নড়াইলে ফেসবুকভিত্তিক শতাধিক সফল উদ্যোক্তা

আপডেট: 08:05:00 18/07/2021



img
img
img

মৌসুমী নিলু, নড়াইল : ২০২০ সালের জানুয়ারিতে সোনিয়া ফেরদৌস জুঁথি নড়াইল শহরে একটি কিন্ডারগার্টেন স্কুলে প্রধান শিক্ষক হিসেবে কাজ শুরু করেন। তিন মাস পর করোনার প্রাদুর্ভাবের কারণে স্কুল বন্ধ হয়ে গেলে তার স্বপ্ন থমকে দাঁড়ায়। বাসায় বসে ভাবতে থাকেন নতুন কিছু করা যায় কিনা। সেই ভাবনা থেকে নিজের শিশুসন্তানের জন্য হ্যান্ড পেইন্টের একটি ফতুয়া তৈরি এবং তাকে মডেল করে ‘নকশা’ নামে একটি ফেসবুক পেইজ চালু করে তাতে পোস্ট করেন।
পোস্টে লিখে দেন, ‘এখানে ডিজাইন করা হ্যান্ড পেইন্ট পাঞ্জাবি, ফতুয়া, ফ্রক, কামিজ ও শাড়ির অর্ডার নেওয়া হয়’। সেই পোস্ট দেখে খাগড়াছড়ি থেকে এক সেনা কর্মকর্তা তিনটি পাঞ্জাবির অর্ডার দেন। সেটাই অনলাইন ব্যবসায় তার প্রথম আয়। এরপর আর থেমে থাকেননি। এবার কুরবানির ঈদে আমেরিকা, ঢাকা, নড়াইলসহ দেশের কয়েকটি জায়গা থেকে শাড়ি, পাঞ্জাবি, ত্রিপিচ এবং ফতুয়ার অর্ডার পেয়েছেন।
জুঁথি বলেন, ‘২০১৬ সালে বাংলায় মাস্টার্স করে চাকরির চেষ্টা করে ব্যর্থ হই। পরে শিক্ষকতার ইচ্ছা থেকে নিজ উদ্যোগে শহরের কুড়িগ্রাম এলাকায় ‘বেবি কেয়ার’ নামে একটি কিন্ডারগার্টেনের কার্যক্রম শুরু করলেও করোনা পরিস্থিতির কারণে সবকিছু থমকে যায়। তারপর সাহস নিয়ে হ্যান্ড পেইন্ট-এর কাজ শুরু করি। এখন কম-বেশি সফলতা পাচ্ছি। সম্প্রতি উইমেন ইন ই-কমার্স (উই), হস্তশিল্পসহ কয়েকটি গ্রুপের সদস্য হয়েছি। ইচ্ছা আছে এই পেশায় বহু দূর যাওয়ার।’
শহরের কুরিগ্রাম এলাকার মুক্তা খানম ২০১৪ সালে ব্যবস্থাপনা বিভাগে মাস্টার্স পাশ করে চাকরিতে প্রবেশ না করে নিজেই কিছু করার চিন্তা করেন। এ কাজে কিছু অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করে ২০১৯ সালের নভেম্বরে ‘স্বপ্ন কুটির’ নামে একটি ফেসবুক পেজ চালু করে পরিত্যক্ত প্লাস্টিকের পানির বোতল, খবরের কাগজ, প্লাস্টিকের ফুল, চুমকি, পুঁতি দিয়ে ঝাড়বাতি, ফুলের শো পিচ, কুঁড়েঘরসহ বিভিন্ন পণ্য তৈরি করে ফেসবুক পেজে দেন।
পরে ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের কয়েকটি জেলা থেকে পাইকারি অর্ডার পান। এরপর স্থানীয় জাওয়া বাঁশ এবং পাট দিয়ে এবং ঢাকা থেকে কাঁচামাল কিনে এনে বাসায় ফুলদানি, ট্রে, ল্যাম্পপোস্ট, টিস্যু বক্স, পাটের টিস্যু ব্যাগ, পার্টি ব্যাগ, ট্রাভেল ব্যাগ, ফটো ফ্রেম, পেন হোল্ডার, শাড়ি রাখার বাক্স তৈরি করে অনলাইনে অর্ডার নিয়ে বিক্রি করতে থাকেন।
তার কারখানায় ১৯ জন নারী কাজ করতেন। কিন্তু করোনার কারণে কারখানাটি বন্ধ হয়ে যায়। এখন এসব পণ্যই অনলাইনে অন্য জেলা থেকে কিনে এনে সেগুলো আবার বিক্রি করছেন।
মুক্তা জানান, ই-কমার্স প্লাটফর্ম দারাজেও তার বিক্রয় শপ রয়েছে। ইভ্যালি কর্তৃপক্ষও তার সাথে যোগাযোগ করছে তাদের সাথে কাজ করার জন্য।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, জুঁথি বা মুক্তার মতো নড়াইলে শতাধিক ছোট ছোট উদ্যোক্তা রয়েছেন, যারা ফেসবুক পেজ খুলে ইলেকট্রনিক পণ্য, কসমেটিক্স, ফ্যাশনসামগ্রী, ত্রিপিচ, শাড়ি ছাড়াও মাশরুম, মধু, খাবার, আচার, মেহেদিসহ বিভিন্ন পণ্য বিক্রি করছেন। এইসব উদ্যোক্তার প্রায় ৭০ ভাগই নারী।
উদ্যোক্তা মুক্তা খানম জানান, অনলাইনে কুরিয়ারের চার্জ অনেক বেশি হওয়ায় ক্রেতারা পিছিয়ে যান। তিনি কুরিয়ার চার্জ কমানোর দাবি জানান। এছাড়া উদ্যোক্তাদের কাজের স্বীকৃতি, সরকারি ট্রেনিং, আর্থিক প্রণোদনা, অনুদান বা সহজ শর্তে ঋণের দাবিও  এই নারীর।
সুন্দরবন কুরিয়ারের সঞ্জয় দাস বলেন, নড়াইলে কন্টিনেন্টাল, জননী, ইউএস কুরিয়ার সার্ভিস ছাড়াও দারাজ, পাঠাও, পেপারফ্লাই, ই-কুরিয়ার, রেডেক্সসহ আরও কয়েকটি অনলাইনভিত্তিক কুরিয়ার সার্ভিস রয়েছে। এসব কুরিয়ার প্রতিদিন অসংখ্য অর্ডার ডেলিভারি দেয়। এর একটি অংশ ফেসবুককেন্দ্রিক উদ্যোক্তার পণ্য হলেও এর প্রকৃত সংখ্যা বলা সম্ভব না।
এ ব্যাপারে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ হাবিবুর রহমান বলেন, করোনার কারণে ফেসবুককেন্দ্রিক ব্যবসা এখন যথেষ্ট জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। উদ্যোক্তারা বাড়িতে বসেই ইন্টারনেট ব্যবহার করে বিভিন্ন পণ্য ক্রয়-বিক্রয়ের সাথে যুক্ত হচ্ছেন।
তিনি বলেন, ‘উদ্যোক্তাদের সম্বন্ধে আমাদের কাছে সঠিক তথ্য নেই। তবে এটি চমৎকার উদ্যোগ। আগামীতে ছোট ছোট এসব উদ্যোক্তাকে উৎসাহ, অনুদান বা প্রণোদনা দেওয়ার ব্যাপারে আমরা পদক্ষেপ নেব।’

আরও পড়ুন