নড়াইলে নয় মাসে ১২ খুন, উদ্বিগ্ন এমপিসহ সাধারণ মানুষ

আপডেট: 07:47:04 24/09/2020



img

মৌসুমী নিলু, নড়াইল : নড়াইলে বাড়ছে সহিংসতা। ঘটছে আইন-শৃংখলার অবনতি। গত আট মাসে ১২ জন খুন হয়েছেন। চারজনের মৃত্যু রহস্যজনক। এসব সহিংস ঘটনায় আহত হয়েছেন সাড়ে তিন শতাধিক মানুষ। ভাঙচুর ও লুটপাটের শিকার হয়েছে তিন শতাধিক বাড়ি।
সম্প্রতি নড়াইল-২ আসনের এমপি মাশরাফি বিন মুর্তজা জেলা প্রশাসনের সভা কক্ষে একটি ভার্চুয়াল সভায় জেলায় ঘটে যাওয়া এসব সহিংসতায় উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি আইনশৃংখলা বাহিনীকে প্রকৃত দোষীদের গ্রেফতার করে বিচারের আওতায় আনার কথা বলেন।
জেলার পুলিশকর্তা সহিংসতার কারণ ব্যাখ্যা করেছেন। তবে তার মতে, কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ায় সংঘাত কমেছে।
জেলায় সবশেষ খুনটি হয় গত ১১ সেপ্টেম্বর। এদিন রাত নয়টার দিকে বাড়ি ফেরার পথে লোহাগড়া উপজেলার দিঘলিয়া ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক জহিরুল ইসলাম রেজওয়ানকে (২৬) কুপিয়ে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। ২৪ আগস্ট বাঁশগ্রাম ইউনিয়নের কামালপ্রতাপ গ্রামে প্রতিপক্ষের হাতে সাবেক ইউপি সদস্য বয়োবৃদ্ধ রাজ্জাক মল্লিক (৭০) নিজ বাড়িতে খুন হন।
এর আগে ১৩ মার্চ একই গ্রামের সাফি মোল্যা (৩৫) প্রতিপক্ষের হাতে নিহত হন। ২২ আগস্ট চণ্ডিবরপুর ইউনিয়নের ফুলবাড়িয়া গ্রামে প্রতিবেশির হামলায় কৃষক মফিজুর মোল্যা (৪৫) নিহত হন। ৫ আগস্ট পুরুলিয়া ইউনিয়নের দেওয়াডাঙ্গা গ্রামে মাসুদ রানা প্রতিপক্ষের গুলিতে মারা পড়েন। ১০ জুন আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে কাশিপুর ইউনিয়নের গন্ডব গ্রামের মোকতার মোল্যা (৫০), তার ভাতিজা আমিনুর রহমান হাবিল (৪৫) ও রফিকুল মোল্যা (৪০) খুন হন। ২৬ মে কলাবাড়িয়া ইউপি মেম্বর এবং ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক কাইয়ুম শিকদার আধিপত্য বিস্তার ও দলীয় কোন্দলের জের ধরে খুন হন। ১২ মে লাহুড়িয়া ইউনিয়নের ছায়মনার চর গ্রামে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে রহিমা বেগম (৫৫) নামে এক নারী খুন হন নিজ বাড়িতে।
৬ মে পহরডাঙ্গা ইউনিয়নের বল্লাহাটি গ্রামের ওসমান খানের ছেলে আলী খানকে (৪০) কুপিয়ে হত্যা করে প্রতিপক্ষরা। ২৪ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যার দিকে লোহাগড়া ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান ও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ নেতা বদর খন্দকার (৪৫) চরকালনা এলাকায় খুন হন।
১৩ সেপ্টেম্বর চণ্ডিবরপুর ইউনিয়নের নয় নম্বর ওয়ার্ড মেম্বার মাহাবুবুর রহমানকে (৩৮) রাতে ভুমুরদিয়া গ্রামে নিজ বাড়িতে ফেরার পথে দুর্বৃত্তরা কুপিয়ে ফেলে রেখে যায়। তিনি এখনো মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন। ২৩ আগস্ট মাইজপাড়া ইউনিয়নের কালুখালি গ্রামে স্বামী কর্তৃক নববধূ সুরাইয়া বেগমকে (১৮) শ্বাসরোধে হত্যার অভিযোগ ওঠে। ১০ মে পুরুলিয়া ইউনিয়নের আমতলা গ্রামের ছিদ্দিক শরীফের বাড়ির সামনে থেকে তারই মেয়েজামাই পাশের ফুলদাহ গ্রামের ইবাদত শেখের (৩৫) লাশ উদ্ধার করা হয়। তার শরীরে আঘাতের চিহ্ন ছিল।
৩ মার্চ সদর থানা পুলিশ সীতারামপুর ব্রিজ এলাকা থেকে চল্লিশোর্ধ অজ্ঞাত এক ব্যক্তির লাশ উদ্ধার করে । ওই ব্যক্তির মাথায় আঘাতের দাগ ছিল। ২৪ ফেব্রুয়ারি শহরের দুর্গাপুর এলাকায় স্বামী কর্তৃক আশা খাতুন (২০) নামে এক গৃহবধূকে শারীরিক নির্যাতন ও হত্যার অভিযোগ ওঠে।
এছাড়া শাহাবাদ ইউনিয়নের ধোন্দা, দীঘলিয়া ইউনিয়নের চর মাউলি, কাশিপুর ইউনিয়নের গন্ডব, কলাবাড়িয়া ইউনিয়নের শিবপুর, হবখালী ইউনিয়নের নয়াবাড়ি, চণ্ডিবরপুর ইউনিয়নের মহিষখোলায় বিবদমান পক্ষগুলোর সংঘর্ষে অর্ধশতাধিক ব্যক্তি আহত হন। সম্প্রতি লোহাগড়া পৌরসভার নয় নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আবদুল জলিল ও বড়দিয়া বাজারের ব্যবসায়ী খোকন সাহা গুরুতর জখম হন প্রতিপক্ষের হাতে।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির এমন অবনতিতে সংসদ সদস্য মাশরাফির পাশাপাশি উদ্বিগ জেলার সাধারণ মানুষ। তাদের অভিযোগ, পুলিশ শক্তহাতে সন্ত্রাসীদের দমন করতে ব্যর্থ হচ্ছে। সেই কারণে খুন-খারাবিসহ অপরাধ বাড়ছে।
সার্বিক এই পরিস্থিতি নিয়ে নড়াইলের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন বলেন, এখানকার গ্রামাঞ্চলগুলোতে কাইজা-দাঙ্গা প্রাচীন কাল থেকে চলছে। তিনি নড়াইলের আসার পর থেকে এসব দাঙ্গা নিয়ন্ত্রণে কাজ করে যাচ্ছেন। এর ফলে সহিংস ঘটনা কমেছে বলে দাবি করেন তিনি।
এসপি করোনার কারণে মানুষের কর্মহীন হয়ে পড়া, সামনে ইউপি নির্বাচন, গ্রাম্য আধিপত্য বিস্তার, পূর্ব শত্রুতা এবং রাজনৈতিক কোন্দলকে এসব সন্ত্রাসী ঘটনার কারণ হিসেবে দায়ী করেন।

আরও পড়ুন