প্রথম 'মুসলিম' নোবেল জয়ী কেন বিস্মৃত

আপডেট: 03:18:38 17/10/2019



img

সুবর্ণভূমি ডেস্ক : ১৯৭৯ সালে পাকিস্তানি বিজ্ঞানী আবদুস সালাম পদার্থবিদ্যায় নোবেল জিতেছিলেন।
তার জীবনকর্ম পদার্থবিদ্যার একটি তত্ত্ব সংজ্ঞায়িত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ, যা আজো পদার্থবিদ্যায় ব্যবহৃত হচ্ছে এবং এটাই ২০১২ সালের 'হিগস বোসন' কণার আবিষ্কারের ভিত্তি তৈরি করেছিল।
আবদুস সালাম ছিলেন প্রথম পাকিস্তানি যিনি নোবেল জিতেছিলেন এবং তার জয় আসলে দেশের জন্য ঐতিহাসিক মুহূর্ত হিসেবে বিবেচিত হওয়া উচিত ছিল।
কিন্তু এর পরিবর্তে এই ৪০ বছর পরেও তার জয়ের গল্প দেশটির বড় অংশই ভুলে গেছে। আর এর কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে তার ধর্ম বিশ্বাস।
এখন তাকে নিয়ে ডকুমেন্টারি বানাচ্ছে নেটফ্লিক্স।
চলচ্চিত্র প্রযোজক জাকির থাভের বলেন, "সালাম ছিলেন প্রথম মুসলিম, যিনি নোবেল জয় করেছিলেন।"
"তিনি তার পরিবারের প্রতি অঙ্গীকারাবদ্ধ ছিলেন এবং জনগণের কল্যাণ চাইতেন। নোবেল পদক নেওয়ার সময় ভাষণে তিনি কোরানকে উদ্ধৃত করেছিলেন"।
ব্রিটিশ ভারতের জং শহরে ১৯২৬ সালে জন্মগ্রহণ করেছিলেন তিনি।
তার শিক্ষক বাবার বিশ্বাস ছিল যে, তার সন্তানের জন্ম স্বয়ং সৃষ্টিকর্তার কাছ থেকে পাওয়া একটি স্বপ্নের ফল, যেটি তিটি শুক্রবারের প্রার্থনায় পেয়েছিলেন।
যখন বড় হচ্ছিলেন তাকে পরিবারের বড় হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।
এজন্য নিয়মিত পারিবারিক কাজ যেমন গরুর দুধ সংগ্রহ বা টয়লেট পরিষ্কার করা থেকে তাকে বিরত রাখা হয়েছিল, যা তাকে গণিতে সময় দিতে সাহায্য করে।
খুব বেশি বিলাসী শৈশব তিনি পাননি। যখন লাহোরে সরকারি কলেজে পড়ার জন্য নিজ শহর ছেড়ে গেলেন সেখানে তিনি প্রথম বৈদ্যুতিক বাতি দেখেছিলেন।
সেখানেই গণিত ও পদার্থবিদ্যায় তার দক্ষতা তাকে সহপাঠীদের কাছ থেকে আলাদা করে তোলে।
পরে তিনি ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের বৃত্তি পান ও সেন্ট জোনস কলেজে অল্প কয়েকজন দক্ষিণ এশীয়র মধ্যে তিনি একজন।
ডক্টরেট শেষ করে তিনি আবার লাহোরে ফিরে গিয়ে গণিতের অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন।

বিজ্ঞান ও ধর্মের সমন্বয়
জীবনভর অধ্যাপক সালাম ছিলেন একজন নিবেদিতপ্রাণ মুসলিম। লন্ডনে নিজের অফিসে বসেও তিনি কোরান শুনতেন। বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে ধর্ম কখনোই প্রতিবন্ধকতা তৈরি করেনি। বরং অনেক ক্ষেত্রে তার কাছে এটি ছিল একটি আরেকটির সহায়ক।
সহকর্মীদের কাছে তিনি দাবি করেছেন যে, তার অনেক আইডিয়াই এসেছে সৃষ্টিকর্তার তরফ থেকে।
যদিও বিগ ব্যাং তত্ত্বের মতো বিজ্ঞানের কিছু বিষয় তার ধর্ম বিশ্বাসের সঙ্গে যায় না বলেও তিনি গ্রহণ করেছেন।
তার ধর্ম বিশ্বাস যেমন তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ ছিল, তেমনি এটি তার জন্য অনেক যন্ত্রণাও বয়ে এনেছিল। বিশেষ করে আহমদিয়া সম্প্রদায়কে পাকিস্তানে যেভাবে দেখা হতো।
এ সম্প্রদায়ের সাথে অন্য মুসলিমদের বিশ্বাসগত কিছু পার্থক্য আছে।
তবে আহমদিয়ারা আইন মান্যকারী চমৎকার সম্প্রদায় বলে মনে করেন আদিল শাহ, যিনি লন্ডন আহমদিয়া সম্প্রদায়ের একজন ইমাম।
"যদিও পাকিস্তানে বারবার তারা নিপীড়ন ও বৈষম্যের শিকার হয়েছে"।
মূলত পাকিস্তানে আহমদিয়াদের সমস্যা শুরু হয় ১৯৫৩ সালে। তখন লাহোরে বেশ কিছু সহিংস ঘটনা ঘটে। পাঞ্জাব সরকার তখন মাত্র ২০ জনের কথা বললেও সহিংসতায় নিহতের সংখ্যা ছিল অনেক বেশি।
পরে ১৯৭৪ সালে আইন করে আহমদিয়াদের অমুসলিম ঘোষণা করা হয় এবং কিছু অধিকার থেকেও তাদের বঞ্চিত করা হয়।
২০১০ সালেও দুটি আহমদিয়া মসজিদে হামলার ঘটনা ঘটে যাতে ৯৪ জন নিহত হন।
জাকির থাভের বলছেন, নোবেল জয়ী প্রথম মুসলিম বিজ্ঞানীর কবরফলকে মুসলিম শব্দটা মুছে দেওয়া হয়েছে।
"এমনকি কোনো আহমদিয়া মুসলিম ইসলামি কায়দায় সালাম দিলেও তার জেল-জরিমানা হতে পারে। তাদের মসজিদ, কবর ও দোকানপাট আক্রমণের শিকার হচ্ছে। কিন্তু রাষ্ট্র এসব বিষয়ে বরাবর অন্ধ"।
১৯৫৩ সালের দাঙ্গার পর পাকিস্তান ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন আবদুস সালাম। তিনি ক্যামব্রিজে ফিরে যান এবং পরে লন্ডনে ইমপেরিয়াল কলেজে যোগ দেন।
নিজ দেশে প্রত্যাখ্যাত হলেও তিনি পাকিস্তানকে ছেড়ে দেননি। বরং দেশের বড় বিজ্ঞানভিত্তিক প্রকল্পে সংযুক্ত থেকেছেন।
১৯৬১ সালে তিনি পাকিস্তান স্পেস প্রোগ্রাম প্রতিষ্ঠা করেন; এমনকি পাকিস্তানের পরমাণু কর্মসূচিতে তিনি যুক্ত ছিলেন। কিন্তু জুলফিকার আলী ভুট্টো আহমদিয়াদের বিরুদ্ধে আইন করলে তার অন্তর্ভুক্তির অবসান হয় এবং পরে তিনিও পরমাণু কর্মসূচির বিরুদ্ধে সোচ্চার হন।
পাকিস্তানে আহমদিয়াদের অমুসলিম ঘোষণার পাঁচ বছর পর তিনি নোবেল জেতেন। বিশ্বের কাছে তিনি ছিলেন প্রথম মুসলিম, যিনি নোবেল জিতেছেন। কিন্তু তার দেশের মানুষের কাছে সেটি ছিল না।
তার কবরের ফলকে তাকে প্রথম মুসলিম নোবেল জয়ী লিখলেও স্থানীয় কর্তৃপক্ষ মুসলিম শব্দটা মুছে দিয়েছে।
থাভের বলছেন, তিনি ও তার সহ-প্রযোজক ওমর ভানদাল মিস্টার সালাম সম্পর্কে জানতে পারেন ৯০ এর দশকে মাঝামাঝি।
"আমরা নিউইয়র্ক টাইমসে তার অবিচুয়ারি পড়ছিলাম। আমরা বুঝতে পারলাম যে, সালামের গল্প বহু মানুষকে উৎসাহিত করবে এমন সম্ভাবনা আছে"।
পদার্থবিদ্যায় সালামের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। মৌলিক কণার মধ্যে দুর্বল ও তড়িৎ চৌম্বকীয় মিথষ্ক্রিয়া বিষয়ক তত্ত্বে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখার জন্য পদার্থবিজ্ঞান ক্যাটাগরিতে নোবেল পুরস্কার পান তিনি।
নিপীড়নের শিকার হওয়া সত্ত্বেও দেশের প্রতি তিনি ছিলেন নিবেদিতপ্রাণ।
তাকে ব্রিটিশ ও ইটালিয়ান নাগরিকত্বের অফার দেওয়া হলেও মৃত্যু পর্যন্ত তিনি ছিলেন পাকিস্তানি নাগরিক।
ইমাম আদেল বলছেন, "আমি সহ আহমদিয়ারা পাকিস্তানের প্রতি গভীর মমতা পোষণ করে এবং সামনে থেকেই তারা দেশসেবা করতে চায়"।
"আমরা ছিলাম অপরিচিত, তরুণ ও উচ্চাভিলাষী এবং উল্লেখযোগ্য কিছু করতে চেয়েছিলাম, বিশেষ করে ঐতিহাসিক"।
থাভের বলছেন তারা সম্পাদনা করেছেন দু'বছর ধরে। তারা এমন কিছু ব্যক্তির সাথে কথা বলেছেন, যারা এর আগে ক্যামেরার সামনে দাঁড়ায়নি।
যদিও মিস্টার সালামের পরিবার তার ঘর উন্মুক্ত করে দিয়েছিলেন।
অধ্যাপক সালামের বড় ছেলে আহমাদ সালাম তার বাবার জীবন নিয়ে কথা বলেছেন।
তিনি বলেন, তার বাবা উন্নয়নশীল দেশগুলোতে শিক্ষা, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উন্নয়নের কথা বলেছিলেন; যে বার্তা ৫০ বছর পরে এসেও সময়োপযোগী।
প্রযোজক থাভের বলছেন, শুরুতে মনে হয়েছিল নোবেল জয় মুসলিম শিশুদের উৎসাহিত করবে। কিন্তু পরবর্তী বছরগুলোতে পাকিস্তান ও উপমহাদেশে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের অবস্থার অবনতি হওয়ায় এটি গল্পের সঙ্গে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে।
"এমনকি পশ্চিমে বেড়ে ওঠা ইসলামোফোবিয়াও সালামের গল্পকে প্রাসঙ্গিক করে তুলেছে, বিশেষ করে বিজ্ঞানে মুসলিমদের অর্জন উদযাপনের ক্ষেত্রে," বলছিলেন মি. থাভের।
সূত্র : বিবিসি

আরও পড়ুন