বঙ্গের আদিপর্বের গান ২

আপডেট: 08:26:18 22/08/2020



img

গোলাম মুরশিদ

আমরা প্রাচীন বঙ্গভূমিতে যে-রাগসংগীত প্রচলিত ছিলো, তার কথা আলোচনা করেছি। কিন্তু তখনকার সমাজের অবস্থা কেমন ছিলো? ‘বলা মুশকিল’ বললে কিছুই বলা হয় না। আসলে সেকালের খাদ্য, পোশাক, বাসস্থান, শিক্ষা, সংস্কৃতি ইত্যাদি সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা করা একপ্রকার অসম্ভব। ধরা যাক, সে সমাজে শিক্ষার হার কেমন ছিলো? নিশ্চয় খুবই নগণ্য। এর দুটো কারণ বলি— এক. তখনকার বর্ণাশ্রম-নিয়ন্ত্রিত সমাজের শতকরা নব্বুইজন লোকের শিক্ষা নেওয়ার কোনো অধিকারই ছিলো না। শিক্ষা নিতে পারতো কেবল উচ্চবর্ণের লোকেরা, বিশেষ করে ব্রাহ্মণরা। আর, দুই. আনুষ্ঠানিক শিক্ষা-ব্যবস্থা বলেও তখন কিছু ছিলো না। যা কিছু শিক্ষার ব্যবস্থা, তা ছিলো ব্রাহ্মণ গুরু-গৃহে।
এমন অবস্থায় সাধারণ মানুষের মধ্যে শাস্ত্রীয় সংগীতের চর্চা! অবাস্তব কল্পনা। নিরক্ষর লোকেরা নিশ্চয় উচ্চাঙ্গ সংগীত শিখে চাষাবাদ করতো না। এখনো করে না। মোট কথা, ধরে নিতে পারি যে, চর্যাপদের সমকালে অথবা গীতগোবিন্দের সময়কার সমাজে হাতে-গোণা কয়েকজন লোক শাস্ত্রীয় সংগীত জানতো। বৌদ্ধদের আমলে বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্যরা, তাঁদের কিছু শিষ্য, রাজা ও অমাত্যরা। আর সেন আমলে রাজ-দরবারের সভাসদরা।
প্রশ্ন হচ্ছে: তা হলে সাধারণলোকে কি গান গাইতো না?
সুখে-দুঃখে, মনের আবেগে গান গাইতো বই কি! সে গান সে হয়তো প্রতিবেশীকে একদিন গাইতে শুনেছিলো। এখনো তার কয়েকটা কথা মনে আছে। সেই কটা কথা নিয়েই শুরু করে তার গান। তারপর নিজের মন থেকে জুড়ে দিতো আরও কয়েকটা শব্দ। সে কথাগুলোর সঙ্গে আগের দিন শোনা কথা কটার মিল আছে কিনা— কে পরোয়া করে! সে গানে স্বভাবতই রচয়িতার নাম থাকতো না।
সুরটাও উপস্থিত-মতো নিজেই তৈরি করে নিতো। কারণ সে গানের কোনো নির্দিষ্ট সুর থাকতো না। অথবা গাইবার জন্যে গলার রেওয়াজও ছিলো বাহুল্য। তার জন্যে সাতটা স্বরের জ্ঞান লাগতো না। এমন কি, গলার তেমন ওঠা-নামারও দরকার হতো না। কোনো-মতে চারটা পর্যন্ত স্বর তুলতে পারলেই সেটা খাসা সুর বলে বিবেচিত হতো। আর পাঁচটা স্বর লাগাতে পারলে তো কথাই নেই – কেল্লা ফতে!
সেকালে মুখে-মুখে বানানো চারটা-পাঁচটা স্বরের সহজ গানই ছিলো আম জনতার গান। সেই গানই বিবেচিত হতো সর্বোত্তম সুরের গান বলে। পৃথিবীর সব দেশের লোকসংগীতেই সাধারণত পাঁচটা পর্যন্ত স্বর লাগে; সাতটা লাগে না। প্রাচীন বঙ্গও এর ব্যতিক্রম ছিলো না। সিদ্ধাচার্যদের কথা অথবা স্বয়ং জয়দেবের কথা কে কেয়ার করে! তাঁদের ‘ছোই ছোই জাসি বাম্মন নাড়িয়া’! – ছুঁয়ে ছুঁয়ে যায় ব্রাহ্মণ নেড়ে! (কাহ্নপাদ রচিত চর্যার একটি পংক্তি।)
তখনকার জনগণের গানই ছিলো এখন যাকে বলে লোকসংগীত। এ গান ছিলো মুখে মুখে প্রচলিত। লেখাজোখা থাকতো না। স্মরণশক্তির ওপর নির্ভর করে একজনের কাছ থেকে আর-একজনের কাছে প্রচারিত হতো। ফলে নতুন নতুন কথা ঢুকে পড়তো তার মধ্যে। মনে রাখা দরকার সেকালে কাগজ-কলম ছিলো না, বইপত্রও নয়। দুচারজনের কাছে ছিলো তালপাতার ওপর হাতে-লেখা পুঁথি। এই পরিবেশে গান শেখার ব্যবস্থাও বলতে গেলে ছিলোই না। রাগরাগিণী শিখতে হতো গুরুর কাছে। সাধারণ মানুষের কাছে যা ছিলো কল্পনারও অতীত।
তবে বিশ শতকে এসে লোকগীতি তার সরল সহজ ভঙ্গি হারিয়ে ফেলেছে। এখন অনেক লোকগীতিতে সাতটি স্বরই ঢুকে পড়েছে। সেই সঙ্গে যুক্ত হয়েছে প্রযুক্তির ব্যবহার। বর্তমানের লোকগীতি বিদগ্ধ গান দিয়ে এতো প্রভাবিত যে, সাত স্বরবিশিষ্ট এই গানকে সত্যিকার অর্থে লোকগীতি বলা যায় না। যাঁদের প্রভাবে বাংলা লোকগীতিতে এই পরিবর্তন হয়েছে, বিশেষ করে তাঁরা হলেন: শচীন দেববর্মণ, আব্বাসউদ্দীন আহমদ, নির্মলেন্দু চৌধুরী, অমর পাল, পূর্ণদাস বাউল, ফরিদা পারভীনের মতো কিছু সংখ্যক সৃজনশীল গায়ক-গায়িকা। তবে তাঁরা লোকসংগীতের মূল বৈশিষ্ট্য বদলে দিলেও, তাকে নিঃসন্দেহে সমৃদ্ধও করেছেন। এখন আর খাঁটি বাউল, খাঁটি ভাটিয়ালি অথবা খাঁটি ভাওয়াইয়া বলে কিছু নেই। আমরা যথাসময়ে এ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করবো।
প্রশ্ন হচ্ছে, অতীতের লোকসংগীতের সঙ্গে তুলনা করা যায় এমন কি কোনো ধরনের গান বর্তমানে আছে? এক কথায় এর উত্তর হলো: নেই। কিন্তু হয়তো সামান্য সাদৃশ্য আছে সাঁওতাল, গারো, চাকমা, মারমা ইত্যাদি উপজাতি বিভিন্ন উৎসবে যেসব গান গায়, সেই ধরনের গানের সঙ্গে।
তা হলে, দেখা যাচ্ছে, সমাজের একেবারে ওপরের তলায় প্রচলিত ছিলো রাগ-সংগীত, আর নীচের তলায় ছিলো যাকে আমরা এখন বলছি লোকসংগীত। প্র্শ্ন হচ্ছে তখনকার সমাজে কি তা হলে কেবল দু ধরনের গান প্রচলিত ছিলো?— অতি উচ্চ রাগসংগীত, নয়তো অতি নিম্ন মানের লোকসংগীত? মধ্যখানে কি কিছুই ছিলো না!
ছিলো বই কি! যাকে আমরা পাঁচালি বলি, মঙ্গলগীতি বলি, কিছু কাল পরে যাকে কীর্তন বলে আখ্যায়িত করা হতো— এসব নানা ধরনের ধর্মীয় সংগীত ছিলো সাধারণলোকের গান। কখনো সন্ধ্যের পরে পাড়ার কোনো বাড়ির উঠানে লক্ষ্মীর পাঁচালি গাওয়া হতো, পড়শিরা ভিড় করে শুনতো। এ পাঁচালি ঠিক গান নয়, গাওয়াও হতো না। অনেকটা সুর করে আবৃত্তি করা হতো। কখনো শনির পাঁচালি হতো। কখনো সত্যনারায়ণের পাঁচালি হতো। কখনো বা হতো মনসামঙ্গলের রয়ানি। তাতে বেশ ভিড় হতো। সারা রাত্তির জেগে জেগে বেহুলা আর লক্ষ্মীন্দরের কাহিনী শুনতো সবাই। যে-দেশে প্রতি বছর সাপের কামড়ে মারা যায় অতো লোক, সেখানে সাপের দেবীর পুজো না-হয়ে পারে? তাতে যতোই তাঁকে হেয় করা হোক সেকেন্ড ক্লাস দেবী বলে! মনসার সৈন্যবাহিনীতে সাপও ছিলো এ যুগের তুলনায় অনেক বেশি।
এই যে রাগসংগীত আর লোকসংগীত— দুই ধরনের গান, এর মাঝখানে ছিলো পাঁচালি, মঙ্গলগীতি, রয়ানি, পালা গান, আদি যাত্রা ইত্যাদি। কিন্তু এই মধ্যবর্তী গান সম্পর্কে আমরা যে-তথ্য জানতে পাই, তা অপ্রতুল এবং অস্পষ্ট। অবশ্য এই শ্রেণীর গানের শ্রোতাই ছিলো বেশি। সমাজে যে-ধনী এবং অতি দরিদ্ররা ছিলো, তাদের মাঝখানে ছিলো, এখনকার পরিভাষায় যাকে বলা হয় মধ্যবিত্তরা। যদিও মধ্যবিত্ত বলতে সত্যি সত্যি যা বোঝায় তার তখনও উন্মেষ হয়নি। সামান্য লেখাপড়া-জানা অথবা নিরক্ষর, কিন্তু সম্পন্ন গৃহস্থদের, বলতে পারি মধ্যবিত্ত। তারাই ছিলো আগেই যাকে বলেছি মধ্যবর্তী গান, সেই গানের পৃষ্ঠপোষক।
বেশির ভাগ চর্যাপদ যখন রচিত হয়েছিলো, তখন পর্যন্ত ইসলাম ধর্ম এ দেশে আসেইনি। তবে ১২০৪ সালে বখতিয়ার খিলজি লক্ষ্মণাবতী দখল করার পর ধর্ম প্রচারের জন্যে একাধিক পীরও এসেছিলেন আমাদের দেশে। তাঁরা প্রচার করেন সুফীবাদী ইসলাম। পীরদের ব্যক্তিত্বে আকৃষ্ট হয়ে দলে দলে ‘নেড়ে’ অর্থাৎ নিম্নশ্রেণীর বৌদ্ধ এই ইসলাম-ধর্ম গ্রহণ করে। পীর বা মুরশিদ সে ধর্মে পূজনীয় ব্যক্তি। ফলে কালে কালে তাঁদের শিষ্যরা পীরের প্রশংসাসূচক মুরশিদী গান গাইতে আরম্ভ করে। কিন্তু যারা সুফীবাদী নয়, তারা গান গাইতোই না। প্রথম দিকে তাদের অবশ্য অস্তিত্বও ছিলো না।
কীর্তন গানকে রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, বাঙালির প্রাণের গান। কিন্তু কেন? তিনি তো বৈষ্ণব ছিলেন না! তা হলে? আসলে কীর্তন গানের সুর ও কথারই এমন বৈশিষ্ট্য আছে, যা তাকে এই প্রশংসা লাভের যোগ্যতা দিয়েছে। আগামী কিস্তিতে আমরা আলোচনা করবো কীর্তন গানের উদ্ভব, ক্রমবিকাশ এবং তার প্রধান প্রধান বৈশিষ্ট্য নিয়ে।
[বিডিনিউজ থেকে]