পানিফলে অধিক লাভের স্বপ্ন

আপডেট: 01:26:39 11/10/2021



img
img

আব্দুস সামাদ, সাতক্ষীরা: দক্ষিণের নিম্ন এলাকায় পানিফল বা পানি সিঙাড়া সম্ভাবনাময় চাষ হিসেবে দেখা দিয়েছে। আর তাই এ চাষ করে কৃষক ব্যাপক লাভের স্বপ্ন দেখছেন।
কৃষি বিভাগ থেকে পাওয়া তথ্য মতে, পানিফল একটি সুস্বাদু ও পুষ্টিকর ফল।
সাতক্ষীরা জেলার সদর, কলারোয়া, দেবহাটা, কালিগঞ্জ, আশাশুনি, সদরের আংশিক ও শ্যামনগর উপজেলায় জলাবদ্ধ এলাকার চাষিরা পানিফল চাষ করে অধিক লাভবান হচ্ছেন। ফলে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে এ ফলের চাষ। সেই সাথে বাড়ছে ফলটির জনপ্রিয়তা।
সুস্বাদু ও পুষ্টিকর এ ফল সারাদেশে ফল হিসেবে পরিচিতি না থাকলেও দিনে দিনে এর চাহিদা বাড়তে শুরু করেছে। পানিফল চাষ লাভজনক হওয়ায় প্রতিবছর দেবহাটাসহ সাতক্ষীরা জেলার চাষিরা আগ্রহী হয়ে উঠেছে। মৌসুমি ফল হিসেবে সাতক্ষীরা জেলার বিভিন্ন উপজেলাতে ব্যাপকভাবে চাষ হচ্ছে।
দেবহাটা উপজেলা কৃষি অফিসের হিসেবে এবছর ২০ থেকে ২২ হেক্টর জমিতে পানিফলের চাষ হয়েছে। বিগত বছরের তুলনায় জেলার সব উপজেলার পাশাপাশি দেবহাটা উপজেলার সখীপুর, গাজিরহাট, কামটা, কোঁড়া, দেবহাটা, পারুলিয়া, কুলিয়া, বহেরাসহ বিভিন্ন এলাকায় ফলটির চাষ করা হয়েছে। এ ফল চাষ ফসল চাষের জমি, ডোবা, খানা, মাছের ঘেরে সুবিধাজনক। সামান্য লবণাক্ত ও মিষ্টি  পানিতে চাষ করার সুযোগ থাকায় দিনে দিনে চাষের পরিধি বেড়ে চলেছে। তাছাড়া পানিফলগাছ দেখতে কচুরিপানার মতো পানির ওপরে ভেসে থাকে, পাতার গোড়া থেকে শিকড়ের মতো ডগা বের হয়ে বংশ বিস্তার করে এবং তা থেকে ফল ধারণ করে। পানিফল চাষে খুব বেশি প্রশিক্ষণের প্রয়োজন হয় না, সার ও কীটনাশকের পরিমাণ কম লাগে।
উপজেলার পানিফল চাষি মোনাজাত সরদার বলেন, ‘গতবছর অল্প চাষ করছিলাম। এবছর তিনবিঘার বেশি জমিতে পানিফল চাষ করছি। ভালো ফলন হলে আগামিতে আরো বেশি জমিতে এ চাষ করবো।’
এছাড়া উপজেলার বিভিন্ন এলাকার চাষিদের সাথে কথা বললে তারা জানান, পানিফল মৌসুমি ও অঞ্চলভিত্তিক হওয়ায় সঠিক মূল্যপ্রাপ্তি নিশ্চিত ও বাজার তৈরি হয়নি। এটি দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মৌসুমি ফল হিসেবে ব্যাপকভাবে বাণিজ্যিকভিত্তিতে চাষ হলে বাজার তৈরি হবে।
কামটা গ্রামের পানিফল ব্যবসায়ী খোকন বাবু সরদার বলেন, চাষের মৌসুম আসার আগে তিনি অর্ধ শতাধিক চাষির মাঝে অর্থ বিনিয়োগ করেন। পরবর্তীতে ফলন আসার পরে বাজারদর অনুযায়ী উৎপাদিত ফসল কিনে নেন। এভাবে ৭-৮ বছর তিনি পানিফল ব্যবসায় নিয়োজিত আছেন। প্রতিদিন তিনি ঢাকা, খুলনা, বরিশাল, বরগুনা, চট্টগ্রাম, সিলেট, রাজশাহী, বেনাপোল, যশোরসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় এ ফল পাঠান। বর্তমানে জেলার বাইরের বাজারে ৪০০-৬০০ টাকা মণ দরে পাইকারি বিক্রি করছেন। তাছাড়া স্থানীয় বাজারে বর্তমানে খুবই কম দরে পানিফল পাওয়া যাচ্ছে।
এ বিষয়ে দেবহাটা উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা শওকত ওসমান বলেন, ‘পানিফল চাষ এখনো কৃষি ফসলেরও আওতায় ধরা হয়নি। তবে মৌসুমি ফল হিসেবে গণ্য হচ্ছে। আমরা সর্বদা চাষিদের পরামর্শ দিয়ে থাকি। তাছাড়া একদিকে কম খরচ, অন্যদিকে অল্প পরিশ্রমে বেশ লাভবান হওয়ায় ফলটি চাষে আগ্রহী হয়ে উঠছে চাষিরা।’

পানিফলের পরিচিতি ও উপকারিতা: কৃষি বিভাগ ও ইন্টারনেট থেকে পাওয়া তথ্যমতে, পানিফলের আদিনিবাস ইউরোপ, এশিয়া ও আফ্রিকা হলেও এর প্রথম দেখা পাওয়া যায় উত্তর আমেরিকায়। বাংলাদেশের সাতক্ষীরা জেলায় পানিফলের বাণিজ্যিকভাবে চাষ অনেক আগেই শুরু হয়েছে। পানিফল একটি বর্ষজীবী জলজ উদ্ভিদ। জলাশয় ও বিল-ঝিলে এ ফলটি জন্মে। এর শেকড় থাকে পানির নিচে মাটিতে এবং পাতা পানির ওপর ভাসতে থাকে। এক একটি গাছ প্রায় পাঁচ মিটার পর্যন্ত লম্বা হতে পারে। পানিফলের আরেক নাম ‘সিঙাড়া’।
চাষ শুরু হয় ভাদ্র-আশ্বিন মাসে এবং ফল সংগ্রহ করা হয় অগ্রহায়ণ-পৌষ মাসে। পানিফল কচি অবস্থায় লাল, পরে সবুজ এবং পরিপক্ক হলে কালো রং ধারন করে। ফলটির পুরু নরম খোসা ছাড়ালেই পাওয়া যায় হৃৎপিণ্ডাকার বা ত্রিভুজাকৃতির নরম সাদা শাঁস। কাঁচা ফলের নরম শাঁস খেতে বেশ সুস্বাদু। প্রতি ১০০ গ্রাম পানিফলে ৮৪.৯ গ্রাম পানি, ০.৯ গ্রাম খনিজ পদার্থ, ২.৫ গ্রাম আমিষ, ০.৯ গ্রাম চর্বি, ১১.৭ গ্রাম শর্করা, ১০ মিলিগ্রাম ক্যালসিয়াম, ০.৮ মিলিগ্রাম লৌহ, ০.১১ মিলি গ্রাম ভিটামিন বি-১, ০.০৫ মিলিগ্রাম ভিটামিন বি-২ ও ১৫ মিলিগ্রাম ভিটামিন ‘সি’ রয়েছে। তাছাড়া এ ফলে ৬৫ কিলোক্যালরি খাদ্যশক্তি থাকে। পানিফলে পর্যাপ্ত পরিমাণ ক্যালসিয়াম রয়েছে। দেহের প্রয়োজনীয় খনিজ লবণগুলোর মধ্যে ক্যালসিয়াম অন্যতম। ফসফরাসের সহযোগিতায় শরীরের হাড় ও দাঁত গঠন এবং মজবুত করা ক্যালসিয়ামের প্রধান কাজ। লৌহ অত্যন্ত জরুরি একটি খনিজ লবণ। লৌহের অভাবে মানবদেহে অপুষ্টিজনিত রক্তশূন্যতা দেখা দেয়। ছোট ছেলেমেয়ে এবং গর্ভবতী ও প্রসূতিরা অতি সহজে রোগের শিকার হয়। পানিফলে যথেষ্ট পরিমাণে লৌহ পাওয়া যায়। প্রতি ১০০ গ্রাম পানিফলে ভিটামিন ‘সি’ এর পরিমাণ ১৫ মিলিগ্রাম আর শসাতে আছে ভিটামিন ‘সি’ মাত্র ৫ মিলিগ্রাম। ভিটামিন ‘সি’ শরীরে চামড়া, দাঁত ও মাড়ির স্বাস্থ্য রক্ষায় অপরিহার্য। তাছাড়া ভিটামিন ‘সি’ অন্ত্রে লৌহ শোষণে সাহায্য করে। বাংলাদেশের শতকরা ৯৩ ভাগ পরিবার ভিটামিন ‘সি’ এর অভাবে ভুগছে। খাদ্যে ভিটামিন ‘সি’ এর ঘাটতি বিবেচনা করে এ ফলের প্রতি আমাদের অধিকতর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। পানিফল কাঁচা খাওয়া হয়, তবে সিদ্ধ করেও খাওয়া যায়। কাঁচা পানিফল বলকারক দুর্বল ও অসুস্থ মানুষের জন্য সহজপাচ্য খাবার। ফলের শুকনো শাঁস দিয়ে রুটি তৈরি করে খেলে অ্যালার্জি ও হাত-পা ফোলা রোগ উপশম হয়। পিত্তপ্রদাহ, উদরাময় ও তলপেটের ব্যথা উপশমে পানিফল খাওয়ায় প্রচলন রয়েছে। বিছাপোকা কামড়ের যন্ত্রণায় থেঁতলানো কাঁচা ফলের প্রলেপ দিলে উপকার পাওয়া যায়। পানিফল খুব লাভজনক একটি ফসল। এর উৎপাদন খরচ খুব কম।

আরও পড়ুন