২০২৪ সালে আবারো প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অংশ নেয়ার পথকে বন্ধ করে দেবে।

অভিশংসনের জটিলতা
বিবিসির উত্তর আমেরিকা সংবাদদাতা অ্যান্থনি যুরকার বলছেন এক বছর আগে মি. ট্রাম্পকে যখন প্রথমবার অভিশংসিত করা হয়েছিল, তখন রিপাবলিকান পার্টি এই পদক্ষেপে বাধা দিয়েছিল। কিন্তু এবারে রক্ষণশীলরা মুষ্টিমেয় সংখ্যায় হলেও এই পদক্ষেপকে সমর্থন করেছেন। যেটা এবারের অভিযোগের গুরুত্বের মাত্রা সম্পর্কে একটা ইঙ্গিত দেয়।
এছাড়াও মি. যুরকার বলছেন অভিশংসনের পক্ষে কিছু রিপাবলিকানের সমর্থন দেয়াকে মেয়াদের শেষ দিনগুলোতে মি. ট্রাম্পের প্রভাব কিছুটা কমার একটা প্রতিফলন হিসাবেও দেখা হচ্ছে।
তবে জো বাইডেনের জন্য প্রেসিডেন্ট হিসাবে ক্ষমতা গ্রহণের শুরুতেই সেনেটে অভিশংসন প্রক্রিয়ায় জড়িয়ে পড়া একটা বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে। যেখানে করোনাভাইরাস মোকাবেলা এবং অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে তিনি ক্ষমতার প্রথম একশ'দিনে মন দিতে চান, সেখানে অভিশংসনের জটিল প্রক্রিয়া নিয়ে ব্যস্ত থাকা তার সূচনা লগ্নকে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলতে পারে।
এছাড়াও আমেরিকায় একটা ঐক্য প্রতিষ্ঠার যে অঙ্গীকার জো বাইডেন তার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিতে দিয়েছিলেন, এই অভিশংসন প্রক্রিয়া আমেরিকানদের মধ্যে সেই বিভক্তির আগুন আরও জাগিয়ে তুলতে পারে এমন আশংকাও রয়েছে বলে বলছেন অ্যান্থনি যুরকার।
রিপাবলিকান পার্টির মধ্যেও ক্যাপিটলের এই তাণ্ডবের পরে একটা বিভক্তি দেখা যাচ্ছে। দলের একটা অংশ এখনও মি. ট্রাম্পের রাজনীতির স্টাইলের প্রতি অনুগত। তার এই স্টাইল ২০১৬ সালে ভোটারদের এক অংশের মধ্যে দারুণ উদ্দীপনা তৈরি করেছিল এবং রিপাবলিকানদের ক্ষমতায় যাবার পথ সুগম করেছিল।
আবার তার এই রাজনীতির স্টাইলই ২০২০ সালে রিপাবলিকানদের ভরাডুবি ডেকে এনেছে। তার নজিরবিহীন কথাবার্তার ধরন ক্যাপিটল হিলের দাঙ্গায় প্ররোচিত করেছে তার সমর্থকদের । কাজেই মি. যুরকার বলছেন, রিপাবলিকানরা মি. ট্রাম্পের পেছনে কতটা সংহতির পথে হাঁটবে সেটা এই বিচার প্রক্রিয়ার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়াবে।
তবে ২০২৪ সালে মি. ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের জন্য আবার প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নামবেন এর বাস্তব সম্ভাবনা খুবই বেশি।
সামাজিক মাধ্যমে তার কণ্ঠরোধ করা হলেও, এবং ক্যাপিটলের তাণ্ডবের পরেও বুধবার প্রতিনিধি পরিষদের ভোটে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে যে দলের এক অংশের মধ্যে তার জনপ্রিয়তা কিছুটা ধাক্কা খেলেও, তার প্রতি রিপাবরিকানদের সমর্থনের দেয়াল একেবারে ভেঙে পড়েনি।
তবে মি.যুরকার বলছেন, দলের মধ্যে ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরুদ্ধে যারা তারা মি. ট্রাম্পের এই কোণঠাসা অবস্থার সুযোগ নিয়ে রিপাবলিকান রাজনীতি থেকে তাকে সরাতে শেষ ধাক্কাটা দেবেন কিনা সেটাই এখন বড় প্রশ্ন।
আর অভিশংসন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মি. ট্রাম্পকে দোষী প্রমাণ করতে সেনেট যদি ব্যর্থ হয়, তাহলে মি. ট্রাম্পকে আবার প্রতিদ্বন্দ্বিতার সুযোগ থেকে চিরতরে দূরে রাখার সুযোগও ডেমোক্র্যাটরা হারাবেন।
সূত্র : বিবিসি

আরও পড়ুন