পাখির চোখে চীন দর্শন

আপডেট: 08:04:06 03/06/2020



img
img
img
img
img
img
img
img

মনজুর আহমেদ

নিঃশব্দ-নীরবতা, নত মস্তিষ্কে এক নজর দেখে চলেছেন শত শত মানুষ। কেউ নিজের ক্যাপটি খুলে হাতে ধরা, কেউ বা হাতের পুষ্পার্ঘটা যথাস্থানে রেখে হাঁটছেন। পিছে হাজার, লাখো জনতা! মাও সেতুং- চীন বিপ্লবের নেতা, যিনি শুয়ে আছেন-যেন ঘুমিয়েছেন সদ্য! চীনা জাতির মহান এ নেতা সত্তর বছর আগে লং মার্চে নেতৃত্ব করেছেন। বদলে দিয়েছেন চীনকে। এ যে তাঁরই মমি- শ্রদ্ধাবনত চিত্তে ধীর পায়ে তাইতো হেঁটে চলা লাখো জনতার।
ছোট বেলায় পড়তাম-মাও সেতুং, ১৯১৭ সালে রাশিয়ায় বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লব, ফেব্রুয়ারি বিপ্লব ও অক্টোবর বিপ্লবের অভিজ্ঞতাকে নিজ দেশে কাজে লাগিয়ে আরও কিছুটা পশ্চাৎপদ দেশ চীনকে নেতৃত্ব দেন নয়া বিপ্লবের। সমাজতন্ত্রের কর্মীরা বলতেন, চীন ছিল সাম্রাজ্যবাদ ও সামন্তবাদে নিপীড়িত ঔপনিবেশিক, আধা-ঔপনিবেশিক বা নয়া-ঔপনিবেশিক এবং আমলা-মুৎসুদ্দি (বহুজাতিক পুঁজি) পুঁজিবাদীদের দেশ। মাও সেতুং নয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লবের তত্ত্ব দিয়ে নতুন চীন বিনির্মাণ করেন।
চীন আজও তার পথ ধরে এগিয়ে চলেছে। বিশ্বব্যাপী সমাজতন্ত্রের বিপর্যয় বা পিছু হটা, বিশেষত সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়া ও পূর্ব-ইউরোপের সমাজতান্ত্রিক দেশগুলোতে পুঁজিবাদী ধারা প্রতিষ্ঠার পর সমাজতন্ত্র নিয়ে যত বিতর্ক হোক না কেন, চীন তার ভাষায় ‘বৈশিষ্ট্যময় সমাজতন্ত্র’ নিয়ে এগিয়ে গেছে বহুদূর। সত্তর বছরে বিপুল পরিমাণে দারিদ্র্য বিমোচন করে, উন্নয়ন দিয়ে গোটা বিশ্বকে নেতৃত্ব করে চলেছে।
চীনের সর্বত্রই উন্নয়ন-উন্নত রাষ্ট্রের চেহারা চোখে পড়বে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, চীনকে ‘একঘরে’ করার কোনো চেষ্টাই যে এখন পর্যন্ত কাজে লাগেনি, সেটা স্পষ্ট।
রাজধানী বেইজিংয়ের রাস্তায় চলার পথে আপনাকে মানতেই হবে বিশ্বের সবচেয়ে বড় সড়ক, লেন চীনে। সবচেয়ে বেশি সৌন্দর্যমণ্ডিত রাজধানী বেইজিং। আর একটি বিষয় না বললেই নয় যে, গোটা চীন নানা ফুলেল সৌন্দর্যে নিজেকে সাজিয়েছে। অন্তত যে তিনটি/চারটি প্রভিন্স বা প্রদেশের গোটা দশেক বা তারও বেশি শহরে আমরা ভ্রমণ করেছি, তাতে অন্তত সেটাই মনে হয়।
২২ আগস্ট মধ্যাহ্নে ঢাকায় চীন অ্যাম্বাসির দাওয়াত পেয়ে পরেরদিন পাসপোর্ট জমা, ২৫ আগস্ট ভিসা নিয়ে সে রাতেই ঢাকা ত্যাগ করি আমরা নয় সাংবাদিক। আমাদের দলে ছিলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ডেপুটি প্রেস সেক্রেটারি মিয়া মোহাম্মদ হাসান জাহিদ তুষার, কালের কণ্ঠের সম্পাদক ও সাহিত্যিক, উপন্যাসিক ইমদাদুল হক মিলন, বাসসের সিনিয়র রিপোর্টার আনিকা রহমান, যমুনা টিভির সিনিয়র রিপোর্টার ভাস্কর ভাদুড়ী, রংপুর লাইভ নিউজের ব্যুরো চিফ মোহাম্মদ সাজেদুর রহমান তালুকদার, রেডিও ঢোলের সজীব বড়ুয়া, আরটিভির সিনিয়র রিপোর্টার আবেদা সুলতানা মুক্তা, বাংলাভিশনের সিনিয়র রিপোর্টার আবু হেনা ইমরুল কায়েস এবং আমি।
ভ্রমণসূচিতে তিয়েন আনমেন স্কয়ার ও মাও সেতুংয়ের মমি দেখতে যাওয়ার সুযোগ ছিল না। তবে বেইজিং পৌঁছে আমাদের গাইড ও এজেন্সিকে বলতেই তাঁরা সম্মত হন। তবে তাঁরা বলেন, এর জন্য আমাদের ঘণ্টা তিনেক মানুষের ঢলের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকতে হতে পারে। আমরা তাতেই সম্মত হই। যদিও চীন সরকারের আমন্ত্রণে এই সফর হওয়ায় বিশেষ সুযোগ মেলে, এক ঘণ্টার মধ্যেই মহান নেতার মমি দেখে ফিরতে পারি।
চীনের এ যে উন্নয়ন-অর্থনৈতিক ও সামাজিক অগ্রগতি, সেটা সম্পর্কে আগে থেকে কিছু ধারণা ছিল। সারা বিশ্বের সচেতন জনগণ মাত্রই জানেন, চীন আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে সবচেয়ে বড় শক্তি। লোকসংখ্যার দিক থেকেও বিশ্বে এক নম্বর দেশ। এমন কোনো পণ্য নেই-যা চীন তৈরি করতে না পারে। এই যে ১৪০ কোটি মানুষের দেশ ও তার উন্নয়ন হয়েছে চীনের ওই বৈশিষ্ট্যময় সমাজতন্ত্র দিয়েই। সাধ্য অনুযায়ী শ্রম, শ্রম অনুযায়ী প্রাপ্তি- এ তত্ত্ব নিয়ে যে সমাজতন্ত্রের যাত্রা চীনে সত্তর বছর আগে শুরু হয়েছিল, শ্রম শোষণ কিম্বা উদ্বৃত্ত বিতরণে কতটা অগ্রগতি হলো সে বিতর্ক করা যায়, তবে তাদের বৈশিষ্ট্যময় অগ্রযাত্রার অগ্রগতি বিশ্ববাসী দেখে চলেছে।
এক তরুণ পার্টি কমরেডকে প্রশ্ন করেছিলাম, এই যে তোমাদের দেশে আলিবাবা বা এমন বিলিয়নিয়ারের সংখ্যা বেড়েছে, তো সমাজতন্ত্র-সাম্যবাদের যে পথ-ধারণা, সত্তর বছরে সেদিকে কতটা আগালে? জবাবটা ছিল এমন- ‘আমার দাদা বলেন, তাঁরা কারোর সঙ্গে দেখা হলে প্রথম জিজ্ঞাসা করতেন, তুমি কি আজ কিছু খেয়েছো? এটাই ছিল তাদের প্রথম কুশলবিনিময়। কিন্তু, এখন আমাদের অর্জনটা তো দেখবে।’ এই যে কুশলবিনিময়ের কথা, তা পরে একাধিক প্রবাসী বাঙালিও বললেন।

অর্থনীতির চিত্র
২০১৮ সালে বিশ্বব্যাংকের তথ্য হচ্ছে, চীনে এক কোটি ৬৬ লাখের মতো মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে রয়েছে। আগামী কয়েক বছরে যা কাটাতে নানা কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে।
চীন বর্তমানে বিশ্বের বৃহত্তম অটোমোবাইল প্রস্তুতকারক দেশ। যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে দ্বিগুণ মোটরগাড়ি উৎপাদন করে দেশটি। ইন্টারনেট ঘাঁটাঘাঁটি করলে জানা যায়, ’৭০ দশকে চীনের রাস্তায় গাড়ি ও ট্রাক দেখতে পাওয়াটা ছিল বিরল ঘটনা। রাস্তাঘাট ছিল নোংরা ও ভাঙাচোরা। চার দশকে অর্থনীতিতে অলৌকিক উন্নতি করে দেশটি।
দেং জিয়াও পিং ১৯৭৮ সালের ডিসেম্বরে দেশটির অর্থনৈতিক উন্নয়নের রোডম্যাপ তৈরি করেন। সেসময় চীনের মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) ছিল মাত্র ১৫ হাজার কোটি ডলার। চল্লিশ বছর পর জিডিপি ১২ লাখ কোটি ডলার ছাড়িয়ে যায়। চীনের সামনে রয়েছে শুধু যুক্তরাষ্ট্র।
’৮০ দশকের আগে দেশটিতে কোনো বিলিয়নিয়রই ছিল না। ২০১৮ সালে তথ্য হচ্ছে, ৬০০ বিলিয়নিয়রের দেশ চীন; যা বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে বেশি। দেশটিতে মিলিয়নিয়রের সংখ্যা ২০ লাখ। বিশ্বের মোট সম্পদের ১০ শতাংশ চীনের দখলে। গত ২০ বছরে প্রাপ্তবয়স্ক চীনা নাগরিকের মাথাপিছু আয় চার গুণ হারে বেড়েছে।

ফরবিডেন সিটি
তিয়েন আনমেন স্কয়ারে মাও সেতুংকে শ্রদ্ধা জানিয়ে আমরা আগাতে থাকি ফরবিডেন সিটি বা নিষিদ্ধ শহরের দিকে।
ব্রিটেন ও ইতালির যৌথ প্রযোজনার চলচ্চিত্র ‘দ্য লাস্ট অ্যাম্পেরর’-তে চীনের শেষ সম্রাট পুই-এর জীবনের কিছু অংশবিশেষ দেখানো হয়েছে। চলচ্চিত্রটির কিছু অংশ এই নিষিদ্ধ শহরে শুটিং করা হয়। বেইজিংয়ের কেন্দ্রস্থলে ১৮০ একরের এই এলাকাটি ফরবিডেন সিটি বা নিষিদ্ধ শহর।
ইন্টারনেট ঘেঁটে ও আমাদের গাইডের তথ্য মতে জানা গেল, অতীতে দেশটির সাধারণ প্রজা তো বটেই, রাজপরিবারের সব সদস্যেরও এ শহরে প্রবেশের অনুমতি ছিল না। শুধু সম্রাট সেখানে সর্বত্র যেতে পারতেন। সম্রাট বিশেষ বিশেষ দিনে কতক জায়গাতে এসে কোনো বিশেষ ঘোষণা দিতেন প্রজাদের জন্য।
মিং রাজবংশের ইয়ংলি সম্রাট ১৪০৬ সালে এ শহর নির্মাণ কাজ শুরু করেন। শেষ হয় ১৪ বছরে। এরপর প্রায় ৫০০ বছর এই শহরটি ছিল চীনের রাজধানী। এ নিষিদ্ধ শহরে ২৪ জন সম্রাট থেকেছেন। শহরটি নিয়ে এখনও অনেক তথ্য অজানা। রয়েছে অনেক রহস্য। শহরের রয়েছে ৯৮০টি বাড়ি। যার নয় হাজার ৯৯৯টি কক্ষ রয়েছে বলে জনশ্রুতি আছে।
মূলত কাঠ দিয়ে তৈরি এই বাড়িগুলো। তবে বিগত ৫০০ বছরে চীনে ছোট-বড় বেশকিছু ভূমিকম্পেও মাথা উচু করে দাঁড়িয়ে আছে স্থাপনাগুলো। বাড়িগুলোর ছাদে, দেয়ালে ও বিভিন্নস্থানে ব্যবহৃত ফিনিক্স, ড্রাগন ও অন্যান্য পৌরাণিক জীব-জন্তুর প্রতিকৃতি বা ভাস্কর্যের ব্যবহার নিয়ে রয়েছে নানা রহস্য। বলা হয়, এগুলো ব্যবহার করা হয়েছে প্রতীক হিসেবে। প্রাচীন চীনে প্রতীকের ব্যবহার খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এসব প্রতীকের মধ্যে অনেক দিকনির্দেশনা রয়েছে বলেও মনে করা হয়।
১৯১২ সালে চীনে রাজবংশের পতনের পর শহরটিকে জাদুঘর হিসেবে ঘোষণা করা হয় ১৯২৫ সালে। এরপর, এ শহরের রূপ-সৌন্দর্যের পাশাপাশি দর্শনার্থীরা খুঁজতে থাকেন নানা রহস্যের উত্তর।
অসাধারণ নির্মাণশৈলী এবং সমৃদ্ধ ইতিহাস থাকায় নিষিদ্ধ শহরটি এখন ইউনেস্কো ঘোষিত বিশ্ব ঐতিহ্য।

চীনা প্রাচীর
বিশাল পাহাড়ের উপর দিয়ে বিস্ময়করভাবে তৈরি হয়েছে চীনের প্রাচীর! হাজার হাজার এমনকি বলা হচ্ছে, লাখ মাইল পর্যন্ত এই প্রাচীর নির্মাণ করা হয়। হাজার বছর (সময় নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন মত আছে) আগে চীনের এই প্রাচীর তৈরি হয়েছিল বহিঃশত্রুর হাত থেকে রক্ষা পেতে। চীনা জনগণ (বাধ্য হয়েছিল বলে মত আছে) এই মহাপ্রাচীর তৈরি করে। হাজার বছর ধরে সম্রাটরা এটা তৈরি করে গেছেন।
মঙ্গোলিয়ান এবং আরও কিছু পশুপালক জাতিসত্তার আক্রমণের হাত থেকে রক্ষা পেতে এই প্রাচীর। এসব অঞ্চলে যে ফসল হতো, বহিঃশত্রুরা তা পঙ্গপালের মতো আক্রমণ করে কেটে নিয়ে যেত। হঠাৎ এসব আক্রমণে হত্যা করা হতো এলাকাবাসীকে।
মতভিন্নতায় যে বলা হচ্ছে, লাখ মাইল জুড়ে এই প্রাচীরের দেখা মেলে। তবে, লাখ মাইল জুড়ে মানে এটা নয় যে, সেটা টানা ছিল। বরং দেখা গেছে, টানা কয়েক মাইল জুড়ে প্রাচীরের পর একটা গ্যাপ অর্থাৎ বেশ কিছুটা অংশ আবার প্রাচীর নেই। আবার কিছু দূর থেকে প্রাচীর তৈরি হয়েছে। সেই যেটুকু যেটুকু প্রাচীর মিলেছে তা যোগ করলে নাকি লাখ মাইল হয়েছিল।
আমাদের চীনা গাইড কুন অবশ্য বলছিলেন, ছয় হাজার তিনশ' কিলোমিটার প্রাচীরের অস্তিত্ব এখনও রয়েছে। ইন্টারনেটে চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদ মাধ্যম সিনহুয়ার বরাত দিয়ে ’১২ সালের জুন মাসে একটি সংবাদ প্রকাশ হয় দেশের কয়েকটি অনলাইন সংবাদপত্রে। সেখানে চীনা প্রাচীর ২১ হাজার ১৯৬ কিলোমিটার উল্লেখ করা হয়।
মঙ্গোলিয়ানদের আক্রমণের হাত থেকে রক্ষা পেতে প্রাচীরের নির্দিষ্ট দূরত্বে কামান বসানো হয়। প্রাচীরের ওপর সৈন্যবাহিনী পাহারা দিত সর্বক্ষণিক। প্রাচীরের নির্দিষ্ট স্থানে শুয়ে নির্দিষ্ট ফোকরে অস্ত্র রেখে সৈন্যরা তাদের জাতি ও সম্পদকে পাহারা দিয়েছে।
চীনা প্রাচীর বিশ্বের সপ্তম আশ্চর্যের অন্যতম।
২৯ আগস্ট বেলা ১১টার দিকে চীনা প্রাচীরে উঠতে উঠতেই বিস্ময় ধরে যায়। আমরা উঠি মিউশিয়ানয়্যু (Mutianyu) এলাকা থেকে ক্যাবল কারে। ঘণ্টা দুয়েক মতো সময় কাটে প্রাচীরে। পরে নেমে আসি স্লিপারের মতো একটা ছোট বাহনে, যাকে বলা হয় টোবোগান (Toboggan)। বাংলায় বলা হচ্ছে স্লেজগাড়ি। বাচ্চাদের ছোট খেলনার মতো যানটিতে বসে হ্যান্ডেল ধরে থাকি। গতি কমাতে হ্যান্ডেলটি কাছে টানলে ব্রেক হয়, আর গতি বাড়াতে হ্যান্ডেলটি দূরে ঠেলে দেওয়া- এভাবে নেমে আসি।

পোড়ামাটির সৈন্যবাহিনী
৩১ আগস্ট সকালে আমরা পোড়ামাটির তৈরি টেরাকোটা আর্মির প্রত্নতত্ত্ব নিদর্শন বা পুরাকীর্তি দেখতে যাই। চীনের উত্তর-পশ্চিম অঞ্চলের প্রদেশ সিয়ানে এই পোড়ামাটির টেরাকোটা সৈন্যবাহিনী আবিষ্কার হয় ১৯৭৪ সালের ২৯ মার্চ। প্রথম চীন সম্রাট কিন শি এর সমাধিস্থল থেকে প্রায় এক মাইল দূরে একদল কৃষক কুয়া খননের সময় প্রথম এটি দেখতে পায়। স্থানটি ভূগর্ভস্থ জলাধারের সঙ্গে মিলেমিশে ছিল। কয়েক শতাব্দী ধরে মাঝে-মধ্যে এই স্থানে পোড়ামাটির খণ্ডিত অংশ, ইট ও অন্যান্য ভবন নির্মাণ সামগ্রী পাওয়া যেত।
টেরাকোটা আর্মি হচ্ছে দলবদ্ধভাবে প্রাপ্ত প্রাচীন চৈনিক মৃৎশিল্পের সবচেয়ে বৃহৎ নিদর্শন। এখানে সৈন্যবাহিনী এবং ঘোড়সওয়ারসদৃশ পোড়ামাটি দিয়ে তৈরি সারিবদ্ধ মূর্তি রয়েছে। সম্রাটের মৃত্যুর পর তার সমাধিস্থলে এই মূর্তিগুলো নির্মাণ করা হয়। তৎকালীন বিশ্বাস মতে এই সৈন্যবাহিনী সম্রাট কিন-এর মৃত্যুর পরবর্তী জীবনে তার নিরাপত্তা বিধান করবে- এমন মানসিকতায় পোড়ামাটির সৈন্যবাহিনীর মূর্তি তৈরি করা হয়।

হুয়াওয়ে কোম্পানিতে
হুয়াওয়ে টেকনোলজিস কোম্পানি লিমিটেড, চীনের একটি বহুজাতিক প্রযুক্তি সংস্থা যা টেলিযোগাযোগ কোম্পানি। বাংলাদেশে হুয়াওয়ের মোবাইল ফোনের বেশ বড় ও জমজমাট ব্যবসা রয়েছে, রয়েছে কোম্পানি কার্যালয়। এই কোম্পানির প্রধান কার্যালয় চীনের গুয়াংডং প্রদেশের শেনজেনে অবস্থিত। ৩ সেপ্টেম্বর বিকালে আমরা কোম্পানি পরিদর্শনে যাই। কোম্পানির নতুনভাবে নির্মিত বিশাল এলাকাতে আমরা ভ্রমণ করি। কোম্পানির বিশাল এলাকাজুড়ে লেক তৈরি করা হয়েছে। এখানে কোম্পানির নিজস্ব গবেষণাগারসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এখানে ইউরোপের বিভিন্ন শহর যেমন-প্যারিস, লন্ডনসহ অন্যান্য শহরের আদলে ছোট ছোট সিটি গড়ে তোলা হয়েছে। পুরো এলাকা ঘুরে দেখা ও কর্মরতদের যাতায়াতের সুবিধার্থে ভেতরে আছে তিন-চার বগিসম্পন্ন আধুনিক রেল যোগাযোগ, রয়েছে বাস সার্ভিস। লেকসহ পুরো এলাকাটি সাজানো হয়েছে অপরূপ সৌন্দর্য্যে।

থিয়েটার প্রদর্শনী
বেইজিংয়ে প্রথম দিন অর্থাৎ ২৬ আগস্ট সন্ধ্যায় আমরা দেখতে যাই বিখ্যাত কুংফু নিয়ে রেড থিয়েটারে আয়োজিত প্রদর্শনী। কুংফু যে এভাবে স্টেজ ড্রামা আকারে দেড় ঘণ্টা ধরে পরিবেশন করা যায় এবং দর্শকেরা মুগ্ধ নয়নে, মন-প্রাণ দিয়ে তা উপভোগ করে এটা আমাদের কল্পনার অতীত ছিল।
আর ৩১ আগস্ট চীনের উত্তর-পশ্চিমের প্রদেশ সিয়ানে আমরা তাং ডাইনেস্টি সময়কালের সিল্ক রোডের ওপর লাইভ থিয়েটার 'লিজেন্ড অব দ্য ক্যামেল বেল' প্রদর্শনী দেখি।
সর্বশেষ আধুনিক প্রযুক্তির ভিডিও ওয়াল, লাইটিং, সাউন্ড, সঙ্গে ঘটনা প্রবাহ আমাদের চোখের পাতাকে স্থির করে দেয়। রাতে হোটেলে ফিরেও আমাদের সে ঘোর কাটাতে সময় লাগে।

গণমাধ্যম ও গবেষণা সংস্থার সঙ্গে বৈঠক
চীন ভ্রমণে আমাদের সুযোগ হয় চায়না রেডিও ইন্টারন্যাশনাল এবং চায়না ডেইলি পরিদর্শন ও সেখানকার সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়ের।
একইসঙ্গে আমরা সরকারি সংস্থা চায়না ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যাডিজের সঙ্গেও মতবিনিময় করি। এসব আলোচনার মধ্যে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের অগ্রগতি নিয়েও মত প্রকাশ করা হয়।
জানা যায়, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সাম্প্রতিক চীন সফর দু-দেশের সম্পর্ক উন্নয়নে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। সফরকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দেওয়া উষ্ণ অভ্যর্থনা সাম্প্রতিক সময়ে বিশেষভাবে নজর কাড়ে। বলা হয়, বাংলাদেশের সঙ্গে চীনের বর্তমান সম্পর্ক অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে নিবিড় এবং দুই দেশে নেতাদের মধ্যে যে নিবিড় সম্পর্ক হয়েছে তা সম্পর্ককে আরও বেশি সংহত করতে সহায়তা করবে।
মতবিনিময়কালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ডেপুটি প্রেস সেক্রেটারি মিয়া মোহাম্মদ হাসান জাহিদ তুষার ও দৈনিক কালের কণ্ঠের সম্পাদক ইমদাদুল হক মিলন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংসহ সে দেশের সরকার ও জনগণকে অভিনন্দন জানান ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তাঁরা আশা প্রকাশ করেন, দু-দেশের মধ্যকার বর্তমান সম্পর্ক উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাবে। পারস্পারিক সফরের মাধ্যমে দুই দেশের জনগণের ইতিবাচক মনোভাব, আস্থা এবং শ্রদ্ধাবোধ বাড়বে। হাসান জাহিদ বাংলাদেশে বহুসংখ্যক উন্নয়ন প্রকল্পে চীন সরকারের দেওয়া সহায়তা বাংলাদেশের জনগণ শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করে বলে উল্লেখ করেন।
ভ্রমণ বা সফরের অংশ হিসাবে আমরা গুয়ানঝো প্রদেশে মুসলমানদের দুটি মসজিদ, সিয়ান প্রদেশে বৌদ্ধদের দুটি প্যাগোডা এবং গুয়ানঝোতে ফাইভ রাম মূর্তি দেখতে যাই। গুয়ানঝোতে রাত্রিকালীন নৌবিহারে নৈশভোজ ও বিশ্বের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ক্যানটন টাওয়ারের উপরে উঠে শহরের সৌন্দর্য্য অবলোকন করি।

[লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক। পরীক্ষামূলক সম্প্রচারে থাকা রংধনু টিভির প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা]