দক্ষিণ-পশ্চিম সীমান্তে সক্রিয় সোনা চোরাকারবারিরা

আপডেট: 07:31:01 06/02/2020



img

তারেক মাহমুদ, কালীগঞ্জ (ঝিনাইদহ) : দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ভারতীয় সীমান্তবর্তী এলাকায় সোনা চোরাকারবারিরা বেশ সক্রিয়। সম্প্রতি বেশ কয়েকটি সোনার চালান আটকের পর তাদের তৎপরতা দৃশ্যমান হয়ে উঠে।
গত ১০ দিনে এ অঞ্চলের ঝিনাইদহ, চুয়াডাঙ্গা, যশোর ও সাতক্ষীরার সীমান্ত এলাকা থেকে কমপক্ষে পাঁচটি বড় চালান আটক করে বিজিবি। যদিও সীমান্ত এলাকার লোকজনের মতে, বিজিবির হাতে যা ধরা পড়ছে তার পরিমাণ খুবই কম। তাদের ভাষ্য, আন্তর্জাতিক এ চক্রের সদস্যরা বিজিবির চোখ ফাঁকি দিয়ে বাংলাদেশ থেকে কোটি কোটি টাকার সোনা প্রতিবেশি দেশ ভারতে পাচার করছে। আর এসব জেলার কমপক্ষে ৩০ অবৈধ সীমান্ত পথ দিয়ে ভারত থেকে আসছে আগ্নেয়াস্ত্র ও মাদকদ্রব্য।
সর্বশেষ ৫ ফেব্রুয়ারি বুধবার সকালে ভারতে পাচারকালে বেনাপোল পোর্ট থানার সাদিপুর সীমান্তের পাকা রাস্তার ওপর থেকে দশটি সোনার বারসহ জিহাদ আলী (২৮) নামে এক পাচারকারীকে আটক করেন বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) সদস্যরা। আটক সোনা পাচারকারী জিহাদ বেনাপোল পোর্ট থানার সীমান্তবর্তী সাদিপুর এলাকার তাহাজ্জত আলীর ছেলে।
এর একদিন আগে ৪ ফেব্রুয়ারি মহেশপুর ৫৮ বিজিবির টহলদল চুয়াডাঙ্গা জেলার জীবননগরে একটি যাত্রীবাহী বাস তল্লাশি করে ভারতীয় মাদক ও সোনা চোরাকারবারি শ্রীসুমন সরকার (২৬) ও শ্রীঅলক বিশ্বাস (৩০) নামে দুইজনকে আটক করে। আটক সুমন সরকার ভারতের নদীয়া জেলার বাসিন্দা। এসময় তাদের কাছ থেকে সোনা ও মাদকদ্রব্য উদ্ধার করা হয়। তারা দুইজনই সোনা ও মাদক চোরাচালানে জড়িত বলে জানায় বিজিবি।
এর আগে ৩১ জানুয়ারি শুক্রবার বিকেলে ভারতে পাচারকালে সাতক্ষীরার ভোমরা স্থলবন্দর-সংলগ্ন ল²ীদাঁড়ি সীমান্ত থেকে দুই কেজি ৩৫০ গ্রাম সোনা জব্দ করে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ। উদ্ধার করা সোনার মধ্যে বার ও গয়না ছিল। জব্দ করা সোনার বাজারমূল্য প্রায় এক কোটি ৪৭ লাখ ৯৬ হাজার টাকা বলে জানায় বিজিবি।
এদিকে, ৩০ জানুয়ারি বৃহস্পতিবার সকালে একই জেলার কলারোয়া সীমান্তে ভারতে পাচারকালে ছয়টি সোনার বার উদ্ধার করে বিজিবি।
এছাড়া ২৭ জানুয়ারি চুয়াডাঙ্গার জীবননগর উপজেলার শিংনগর গ্রাম থেকে এক কেজি ২১০ গ্রাম ওজনের সোনার গয়না উদ্ধার করে ঝিনাইদহের মহেশপুর ৫৮ বিজিবি। উদ্ধার করা গয়নার বাজারমূল্য ৬২ লাখ ২৮ হাজার ৭৫০ টাকা।
তার আগে ২৬ জানুয়ারি রোববার বিকেলে ঝিনাইদহ জেলার মহেশপুরে ভারতীয় সীমান্ত এলাকার তালসার বাজার থেকে সাড়ে ৪১ হাজার আমেরিকান ডলারসহ তিন সোনা চোরাকারবারিকে আটক করে বিজিবি। আটক তিনজন এদিন সকালে ছয়টি সোনার বার ভারতে পাচার করে এই টাকা পেয়েছিলেন বলে স্বীকার করেন।
আটক তিনজন হলেন, মহেশপুর উপজেলার ভৈরবা গ্রামের করিম বিশ্বাসের ছেলে মকলেছুর রহমান (৫৫), মানিকগঞ্জ জেলার সিঙ্গাইর উপজেলার গোবিন্দল গ্রামের আমজাদ হোসেনের ছেলে রতন মিয়া (৪০) এবং মহেশপুর উপজেলার বাঘাডাঙ্গা গ্রামের আজিজুল মণ্ডলের ছেলে মতিয়ার রহমান (৪৮)।
আর এসব চক্রের হাত ধরেই বাংলাদেশে প্রবেশ করছে মাদকদ্রব্য। গেল বছরের ৩ ডিসেম্বর ঝিনাইদহের ৫৮ বিজিবি ২৫ হাজার ৯১৬ বোতল ফেনসিডিল, দুই হাজার ৫০২ বোতল ভারতীয় মদ, সাড়ে তিন লিটার বাংলা মদ, ৫০ কেজি গাঁজা ও ইয়াবা ধ্বংস করে। ধ্বংস করা এসব মাদকদ্রব্য ওই বছরের এপ্রিল থেকে অক্টোবর মাস পর্যন্ত সীমান্তসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে আটক করা হয়।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ঝিনাইদহের মহেশপুর উপজেলার প্রায় ৫৭ কিলোমিটার ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত রয়েছে। এরমধ্যে প্রায় ১১ কিলোমিটার রয়েছে কাঁটাতারবিহীন। ওই এলাকাজুড়ে রয়েছে কোদলা নদী। ঝিনাইদহ সীমান্তে মাটিলা, লেবুতলা, মোকদ্দাসপুর, সামন্তা, বাদ্দেরআটি, কচুরপোতা, বাঘাডাঙ্গা, খোসালপুর, আন্দুলিয়া, বর্নিশাহপুর, শ্রীনাথপুর, জলুলী ও যাদবপুর সীমান্ত এলাকা দিয়ে মূলত রাতের অন্ধকারে এসব সোনা ও মাদকদ্রব্য এবার-ওপার হয়ে থাকে। এছাড়া যশোর সীমান্তের গাতিপাড়া, পুটখালি, শিকারপুর, কাশীপুর, কাবিলপুর, ফতেপুর, পুড়াপাড়া, দৌলতপুর, ঘিবা, রঘুনাথপুর ও অগ্রভুলোট, মাশিলা সীমান্তে এসব অবৈধ কারবার চলে।
২০১৮ সালে মাদকবিরোধী অভিযানে ঝিনাইদহের কথিত সাত মাদক ব্যবসায়ী পুলিশ ও র‌্যাবের ক্রসফায়ারে নিহত হন। এরপর জেলার মাদক ব্যবসায়ীরা গা-ঢাকা দেন। অনেকে এলাকা ছেড়ে অন্যত্র বসবাস শুরু করেন। এরপর ২০১৯ সালে ৩ মে জেলার কোটচাঁদপুরে মাদক ব্যবসায়ীদের মধ্যে কথিত গোলাগুলিতে এক ‘শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ী’ নিহত হন। বিভিন্ন সময় মাদকবিরোধী অভিযানে পাঁচ মাদক ব্যবসায়ীকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় আটক করে পুলিশ।
এ ব্যাপারে কথা বলতে মহেশপুর ৫৮ বিজিবির সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম খানের ফোনে রিং করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি। তবে প্রতিটি সফল অভিযানের সংবাদ সংশ্লিষ্ট ব্যাটালিয়ন থেকে স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মীদের সরবরাহ করা হয়।

আরও পড়ুন