পেঁয়াজে ভারত-নির্ভরতা কি কাটানো সম্ভব

আপডেট: 09:26:12 30/11/2019



img

আকবর হোসেন

যেসব ভোগ্যপণ্যের জন্য বাংলাদেশের ভোক্তারা ভারতের ওপর অনেক নির্ভরশীল তার মধ্যে পেঁয়াজ অন্যতম। ভারত পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ করে দেওয়ার পর বাংলাদেশের বাজারে পেঁয়াজের দাম এখন আকাশচুম্বী।
ভারতে নরেন্দ্র মোদি সরকার ক্ষমতাসীন হাওয়ার পরে সেদেশ থেকে বাংলাদেশে গরু আসা বন্ধ প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। এর বড় ধরনের প্রভাব পড়ে বাংলাদেশে।
গরুর মাংসের দাম এক লাফে কেজি প্রতি ৫৫০ থেকে ৬০০ টাকা পর্যন্ত পৌঁছে যায়।
তীব্র সংকট তৈরি হয় কুরবানির পশু সংগ্রহের ক্ষেত্রে। প্রথম দুই বছর এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল যে, কুরবানির জন্য গরু খুঁজে পাওয়া মুশকিল হয়েছিল অনেকের জন্য।
এই সংকটের কারণে গত কয়েক বছরের মধ্যেই বাংলাদেশে অনেক গরুর খামার গড়ে ওঠে। গত দুই বছর ধরে বাংলাদেশের কুরবানির পশুর বাজার ভারতের ওপর নির্ভরশীল নয়।
পেঁয়াজের এই নজিরবিহীন মূল্য বৃদ্ধি যে প্রশ্নে জন্ম দিয়েছে সেটি হচ্ছে, ভারতের ওপর যে নির্ভরশীলতা তৈরি হয়েছে, সেখান থেকে বাংলাদেশ কি বেরিয়ে আসতে পারবে?
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়র অর্থনীতির অধ্যাপক সায়মা হক বিদিশা বলেন, "আমাদের কখনোই উচিত হবে না একটি বাজারের ওপর নির্ভরশীল হওয়া।"
তিনি বলেন, পেঁয়াজ আমদানির ক্ষেত্রে শুধু ভারতের ওপর নির্ভরশীল না থেকে বিকল্প বাজারও খুঁজতে হবে। তাছাড়া বাংলাদেশের ভেতরেও পেঁয়াজের উৎপাদন বাড়ানোর বিকল্প নেই বলে তিনি উল্লেখ করেন।
অধ্যাপক বিদিশার মতে, পেঁয়াজের জন্য ভারতের ওপর বাংলাদেশের নির্ভরশীলতা তৈরি হওয়ার একটি দুটো কারণ রয়েছে।
প্রথমত, ঐতিহাসিকভাবে ভারত থেকে বাংলাদেশে পেঁয়াজ আমদানি হচ্ছে। দ্বিতীয়ত, ভারতের পেঁয়াজের গুণগত মান এবং দাম বিবেচনা করলে ভারত থেকে পেঁয়াজ আমদানি করা বাংলাদেশের জন্য লাভজনক।

বাংলাদেশ কি ভারত-নির্ভরতা কাটাতে পারবে
কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. নাসিরুজ্জামান মনে করেন, ভারত থেকে গরু আসা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর বাংলাদেশের খামারিরা যে সফলতা দেখিয়েছেন, সেটি পেঁয়াজ উৎপাদনের ক্ষেত্রেও সম্ভব।
"প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশে পেঁয়াজ যে পরিমাণ উৎপাদন হয়, ভারত থেকে যদি পেঁয়াজ না আসতো তাহলে হয়তো বাংলাদেশের কৃষক উৎপাদিত পেঁয়াজের ভালো দাম পেত"
কৃষি সচিব বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশের কৃষকরা তাদের উৎপাদিত পেঁয়াজের ক্ষেত্রে কেজিপ্রতি ১০-১২ টাকা পায়। ভারত থেকে পেঁয়াজ না এলে বাংলাদেশের কৃষকরা প্রতি কেজি পেঁয়াজে ৩০-৩২ টাকা পেত।
সরকারি হিসেবে বাংলাদেশে বর্তমানে ২৩ লাখ টন পেঁয়াজ উৎপাদন হয়। কিন্তু পেঁয়াজ ঘরে তোলার সময় প্রায় পাঁচ লাখ টন নষ্ট হয়ে যায়। অর্থাৎ ১৯ লাখ টন পেঁয়াজ বাজারে থাকে।
অন্যদিকে, বিদেশ থেকে আমদানি হয় ১১ লাখ টন। কিন্তু বাংলাদেশে প্রতিবছর ৩০ লাখ মেট্রিক টন পেঁয়াজ প্রয়োজন।
"আমাদের চাষিদের যে সক্ষমতা আছে, সেক্ষেত্রে তারা খুব সহজেই ৩০ লাখ মেট্রিক টন পেঁয়াজ উৎপাদন করতে পারে। সেক্ষেত্রে আমরা বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে বলেছি যখন চাষিরা পেঁয়াজ উৎপাদন করে বাজারে নিয়ে আসবে, তখন যেন ভারত থেকে আপাতত পেঁয়াজ আমদানি বন্ধ রাখে," বলছিলেন কৃষি সচিব।
তিনি বলেন, কৃষকরা যদি পেঁয়াজের দাম পায়, তাহলে পরবর্তী বছর আরো বেশি পেঁয়াজ উৎপাদন করবে।
বাংলাদেশের যদি পেঁয়াজ উৎপাদনের মাধ্যমে চাহিদা পূরণের সক্ষমতা থাকে, তাহলে এতোদিন সেটি না করে ভারতের ওপর নির্ভরশীল হয়ে থাকলো কেন?
কৃষি সচিব বলছেন, বিষয়টি নিয়ে অতীতে ভিন্ন চিন্তা করা হয়নি।
"কৃষক যখন উৎপাদন করে তখন বিদেশ থেকে আমদানি করলে দাম অনেক নেমে যায়। এটা যাতে না হয়। এটা হলে পরবর্তী বছর কৃষক উৎপাদন করতে আগ্রহী হয় না।"
"ভারত থেকে বা দেশের বাইরে থেকে যে পেঁয়াজ আসবে, সেটা যদি না আসে তাহলে সারা বছর হয়তো আমাদের দেশে উৎপাদিত পেঁয়াজের দাম একটু বেশি থাকবে। হয়তো কেজি প্রতি ৪০-৪৫ টাকা থাকবে, কিন্তু কখনো আড়াইশ টাকায় উঠবে না," বলছিলেন কৃষি সচিব।
[বিবিসির বিশ্লেষণ]