নৃশংসতায় স্তম্ভিত মানুষ বিচার চাইছেন

আপডেট: 08:53:50 15/10/2020



img
img
img

কে এম আনিছুর রহমান, কলারোয়া (সাতক্ষীরা) : কলারোয়ায় গভীররাতে একই পরিবারের স্বামী-স্ত্রী ও দুই সন্তানকে গলা কেটে হত্যার ঘটনায় তাদের আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশি ও সাধারণ মানুষের আহাজারিতে বাতাস ভারি হয়ে উঠেছে। চারটি তরতাজা মানবসন্তানের জবাই করা লাশ দেখে তারা স্তম্ভিত।
বুধবার দিবাগত রাত একটা থেকে তিনটার মধ্যে কোনো এক সময় উপজেলার হেলাতলা ইউনিয়নের খলসি গ্রামে এই ঘটনা ঘটে।
নিহতরা হলেন, খলসি গ্রামের মৃত শাহাজান আলীর ছেলে হ্যাচারি মালিক মাছ ব্যবসায়ী শাহিনুর রহমান (৩৭), শাহিনুরের স্ত্রী সাবিনা খাতুন (৩০), ছেলে সিয়াম হোসেন মাহি (১০) এবং মেয়ে তাসনিম (৮)।
স্থানীয়রা জানান, ভোরে তারা ওই বাড়িতে চিৎকার-চেচামেচি শুনে ছুটে যান। দরজা খুলে দেখতে পান, সাবিনা খাতুন, তার দুই শিশু সন্তান তাসমিন ও তাসিম এক ঘরে ও আরেক ঘরে শাহিনুনের জবাই করা লাশ। পরে  খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়। দুপুর ১২টা পর্যন্ত লাশগুলো ঘরেই ছিল।
স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান মোয়াজ্জেম হোসেন এই হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবি করে বলেন, পরিবারটি ছিল অত্যন্ত নিরীহ। তারা কোনো দল করতো না। কারো সঙ্গে তাদের বিরোধও ছিল না।
নিহত গৃহস্বামীর ভাই রায়হানুল ইসলাম জানান, তার বড়ভাই শাহিনুর ইসলাম নিজস্ব ৭-৮ বিঘা জমিতে পাঙাসমাছ চাষ করতেন। গত ২২ বছর ধরে তাদের পারিবারিক জমি নিয়ে নিকট প্রতিবেশী ওয়াজেদ কারিগরের ছেলে আকবরের সঙ্গে মামলা চলছিল। এই মামলা ও পারিবারিক বিরোধের জের ধরে এই হত্যাকাণ্ড ঘটে থাকতে পারে বলে তার ধারণা।
নিহত শাহিনুরের খালাতো ভাই হাসানুর রহমান জানান, তার ভাইয়ের সঙ্গে কারও শত্রুতা ছিল না। কেবলমাত্র জমিজমা নিয়ে আকবরের সঙ্গে ২২ বছর মামলা চলছে।  তিনিও এই হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের সর্বোচ্চ শাস্তি চান।
পরিবারের স্বজন ও প্রতিবেশিরা জানান, কলারোয়া উপজেলার দামোদরকাটী গ্রামের নূর আলীর ছেলে জনৈক আকবর হোসেনের কাছ থেকে ৩৪ শতক জমি কেনেন প্রতিবেশি ওয়াজেদ আলির ছেলে আকবর আলি। এর মধ্যে কিছু জমি নিয়ে আকবরের সঙ্গে শাহিনুরের মামলা চলছিল। এই বিরোধ ছাড়া শাহিনুর পরিবারের সঙ্গে কারো কোনো দ্বন্দ্ব ছিল না। তাদের ধারণা, জমির কারণেই শাহিনুরকে সপরিবারে খুন হতে হয়েছে।
ঘটনাস্থলে গিয়ে আরো জানা যায়, জীবিত থাকা একমাত্র শিশুকন্যা মারিয়া সুলতানাকে স্থানীয় ইউপি সদস্য নাসিমা খাতুন নিরাপত্তার জন্য নিয়ে যান। পরে তিনি শিশুটিকে আত্মীয়দের কাছে হস্তান্তর করেন।
নিহত শাহিনুরের একমাত্র বোন আছিয়া খাতুন বুক চাপড়ে আহাজারি করছেন। তিনি বলছেন, ‘আমার মা ও আরেকটা ভাই এখানে থাকলে তাদেরকেও খুন করতো সন্ত্রাসীরা।’
কলারোয়া থানার ইনসপেক্টর (তদন্ত) হারান পাল জানান,  পুলিশের ধারণা, গতরাতে ছাদের চিলেকোঠা দিয়ে দুর্বৃত্তরা ঘরে ঢুকে এই চারজনকে কুপিয়ে হত্যা করেছে।
তিনি আরো বলেন, পুলিশের খুলনা রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি, সাতক্ষীরার পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মোস্তাফিজুর রহমান, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মীর্জা সালাহউদ্দিন, র‌্যাব, ডিবি, সিআইডিসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। হত্যার কারণ এখনো জানা যায়নি। ময়নাতদন্তের জন্য লাশগুলো সাতক্ষীরা সদর হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়েছে।
ঘটনাস্থল পরিদর্শনকালে সাতক্ষীরার পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘হত্যা করা হয়েছে কুপিয়ে ধারালো অস্ত্র দিয়ে একজন পুরুষ, একজন মহিলা, একটা ছেলে বাচ্চা এবং একটা মেয়ে বাচ্চাকে। আমরা এখানে এসেছি, প্রাথমিকভাবে এটাকে আমরা প্রিজার্ভ করেছি এবং কীভাবে তাদেরকে হত্যা করা হয়েছে, যে ধারালো অস্ত্রের মাধ্যমে তাদেরকে হত্যা করা হয়েছে, সেগুলো শনাক্ত করেছি। পাশাপাশি সম্ভাব্য কারা এ ধরনের ঘটনা ঘটাতে পারে অথবা কী কারণে সংঘটিত হতে পারে সেগুলো আমরা পর্যবেক্ষণ করছি এবং সেটা তদন্তসাপেক্ষে আমরা পরবর্তীতে জানাবো। তবে যে বা যারা এই ঘটনার সাথে সংশ্লিষ্ট থাকুক না কেন, তাদেরকে অনুসন্ধানের মাধ্যমে খুঁজে বের করা হবে এবং ঘটনা সঠিকভাবে তদন্ত করা হবে।’
এক প্রশ্নের জবাবে এসপি বলেন, ’সম্ভাব্য যতগুলো বিরোধ থাকতে পারে, আমরা সবগুলো পর্যবেক্ষণ করব। সবগুলোকে আমরা গুরুত্ব দিয়ে দেখবো এবং হত্যাকাণ্ড কী কারণে সংঘটিত হয়েছে, সেটা অবশ্যই তদন্তের মাধ্যমে বের করা হবে।’
তিনি আরো বলেন, ‘এখনো পর্যন্ত কাউকে আমরা প্রমাণাভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করিনি। আমরা আগে বিষয়গুলো ভালোভাবে দেখছি। দেখার পরে যদি কারো নাম আসে তখন তাদেরকে আমরা জিজ্ঞাসাবাদ করব। ঘাতক যে-ই হোক না কেন, রক্ষা পাবে না।’
এদিকে পাঁচ মাস বয়সী শিশুটির দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসক এসএম মোস্তফা কামাল। তিনি শিশু মারিয়া সুলতানাকে ইউপি সদস্য নাসিমা খাতুনের জিম্মায় রেখেছেন। এখন থেকে তার চিকিৎসা এবং জীবন গড়ার যাবতীয় দায়িত্ব জেলা প্রশাসক গ্রহণ করছে বলে ঘটনাস্থলে যেয়ে তিনি ঘোষণা দেন।
পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, নিহত শাহিনুরেরা তিন ভাই ও এক বোন, এক ভাই আশরাফুল মালয়েশিয়া থাকেন।

আরও পড়ুন